২০০২ সালে বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিনের শপিংব্যাগ নিষিদ্ধ করেছিল বাংলাদেশ। পরে আদালত নদী ও তীরে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করেছেন, বড় নদী থেকে প্লাস্টিক সরানোর নির্দেশও দিয়েছেন। তবু দেশের নদী প্লাস্টিকে ডুবছে, এমন চিত্র উঠে এসেছে দ্য ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) ২০২২ সালের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়; ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের প্রতিবেদনে ঢাকায় দৈনিক প্লাস্টিক বর্জ্য ছিল প্রায় ৬৪৬ টন, যা ২০০৫ সালের সাড়ে তিন গুণ, আর পুনর্ব্যবহার হয় মাত্র ৩৭ শতাংশ, প্রায় পুরোটাই পুরান ঢাকার ইসলামবাগের মতো এলাকার অনানুষ্ঠানিক খাতে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, বুড়িগঙ্গায় মাটির ১৫ ফুট গভীরেও তাঁরা প্লাস্টিক পেয়েছেন; লেবেল দেখে বোঝা গেছে কয়েকটি ১৫ থেকে ১৭ বছর আগে ফেলা, অথচ দেখতে এখনো নতুনের মতো। বোতল ও খাবারের মোড়কে ব্যবহৃত পিইটি ক্ষয় হতে আনুমানিক ৪৫০ বছর লাগে, এর মধ্যে তা মাইক্রোপ্লাস্টিক ও রাসায়নিক ছড়ায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিসিএসআইআরের গবেষকদের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় বুড়িগঙ্গার মাছের প্রতি গ্রামে ০.৬৫ থেকে ৩.৮২টি, কাঁকড়ায় ৩.৭৫ থেকে ৪.২৮টি এবং তলানিতে সর্বোচ্চ ৮.১৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে, সঙ্গে ক্রোমিয়াম, সিসা, আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়ামের উচ্চমাত্রা। ২০২৫ সালের আরেক গবেষণায় সুন্দরবনের পানিতে লিটারে ২৩.২৫টি কণা পাওয়া গেছে, যা কাপ্তাই হ্রদ ও টাঙ্গুয়ার হাওরের চেয়ে বেশি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী ড. শফি মোহাম্মদ তারেক বলেন, এখন মাছ, লবণ, তেল ও চিনিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে, অথচ এর নিরাপদ মাত্রা এখনো নির্ধারিত হয়নি। স্বাস্থ্যে এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে; স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের ২০২৫ সালের এক নিবন্ধে প্রজনন, পরিপাক ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্রের কথা এসেছে, যেখানে শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে।
নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রয়োগ নেই। সেপ্টেম্বরের শুরুতে হাইকোর্ট ১৫ দিনের মধ্যে বুড়িগঙ্গার তীরে ইসলামবাগ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচরের প্লাস্টিক ও বর্জ্য সরানোর নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হতে দেখা যায়নি। জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় ২০২৬ সালের মধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ৯০ শতাংশ বন্ধের লক্ষ্য ছিল। পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের প্রস্তুতি চলছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও পর্যটনকেন্দ্রে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক শিগগির নিষিদ্ধ হবে।
এসডোর মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেন 'দূষণকারীই ব্যয় বহন করবে' নীতির কথা বলেছেন, যাতে যে কোম্পানির পণ্য নদী দূষিত করছে, পরিষ্কারের দায়ও তার হয়। তাঁর তথ্যমতে, সরকারের করা ১৭টি একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের তালিকার নয়টি এরই মধ্যে নিষিদ্ধ; এখন দরকার সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করা।
প্রতিবেদনটি দ্য ডেইলি স্টারের পিনাকী রায়ের প্রতিবেদন অবলম্বনে।
ছবি: Sarah.1001022 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার





মন্তব্য
(০)