সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা৩০°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৭ কিমি/ঘ

বোরো ধানের বৈশিষ্ট্য: দেশের সবচেয়ে বড় ধানের মৌসুম

শীতে রোপণ, বৈশাখে কাটা, পুরোপুরি সেচনির্ভর বোরো ধান হেক্টরে ৫ থেকে ৮ টন ফলন দেয় এবং দেশের চালের অর্ধেকের বেশি জোগায়। ১৪০ থেকে ১৫০ দিনের জীবনকাল, বেশি পানির চাহিদা, ব্রি ধান২৮, ২৯ ও লবণসহিষ্ণু ব্রি ধান৬৭সহ বোরোর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো জেনে নিন।

বোরো ধানের বৈশিষ্ট্য: দেশের সবচেয়ে বড় ধানের মৌসুম
ফসল

পৌষের কুয়াশাঢাকা ভোর। হাঁটুসমান ঠান্ডা পানিতে দাঁড়িয়ে সারি ধরে চারা রোপণ করছেন কৃষকেরা, আলের ওপাশে একটানা শব্দ করে চলছে শ্যালো মেশিন। দেশের নানা প্রান্তে শীতের এই দৃশ্যের মধ্য দিয়েই শুরু হয় বোরো মৌসুম। চার-পাঁচ মাস পর, বৈশাখের রোদে সেই মাঠ সোনালি হয়ে ওঠে, আর তখন যে ধান ঘরে ওঠে, তা দিয়েই চলে দেশের মানুষের বছরের বড় একটা অংশের ভাত।

বোরো ধান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ফসল, যা শীতকালীন মৌসুমে, অর্থাৎ রবি মৌসুমে চাষ করা হয়। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণ হয়, আর এপ্রিল-মে মাসে ধান কাটা হয়। এটি সেচনির্ভর ধান; ঠিকমতো পানি আর পরিচর্যা পেলে ভালো ফলন দেয় এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখে। এই প্রতিবেদনে বোরো ধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো একে একে তুলে ধরা হলো।

তিন মৌসুমের ধান, সবচেয়ে বড় বোরো


বাংলাদেশে বছরে তিনটি মৌসুমে ধান হয়: বর্ষার আগে আউশ, বর্ষায় আমন, আর শুকনো শীত-বসন্তে বোরো। একসময় আমনই ছিল প্রধান ফসল, কারণ বৃষ্টির পানিতেই তা হয়ে যেত। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেচযন্ত্র ছড়িয়ে পড়ায় আর উচ্চফলনশীল জাত আসায় শুকনো মৌসুমের বোরো ধীরে ধীরে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে।

সংখ্যাগুলো সেই বদলের সাক্ষী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বোরো আবাদ হয়েছিল প্রায় ৪৮ লাখ ৭৮ হাজার হেক্টরে, আর বোরো থেকে চাল এসেছিল প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টন। সে বছর দেশের মোট চাল উৎপাদন প্রথমবারের মতো ৪ কোটি টন ছাড়ায়, যার অর্ধেকের বেশি এসেছে এই এক মৌসুম থেকে।

আরেকটি হিসাবে দেশের বার্ষিক চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো থেকে। বছরভেদে সংখ্যা কিছুটা ওঠানামা করে, কিন্তু ছবিটা একই থাকে: বোরো ছাড়া বাংলাদেশের ভাতের থালা কল্পনা করা কঠিন। এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে আছে তিনটি বদল: গ্রামে গ্রামে অগভীর নলকূপ ছড়িয়ে পড়া, ব্রির উচ্চফলনশীল জাত এবং রাসায়নিক সারের ব্যাপক ব্যবহার। এই তিনে মিলে যে জমি শীতে একসময় পতিত পড়ে থাকত বা যেখানে ডাল-সরিষা হতো, তার বড় অংশে এখন বোরো।

বোরোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর অনুমানযোগ্যতা। আমন চাষি তাকিয়ে থাকেন আকাশের দিকে: বৃষ্টি কখন আসবে, বন্যা হবে কি না। বোরো চাষির হাতে থাকে পাম্পের সুইচ। এই নিয়ন্ত্রণের কারণেই কৃষক সার, বীজ ও শ্রমে বেশি বিনিয়োগ করতে সাহস পান, আর ফলনও সেই অনুপাতে বাড়ে।

সম্পূর্ণ সেচনির্ভর চাষ


বোরো ধানের প্রথম ও সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর চাষ পুরোপুরি সেচের ওপর নির্ভরশীল। শীত ও বসন্তে দেশে বৃষ্টি খুব কম হয়, অথচ ধানগাছ জীবনের বেশির ভাগ সময় পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে চায়। তাই বীজতলা থেকে শুরু করে ধানে দুধ আসা পর্যন্ত খেতে পানি জোগাতে হয় কৃষককেই।

এই পানি আসে প্রধানত মাটির নিচ থেকে, অগভীর ও গভীর নলকূপে তুলে। নদী, খাল বা বিলের পানি পাম্পে তুলেও অনেক এলাকায় সেচ দেওয়া হয়। সেচের মান যত ভালো, ফলন তত বেশি; আবার সময়মতো পানি না পেলে ফলন দ্রুত কমে যায়। সেচের পেছনে ডিজেল বা বিদ্যুতের খরচ, পাম্প মালিককে দেওয়া ভাড়া, সব মিলিয়ে বোরো চাষের খরচের বড় অংশই যায় পানির পেছনে।

