অল্প জায়গা ও অল্প পুঁজিতে পালন করা যায় বলে জাপানি কোয়েল বাংলাদেশে মুরগি ও হাঁসের পাশাপাশি বিকল্প পোলট্রি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) মাসিক পত্রিকা কৃষিকথায় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি মুরগির জায়গায় ৮ থেকে ১০টি কোয়েল পালন করা যায় এবং একটি পূর্ণবয়স্ক কোয়েল দিনে ২০ থেকে ২৫ গ্রাম খাবার খায়। সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনায় কোয়েল পালনের মূল কথাগুলো এখানে তুলে ধরা হলো।
জাপানি কোয়েল কেন জনপ্রিয়
এআইএসের তথ্যে, কোয়েল পোলট্রির এগারোটি প্রজাতির একটি, ছোট আকারের গৃহপালিত পাখি। পৃথিবীতে কোয়েলের ১৭ থেকে ১৮টি জাত আছে, যার মধ্যে জাপানি কোয়েল অন্যতম; বিভিন্ন জাতের মূল উৎসও এই জাপানি কোয়েল। কোয়েল ৬ থেকে ৭ সপ্তাহ বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে, রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সহজে মানিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটির সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, কটার্নিক্স বা ফারাও কোয়েল নামেও পরিচিত এই পাখি মূলত মাংস ও ডিমের জন্য পালন করা হয় এবং ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ বয়সে ডিম দিতে পারে।
২০১৬ সালে ভেটেরিনারি ওয়ার্ল্ড সাময়িকীতে প্রকাশিত এক জরিপে ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ১৪টি জেলার ৫২টি কোয়েল খামার দেখা হয়। সেখানে কোয়েলের প্রথম ডিম পাড়ার বয়স পাওয়া যায় ৪২ থেকে ৪৬ দিন।

ডিম ফোটানো ও বাচ্চার যত্ন
এআইএস ৩টি স্ত্রী কোয়েলের সঙ্গে ১টি পুরুষ কোয়েল রাখার পরামর্শ দেয়; জরিপের ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ খামারেও এই অনুপাত মানা হচ্ছিল। পুরুষ কোয়েল দেওয়ার চার দিন পর থেকে ফোটানোর ডিম সংগ্রহ করা যায়, তবে ডিম পাড়া শুরুর প্রথম দুই সপ্তাহের ডিম ফোটাতে বসানো উচিত নয়। কোয়েলের ডিমের গড় ওজন ১০ থেকে ১২ গ্রাম, ডিম ফুটতে লাগে ১৭ থেকে ১৮ দিন, আর সদ্য ফোটা বাচ্চার ওজন মাত্র ৫ থেকে ৭ গ্রাম। তাই প্রথম কয়েক সপ্তাহ বাচ্চাকে কৃত্রিম তাপ (ব্রুডিং) দিতে হয়। এআইএসের দেওয়া তাপমাত্রা:
- প্রথম সপ্তাহ: ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট)
- দ্বিতীয় সপ্তাহ: ৩২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট)
- তৃতীয় সপ্তাহ: ২৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট)
- চতুর্থ সপ্তাহ: ২৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট)

বাসস্থান: খাঁচা না মেঝে
এআইএসের মতে, বাণিজ্যিকভাবে পালনে লিটার বা মেঝে পদ্ধতির চেয়ে খাঁচায় পালন বেশি লাভজনক। প্রতিটি বাচ্চার জন্য খাঁচায় ৭৫ বর্গসেন্টিমিটার ও মেঝেতে ১০০ বর্গসেন্টিমিটার, আর প্রতিটি বয়স্ক কোয়েলের জন্য খাঁচায় ১৫০ ও মেঝেতে ২৫০ বর্গসেন্টিমিটার জায়গা লাগে। ৫০টি বয়স্ক কোয়েলের জন্য ১২০ সেন্টিমিটার লম্বা, ৬০ সেন্টিমিটার চওড়া ও ৩০ সেন্টিমিটার উঁচু খাঁচাই যথেষ্ট। খাঁচার মেঝের জালের ফাঁক বাচ্চার জন্য ৩ x ৩ মিলিমিটার এবং বয়স্ক কোয়েলের জন্য ৫ x ৫ মিলিমিটার হওয়া উচিত। ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
মেঝেতে পালন করলে ডিপ লিটার পদ্ধতিতে শুরুতে ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি পুরু তুষ বিছিয়ে দিতে হয় এবং লিটার সব সময় শুকনো রাখতে হয়। উল্লেখ্য, জরিপে দেখা খামারগুলোর সবগুলোতেই কোয়েল মেঝেতে পালন করা হচ্ছিল।

খাবার, পানি ও আলোর ব্যবস্থাপনা
কোয়েলের খাবার তিন ধাপে ভাগ করা হয়: স্টার্টার, বাড়ন্ত এবং লেয়ার বা ব্রিডার। এআইএসের নির্দেশনায় প্রথম সপ্তাহে মাথাপিছু দিনে ৫ গ্রাম খাবার দিয়ে শুরু করে প্রতি সপ্তাহে ৫ গ্রাম করে বাড়াতে হয়, যতক্ষণ না তা দিনে ২০ থেকে ২৫ গ্রামে পৌঁছায়। ডিম পাড়া কোয়েলের খাবারে ২.৫ থেকে ৩.০ শতাংশ ক্যালসিয়াম দরকার, গরমকালে ৩.৫ শতাংশ। মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটির সম্প্রসারণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, জাপানি কোয়েলের স্টার্টার খাবারে (০ থেকে ৬ সপ্তাহ) ন্যূনতম ২৪ শতাংশ আমিষ এবং ডিম পাড়া কোয়েলের খাবারে ন্যূনতম ১৮ শতাংশ আমিষ ও ২.৭৫ শতাংশ ক্যালসিয়াম থাকা দরকার। নির্দেশিকা অনুযায়ী তৈরি সুষম খাবারে বাড়তি দানা মেশালে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হয়, আর ছত্রাক ধরা খাবার কোয়েলের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বাড়িতে খাবার মেশানোর আগে উপকরণ ও অনুপাত উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
সব সময় পরিষ্কার পানি দিতে হবে; এআইএস প্রতি ৫০টি কোয়েলের জন্য একটি পানির পাত্র, অথবা নিপল বা কাপ ড্রিংকার হলে প্রতি ৫টি বয়স্ক কোয়েলের জন্য একটি রাখার কথা বলে। ডিম উৎপাদনের জন্য দিনে ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা আলো দরকার, মাংসের জন্য পালিত পুরুষ কোয়েলের জন্য দিনে ৮ ঘণ্টা আলোই যথেষ্ট।
রোগবালাই নিয়ে সতর্কতা
এআইএসের লেখায় কোয়েলের রোগবালাই কম বলা হলেও ২০১৬ সালের জরিপে ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ খামারে রোগের প্রাদুর্ভাব পাওয়া যায়; এর মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, ইনফেকশাস করাইজা ও রানীক্ষেত রোগ ছিল প্রধান। খামারিরা খাবারের উচ্চমূল্যকে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে জানান। প্রথম দুই সপ্তাহ বাচ্চার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকির সময়। টিকা, ওষুধ বা রোগের লক্ষণ দেখা দিলে নিজে ওষুধ না দিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ছবি: Kirill Tsukanov / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: দ্য অ্যাগ্রো নিউজ, কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষিকথা), মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন সার্ভিস, ভেটেরিনারি ওয়ার্ল্ড





মন্তব্য
(০)