দক্ষিণ এশিয়ার মোটা খামিরে তৈরি নরম, ফুলে ওঠা রুটি নান আজ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় রুটিগুলোর একটি। খাদ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট টেস্ট অ্যাটলাসের সেরা রুটির তালিকায় সম্প্রতি প্রথম স্থান পেয়েছে বাটার গার্লিক নান, গরম নানের ওপর মাখন ও কুচি করা রসুন ছিটিয়ে যা তৈরি হয়; তালিকায় আছে মশলা ও ধনেপাতা মেশানো আলুর পুর দেওয়া আলু নানও। অথচ এই রুটি একসময় কেবল মুসলিম সম্রাটদের রাজদরবারেই পরিবেশিত হতো।
নানের উৎপত্তি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, তবে অনেক খাদ্য ইতিহাসবিদের মতে এটি প্রাচীন পারস্যের, কারণ ফারসিতে রুটিকেই 'নান' বলা হয়। পারসিকরা পানি ও ময়দার এই রুটি সম্ভবত গরম পাথরে সেঁকত। ১৩শ থেকে ১৬শ শতকে উপমহাদেশের বড় অংশ শাসন করা সুলতানদের হাত ধরে নান এখানে আসে, সঙ্গে আসে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার রন্ধন ঐতিহ্য এবং তন্দুরে রান্নার প্রথা।
আলাউদ্দিন খিলজি ও মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দরবারের জীবন নিয়ে লেখা ভারতীয়-ফারসি কবি আমির খসরুর বইয়ে দুই ধরনের নানের উল্লেখ আছে: পাতলা ও নরম নান-এ-তানুক এবং তন্দুরে সেঁকা মোটা, ফোলা নান-এ-তানুরি। দিল্লি সুলতানি আমলে কাবাব ও মাংসের কিমার সঙ্গে নান খাওয়া হতো। শাহী বাবুর্চিরা খামিরে ইস্ট যোগ করতেন, যা তখন বিরল ও ব্যয়বহুল উপাদান; এই জটিল প্রক্রিয়াই নানকে রাজপরিবার ও উচ্চবিত্তের বিলাসী খাবারে পরিণত করে, আর পরের তিনশ বছর মুঘল আমলেও সেই রেওয়াজ বজায় থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিদ নেহা ভারমানি বলেন, "নান তৈরির জন্য বিশেষ বাবুর্চি থাকতেন, যাদের বলা হতো 'নান বাই'।" তারা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রুটির নামের সঙ্গে বিশেষণ জুড়তেন: পাতলা স্তরযুক্ত নান-এ-ওয়ারকি, গ্রেভি শুষে নেওয়া ছোট নান-এ-তাঙ্গি। কখনও নামকরণ হতো রান্নাঘর অনুসারে; তার ব্যাখ্যায় বিস্কুটের মতো গঠনের বাকরখানি রুটির নাম এসেছে জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বাকির নাজম সাইনির রান্নাঘর থেকে।
ব্রিটিশ শাসনামলেও নান মূলত ধনী শ্রেণির খাবার ছিল, তবে ব্রিটিশ পর্যটকদের হাত ধরে এটি পশ্চিমে পৌঁছে যায় এবং ভারতে মাংস ও স্থানীয় মশলার সসের সঙ্গে ঔপনিবেশিক খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে জটিল পদ্ধতির জায়গা নেয় সহজ কৌশল, আর নানের একটি সরল রূপ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। আজ ময়দা, দই ও ইস্ট মিশিয়ে ময়ান করা খামির ফুলতে দেওয়া হয়, তারপর গোল টুকরো হাতে চেপে তন্দুরে সেঁকে মাখন বা ঘি মাখিয়ে পরিবেশন করা হয়।
১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে ভারত ও বিদেশের ফাইন-ডাইনিং রেস্তোরাঁগুলো নান নিয়ে নতুন পরীক্ষা শুরু করে। শেফ সুবীর সরণ জানান, নিউইয়র্কে তার রেস্তোরাঁয় নানে পালং শাক, পনির ও মাশরুম যোগ করা হতো, যাতে অ-ভারতীয়দের কাছে এটি আকর্ষণীয় হয়। আজ গোয়ায় পর্ক ভিন্দালু নান ও বাটার চিকেন নান মেলে, হংকংয়ে ট্রাফল চিজ নান। তার ভাষায়, "নান হলো ভারতের পক্ষ থেকে বিশ্বকে দেওয়া এক অসাধারণ উপহার।"
খাদ্য ইতিহাসবিদরা অবশ্য মনে করিয়ে দেন, নান শুধু ভারতের নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভাগাভাগি করা ঐতিহ্য। গমের একটি সাধারণ রুটি কীভাবে দরবারের বিলাস থেকে গণমানুষের প্রধান খাবারে রূপান্তরিত হলো, তা খাদ্য অর্থনীতির ইতিহাসেও এক শিক্ষণীয় অধ্যায়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)