গরুর চোখ বেঁধে কাঠের ঘানি ঘুরিয়ে সরিষার তেল তৈরির দৃশ্য গ্রামবাংলা থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই ঘানিকেই নতুন প্রযুক্তিতে সচল রেখেছেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার চন্দনী এলাকার বাচ্চুমিয়া। গরুর বদলে অটোরিকশার যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি ঘূর্ণন ব্যবস্থায় এখন তাঁর ঘানি ঘোরে, আর ভেতরে থাকে পুরোনো সেই কাঠের ঘানিই।
বাচ্চুমিয়ার পরিবারে বাপ-দাদার আমল থেকে ঘানিতে সরিষার তেল তৈরির চল। দীর্ঘদিন গরু দিয়েই ঘানি ঘোরানো হতো; কয়েক বছর আগে তিনি পদ্ধতিটি বদলান। অটোরিকশার বিভিন্ন অংশ বিশেষ কায়দায় বসিয়ে বানানো হয়েছে ঘূর্ণন ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ বা মোটরে সেটি চালু করলে ঘানি নিজে থেকেই ঘুরতে থাকে।
তাঁর বাড়িতে টিনশেডের নিচে পাশাপাশি এমন তিনটি ব্যবস্থা বসানো, প্রতিটির মাঝখানে একটি কাঠের ঘানি। সরিষা দেওয়ার পর যন্ত্র ঘুরতে থাকে, কাঠের ঘানির চাপে সরিষা থেকে তেল বেরিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পাত্রে জমে। ঘানির সঙ্গে যুক্ত কলুদের ভাষায়, ঐতিহ্য রাখা হয়েছে, বদলেছে শুধু ঘানি ঘোরানোর শক্তির উৎস।
কলুরা জানান, গরু দিয়ে ঘানি চালাতে একজন মানুষকে প্রায় সারাক্ষণ পাশে থাকতে হয়: গরুকে নির্দিষ্ট বৃত্তে ঘোরানো, নিয়ন্ত্রণ করা, পুরো প্রক্রিয়া দেখা। এতে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগে। গরুর চোখ ঢেকে ঘানি ঘোরানোকেও পরিবারের অনেকে এখন আর স্বাভাবিকভাবে নিতে চান না। নতুন ব্যবস্থায় সেই শ্রম অনেকটাই কমেছে।
প্রতিবেদনের হিসাবে, একেকটি ঘানিতে সারা দিনে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি সরিষা ভাঙিয়ে ৮ থেকে ১০ কেজি তেল পাওয়া যায়। তিনটি ঘানি চালু থাকলে দিনে ৯০ থেকে ১০৫ কেজি সরিষা থেকে আনুমানিক ২৪ থেকে ৩০ কেজি তেল হতে পারে; তবে আসল পরিমাণ সরিষার জাত, আর্দ্রতা, মান, ঘানির কার্যক্ষমতা ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো উৎপাদনই থেমে যায়, এটিই নতুন পদ্ধতির নতুন চ্যালেঞ্জ।
আধুনিক তেলকল আর বোতলজাত ভোজ্যতেলের বিস্তারে ছোট কাঠের ঘানির সংখ্যা কমেছে, সঙ্গে হারাতে বসেছে এর কারিগরি জ্ঞানও। অথচ ঘানিভাঙা সরিষার তেলের আলাদা বাজার আছে। স্থানীয়রা বলছেন, যেসব পরিবার গরু পালন ও পরিচর্যার ঝামেলায় ঘানি চালাতে পারছে না, তাদের জন্য এমন ব্যবস্থা একটি বিকল্প হতে পারে; বাচ্চুমিয়ার ঘানি দেখতে প্রতিদিন আশপাশের গ্রামের মানুষ আসছেন, কেউ কেউ নতুন ঘানি গড়ার আগ্রহও দেখাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, এ বাজার ধরে রাখতে শুধু ঐতিহ্যের গল্প যথেষ্ট নয়; সরিষার মান, উৎপাদনের পরিচ্ছন্নতা, সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ, লেবেলিং ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং প্রযোজ্য সরকারি মান ও অনুমোদন মেনে চলাও জরুরি। প্রতিবেদনটি বার্তা২৪.কমের কুষ্টিয়ার স্টাফ করেসপন্ডেন্টের।
ছবি: Swetapadma07 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বার্তা২৪





মন্তব্য
(০)