বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে আগলে রাখা বরগুনার টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনে গাছ কাটার হিড়িক পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের হিসাবে, গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত চার দিনে টেংরাগিরি এবং প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তরে শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন নলবুনিয়া বন থেকে প্রায় ৯০০ গাছ কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে টেংরাগিরি থেকে ৪০০ এবং শুভসন্ধ্যা এলাকা থেকে প্রায় ৫০০ গাছ কাটা হয়েছে; কাটা পড়েছে রেইনট্রি, কেওড়া, গেওয়া, ঝাউ ও জিলাপি গাছ।
তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নে অবস্থিত টেংরাগিরি বনের আয়তন বন বিভাগের হিসাবে ১৩ হাজার ৬৪৪ একর। এক সময় সুন্দরবনের অংশ ছিল এই এলাকা; ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই একে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৬৭ সালে নাম হয় টেংরাগিরি বনাঞ্চল। গেওয়া, জাম, ধুন্দল, কেওড়া, সুন্দরী, বাইন, করমচা, তাল, কাঁকড়া, বনকাঁঠাল, হেতাল ও গরানের এই বনে বানর, সজারু, বুনো শূকর, কচ্ছপ, শিয়াল, বনমোরগ ও ৪০ প্রজাতির সাপ বিচরণ করে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, চক্রটি সাধারণত রাতের আঁধারে কাঠ পাচার করে; অনেক সময় গাছ কেটে বনের ভেতরেই ফেলে রাখে এবং সুবিধামতো সময়ে সরিয়ে নেয়। চুরির চিহ্ন মুছতে গাছের শিকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. রিফাত ও বাবুল হাওলাদারসহ কয়েকজন জানান, প্রতিবাদ করলে বন বিভাগের কর্মকর্তারাই উল্টো গাছ কাটার মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেন; তাই চোখের সামনে বন উজাড় হতে দেখেও তারা মুখ খোলার সাহস পান না।
সোনাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ড. কামরুজ্জামান বাচ্চু বন বিভাগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সরাসরি তুলেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, ‘গাছ কাটার সঙ্গে বন বিভাগের লোকজন জড়িত। তারা জড়িত না থাকলে এতদিন বসে চোরেরা গাছ কাটে, আর তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি?’ তিনি জড়িতদের বিচার দাবি করেন। অন্যদিকে বন বিভাগের নলবুনিয়া বিট কর্মকর্তা মো. শাওন বলেছেন, গাছ কাটার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না; এর বেশি কোনো বক্তব্য দিতে তিনি রাজি হননি।
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) তালতলী শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান জানান, চার দিনে দুই বন থেকে ৯ শতাধিক গাছ কাটার তথ্য তাঁরা পেয়েছেন। এই বনাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ঝোড়ো বাতাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হয়ে মানুষকে রক্ষা করে; এভাবে উজাড় হতে থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং উপকূলীয় জনপদে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়বে। বনের কাঁকড়া, গুইসাপ ও বন্য শূকর শিকারের অভিযোগও তাঁরা পেয়েছেন, অথচ বন বিভাগ নীরব বলে তাঁর অভিযোগ।
বন বিভাগের তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর সরেজমিন অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা মিলেছে এবং এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতীশ সরকার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু জাফর মোহাম্মদ ইলিয়াসকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। আহ্বায়ক জানান, বৃহস্পতিবার কমিটির চিঠি পেয়েছেন, আগামী সপ্তাহে তদন্ত শুরু করবেন; ইউএনও বলেছেন, প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৩ হাজার একরের বেশি এই বন উপকূলের মানুষের প্রাকৃতিক ঢাল। পরিবেশকর্মীদের সতর্কবার্তা, বন পাতলা হলে দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়বে—তাই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও তার পরের ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে আছেন তালতলীর মানুষ। প্রতিবেদনটি করেছেন সমকালের আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি।
সূত্র: সমকাল




মন্তব্য
(০)