২০২০ সালের মার্চের শুরুতে, ফাল্গুন মাসে, দেশের নানা জেলায় আম ও লিচু গাছ মুকুলে ছেয়ে যায়। বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলা এবং গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার বাগান ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় প্রায় সব গাছে হলদেটে মুকুলের গুচ্ছ, আর মুকুলে মুকুলে মধু সংগ্রহ করছে মৌমাছি। ফলন শেষ পর্যন্ত আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করবে, তাই ঝড় ও শিলাবৃষ্টি না হলে ভালো ফলনের আশা করছিলেন চাষিরা।
আগৈলঝাড়ায় গত বছরের চেয়ে বেশি মুকুল
আগৈলঝাড়া ও আশপাশের এলাকায় সে বছর আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি গাছে আম আর লিচুর মুকুল দেখা যায়। মৌসুমের শুরুতে হালকা বৃষ্টি হওয়ায় এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ছোট-বড় সব গাছে ব্যাপক মুকুল ধরে। উপজেলা কৃষি অফিসের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, তখনকার আবহাওয়া আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকলে আম ও লিচুর উৎপাদন দ্বিগুণ হতে পারে।
শ্রীপুরের চাষিরা যা বললেন
গাজীপুরের একাধিক আম ও লিচু বাগানে তখন সারি সারি গাছে মুকুলের সমারোহ। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ গাছ বসতবাড়ির আঙিনা বা বাড়ির আশপাশের ফাঁকা জায়গায় লাগানো। চাষিরা জানান, ছোট ও মাঝারি আকারের গাছসহ সব ধরনের গাছে মুকুল এসেছে, আর তাঁরা বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত। মৌসুমি ফল ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় আগেভাগেই আম-লিচুর গাছ কিনে রাখছিলেন।
শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের সিংগার দিঘী গ্রামের আমচাষি ফজলুল হক মোড়ল জানান, তাঁর ২০ বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের ছয় হাজার আমগাছ আছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার গাছে প্রচুর মুকুল এসেছে। তিনি বলেন, "ভালো ফলন পেতে নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করছি। মুকুল আসার আগ থেকে ফল আসা পর্যন্ত সঠিক পরিচর্যা খুবই জরুরি।" তাঁর ধারণা ছিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে সে বছর অন্য বছরের তুলনায় রেকর্ড পরিমাণ আম হবে।
একই উপজেলার আবদার গ্রামের আফাজ উদ্দীন এবং ডোমবাড়ী গ্রামের কয়েকজন লিচুবাগান মালিক জানান, তাঁদের বাগানেও প্রচুর মুকুল এসেছে। আগের মৌসুমে আকস্মিক ঝড়ে লিচুবাগানের অনেক ক্ষতি হয়েছিল, তাই এবার আবহাওয়া ভালো থাকলে তাঁরা ভালো ফলনের আশা করছিলেন। শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুয়ীদুল হাসান বলেন, কৃষি বিভাগ চাষিদের বাগান পরিচর্যার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকলে আম-লিচুর ভালো ফলন হবে।
উত্তরের জেলাগুলোতেও একই ছবি দেখা যায়। ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পোস্ট জানায়, দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলার আমবাগানে প্রচুর মুকুল এসেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) দিনাজপুরের উপপরিচালক তৌহিদুল ইকবাল পত্রিকাটিকে বলেন, সে বছর মুকুল আগেভাগে এসেছে এবং আবহাওয়া ভালো থাকলে আমের ভালো ফলন হবে।

মুকুল থেকে ফল: কেন আবহাওয়াই বড় ভরসা
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, আমের ফুল ছোট, সাদাটে-হলুদ বা বেগুনি রঙের ও সুগন্ধি, আর তা ফোটে ডালের মাথায় বড় মঞ্জরিতে। একটি মুকুলে ১০০ থেকে ২৫০টি ফুলকুঁড়ি থাকতে পারে, তবে প্রায় এক হাজার ফুলের মধ্যে মাত্র একটি বা দুটি পরিপক্ব আমে পরিণত হয়। জানুয়ারি থেকে মার্চে গাছে ফুল আসার সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়ায় ফল ধরা কমে যায়, আর ঝড়, বিশেষ করে শিলাবৃষ্টি, অপরিপক্ব আম ঝরিয়ে দেয়। এ কারণেই চাষিরা মুকুলের সময় আবহাওয়া নিয়ে এত চিন্তিত থাকেন।
লিচু দেশের প্রায় সব জেলায় হতে পারে, তবে প্রধানত রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জে চাষ হয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, দেশের বৃক্ষজাতীয় ফলের মধ্যে উৎপাদনে আমের পরেই লিচুর স্থান। লিচুর মঞ্জরিতে ছোট, সাদাটে ফুল ফোটে; শুকনো গরম বাতাস লিচুর ফলের জন্য ক্ষতিকর।

মুকুলের সময় রোগ ও পোকা: কৃষি বিভাগের পরামর্শ
বাংলাপিডিয়া বলছে, বাংলাদেশে প্রায় তিন ডজন প্রজাতির পোকা আমগাছের ক্ষতি করে; এর মধ্যে আমের হপার পোকা, আমের ভোমরা পোকা, কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা ও ফলের মাছি প্রধান। অ্যানথ্রাকনোজ, শুটি মোল্ড ও পাউডারি মিলডিউর মতো ছত্রাকজনিত রোগও বড় ক্ষতি করে। আক্রান্ত মুকুলে আম ধরে খুব কম বা একেবারেই ধরে না।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) ‘কৃষিকথা’য় ফাল্গুন মাসের করণীয়তে বলা হয়েছে, এ সময় আমের মুকুলে অ্যানথ্রাকনোজ রোগ দেখা দেয় এবং প্রতিটি মুকুলে অসংখ্য হপার পোকার বাচ্চা (নিম্ফ) দেখা যায়। এআইএসের পরামর্শ অনুযায়ী, হপার দমনে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার আগেই একবার এবং এর এক মাস পর আরেকবার গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপালা ভালোভাবে ভিজিয়ে কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। অ্যানথ্রাকনোজ দমনে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে আক্রান্ত গাছে ছত্রাকনাশক এবং আম মটরদানার মতো হলে দ্বিতীয়বার স্প্রে করার কথা বলা হয়েছে। কোন ওষুধ কী মাত্রায় দিতে হবে, তা জানতে চাষিদের উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা উচিত।


ছবি: Sd Raihan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য অ্যাগ্রো নিউজ, বাংলাদেশ পোস্ট (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০), কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষিকথা, ফাল্গুন মাসের কৃষি, ১৪২২), বাংলাপিডিয়া (আম, লিচু), উইকিপিডিয়া (আগৈলঝাড়া উপজেলা, শ্রীপুর উপজেলা)





মন্তব্য
(০)