ধান-চালে সমৃদ্ধ উত্তরের জেলা নওগাঁয় আউশ ধান কাটা মাড়াইয়ে ব্যস্ততা বেড়েছে চাষীদের। অনুকূল আবহাওয়ায় কাঙ্খিত ফলন পেয়ে খুশি তারা। তবে কৃষকের মুখের সেই হাসি মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে দামের কারণে।
হাটে নতুন ধান উঠলেও মিলছে না কাঙ্খিত দাম। তাই চাষীরা এবার লাভের বদলে হিসাব কষছেন লোকসানের। অনেকে বন্ধ করতে চাচ্ছেন চাষাবাদও। ধানের নায্য দাম নিশ্চিত করতে বাজারে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
সম্প্রতি নওগাঁ-মহাদেবপুর আঞ্চলিক সড়কে গেলে চোখে পড়ে শরতের সোনালি রোদে ঝলমল করছে আউশের পাকা ধান। কাস্তের টানে ধান কাটার শব্দে মুখরিত চারপাশ। কাঁঠ ফাঁটা রোদে ধান কেটে আঁটি বাঁধছেন শ্রমিকরা। এরপর ধান বোঝাই আঁটি দলবেঁধে মাথায় নিয়ে হেঁটে গৃহস্তের বাড়ির পথে ছুটছেন তারা। গৃহস্তের উঠানে সেই ধান মাড়াই করা হচ্ছে মেশিনে। নতুন ধান ঘরে তোলা নিয়ে এ যেনো অন্যরকম উৎসবের আমেজ।
তবে সেই ধান হাটে নিয়ে যাওয়ার পরই পাল্টে যাচ্ছে পুরো দৃশ্য। কৃষকের মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে যাচ্ছে মলিনতায়। সরবরাহ বাড়লেও স্থানীয় হাটগুলোতে ক্রেতাদের মধ্যে চালকল মালিক বা তাদের প্রতিনিধিদের তেমন দেখা মিলছে না। এর সুযোগে কৃষকদের থেকে আউশ মৌসুমে উৎপাদিত ধান ৬৫০ টাকা থেকে সর্ব্বোচ্চ ৮০০ টাকা মণ দরে কিনছে ফরিয়া ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা। যা গত বছরের বাজার মূল্যের চেয়ে প্রতি মণে অন্তত ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কম।
চাষীরা বলছেন, চারা রোপণের পর সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, কাটা মাড়াই ও সেচসহ এবার বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১২ হাজার টাকা। সে তুলনায় ধানের দাম মিলছে না। ৬৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি বিঘায় হিসেব কষলে অন্তত চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। তাই আউশের আবাদ এবার গলার কাঁটায় পরিণত হওয়ার মতো অবস্থা।
মহাদেবপুর উপজেলার উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের উত্তরগ্রামের কৃষক মোহাম্মদ কুদ্দুস বলেন, ব্রিধান-৫৬ ও ব্রিধান-৬৫ জাত মিলিয়ে ৪ বিঘা জমিতে আউশের আবাদ করেছিলাম। ৪৫ হাজার টাকা খরচ করার পর সেখান থেকে ৬৪ মণ ধান পেয়েছি। এই ধান ৭০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করলে লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচই উঠবে না। মাঠের শ্রম ও সময় পুরোটাই বৃথা। পরবর্তী আমন ধান চাষের প্রস্তুতির খরচ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ধানের চাষাবাদ বন্ধ করে দিতে হবে।
একই গ্রামের কৃষক মইন উদ্দিন এবার ৮ বিঘা জমিতে আউশ আবাদ করেছিলেন। বর্তমান ধানের বাজার দর নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এ কৃষক বলেন, এবার আউশের আবাদ পুরোটাই লোকসান। সার ফসফেটের দামও উঠছে না। বাজারে তেমন ক্রেতা নেই। ৭০০ টাকা মণ দরেও ব্যবসায়ীরা ধান কিনতে চাচ্ছে না। অথচ এ ধানের বাজার দর প্রতি মণে অন্তত ১ হাজার ১০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা হওয়া উচিত ছিলো। কৃষকরা মরে গেলেও বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
স্বরস্বতীপুর হাটে ধান বিক্রি করতে আসা সঞ্চয় সরকার বলেন, ১০ বিঘা জমিতে ব্রিধান-১৯ জাতের ধানের আবাদ করে ১৫০ মণ ফলন পেয়েছি। সেই ধান বাজারে আনার পর কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বড় কোন ব্যবসায়ী বা মিলারের প্রতিনিধির দেখা পাইনি। পরে বাধ্য হয়ে ৭৫০ টাকা দরে ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হলো। উৎপাদন খরচই হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। এই দামে ধান বিক্রির পর পরবর্তী ধান আবাদের খরচই উঠছে না।
তিনি বলেন, বোরো মৌসুমে সরকারি গুদামে সরাসরি কৃষকের থেকে ধান কেনায় ১ মাস আগেও বাজারে ধানের নায্য দাম পাওয়া যাচ্ছিল। সরকারের ধান কেনা শেষ হলে বাজারে আবারও সিন্ডিকেট প্রভাব খাটাতে শুরু করে। যার ফলাফল বর্তমান ধানের বাজার দর। কৃষকদের বাঁচাতে হলে সরকারকে অবিলম্বে আউশ মৌসুমেও সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ শুরু করতে হবে। তবেই বাজার সিন্ডিকেট ভাঙবে।
স্বরস্বতীপুরে ধান কিনতে আসা চৌধুরী ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী শামসুর রহমান বলেন, বড় ব্যবসায়ী ও মিলাররা ধান কিনতে চাচ্ছেন না। তাই গৃহস্থরা ধান নিয়ে হাটে বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা কেনার পর কোথায় বিক্রি করবো সেটিও বুঝে উঠতে পারছি না। এখন ঝুঁকি নিয়ে কম দামে ধান কিনতে হচ্ছে। গত বছরের চেয়ে প্রতি মণ ধানের দাম ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা কমে গেছে।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, জেলায় এ বছর ৫৮ হাজার ৫৭৩ হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ হয়েছে। এখান থেকে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০৪ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকরা বিগত সময়ের চেয়েও এবার বেশি ফলন পেয়েছেন। নায্য দাম পেতে ধান সংরক্ষণের পর শুকিয়ে বিক্রির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের।
বাজার সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সব ধরনের সহযোগিতা করা আমাদের কাজ। সেই দিক থেকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সফল। এখন বাজারে কৃষকরা কতটুকু নায্য দাম পাচ্ছেন সেটি দেখবে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিপণন কর্মকর্তা।
নওগাঁ জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সোহাগ সরকার জাগো নিউজকে বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ধানের দাম বেঁধে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে ধান-চালে সমৃদ্ধ জেলা বিবেচনায় সরকার যদি আউশ মৌসুমেও ধান কেনে সেই ক্ষেত্রে কৃষকরা নায্য দাম পাবেন। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে এককভাবে কিছুই করার নেই বলেও জানান তিনি।
আরমান হোসেন রুমন/এএইচ/জেআইএম




মন্তব্য
(০)