সেচনির্ভরতার একটি দামও আছে। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাপকভাবে তোলার কারণে দেশের কিছু অঞ্চলে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে, যা এখন জাতীয় পর্যায়ের উদ্বেগ হিসেবে গবেষণায় উঠে আসছে। শুকনো মৌসুমের শেষ দিকে অনেক জায়গায় অগভীর নলকূপে পানি ওঠা কমে যায়। তাই বোরো চাষে পানি সাশ্রয়ের কৌশল এখন শুধু খরচ কমানোর প্রশ্ন নয়, ভবিষ্যতের প্রশ্নও।

উচ্চ ফলনশীলতা


বোরো মৌসুমে মূলত উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষ হয়, আর তা থেকে প্রতি হেক্টরে ৫ থেকে ৮ টন পর্যন্ত ধান পাওয়া যায়। আমন বা আউশের তুলনায় এই ফলন সাধারণত বেশি, কারণ শীতের শুকনো মৌসুমে রোদ বেশি থাকে, মেঘ কম, আর পানি নিয়ন্ত্রণ কৃষকের হাতে থাকে। বন্যা বা অতিবৃষ্টির অনিশ্চয়তাও এ সময় তুলনামূলক কম।

বোরোর সবচেয়ে পরিচিত দুটি জাত হলো ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯, দুটিই বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ব্রির উদ্ভাবন। ব্রির তথ্যমতে, এই দুই জাত মিলে দীর্ঘদিন বোরো আবাদি জমির অর্ধেকেরও বেশি দখল করে ছিল। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্রি ধান২৮-এর জীবনকাল প্রায় ১৪০ দিন এবং ভালো ব্যবস্থাপনায় হেক্টরে প্রায় ৬ টন ফলন দেয়; ব্রি ধান২৯ পাকতে প্রায় ১৬০ দিন নেয়, তবে ফলন ক্ষমতা হেক্টরে প্রায় সাড়ে ৭ টন। হাইব্রিড জাতগুলোর ফলন ক্ষমতাও বেশি, যদিও প্রতি মৌসুমে নতুন বীজ কিনতে হয়।

বীজতলা থেকে মূল জমি


বোরো চাষের পদ্ধতিতেও কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমে বীজতলায় চারা তৈরি করা হয়, তারপর সেই চারা তুলে কাদা করা মূল জমিতে রোপণ করা হয়। শীতে চারা ধীরে বাড়ে বলে বোরোর চারা বীজতলায় তুলনামূলক বেশি দিন থাকে; গবেষণায় ব্রি ধান২৯-এর মতো জাতের প্রায় ৪০ দিন বয়সী চারা রোপণের উদাহরণ পাওয়া যায়। বয়সের চেয়েও বড় মাপকাঠি হলো পাতার সংখ্যা: চারায় পাঁচ থেকে ছয়টি পাতা এলে রোপণ করলে ভালো ফলন মেলে বলে গবেষকেরা বলেন।

বীজতলার যত্নেই অর্ধেক ফসল, গ্রামে এমন কথা প্রচলিত আছে। সুস্থ, খাটো ও মোটা চারা মূল জমিতে দ্রুত লেগে যায় এবং বেশি কুশি ছাড়ে। দুর্বল, লম্বাটে চারা রোপণের পর অনেক দিন ঝিমিয়ে থাকে, আর সেই সময়টুকু পুরো মৌসুমের হিসাবে ক্ষতি হয়ে দাঁড়ায়।

রোপণের সময় সারি থেকে সারির দূরত্ব সাধারণত ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার এবং গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটারের মতো রাখা হয়। সারিতে লাগালে খেতে আলো-বাতাস চলে, আগাছা পরিষ্কার ও পোকা দেখা সুবিধাজনক হয়। ইউরিয়া সার একবারে না দিয়ে সাধারণত তিন কিস্তিতে দেওয়া হয়: চারা লেগে যাওয়ার পর, কুশি ছাড়ার সময় এবং থোড় আসার আগে। এতে গাছ যখন যতটুকু দরকার, ততটুকু নাইট্রোজেন পায়, অপচয়ও কম হয়।

শীতে শুরু, গরমে শেষ


বোরো ধানের জীবনচক্র ঋতুর সঙ্গে মিলিয়ে সাজানো। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির ঠান্ডা আবহাওয়ায় চাষ শুরু হয়, আর এপ্রিল-মে মাসের গরমে ধান কাটা হয়। ঠান্ডা, কম বৃষ্টির শুকনো আবহাওয়ায় বোরো ধান ভালোভাবে বেড়ে ওঠে; পরে গরম বাড়লে দানা দ্রুত পুষ্ট হয় ও পাকে।

তবে শীত বেশি পড়লে সমস্যাও হয়। তীব্র শৈত্যপ্রবাহের সময় বীজতলার চারা হলুদ হয়ে যেতে পারে, বৃদ্ধি থেমে যেতে পারে। সে কারণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও ব্রি শৈত্যপ্রবাহের সময় বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিনে ঢেকে রাখা, শৈত্যপ্রবাহ দীর্ঘ হলে দুই পাশ আংশিক খোলা রেখে দিনরাত ঢেকে রাখা এবং প্রয়োজনমতো হালকা সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেয়। আবার মৌসুমের শেষ দিকে কালবৈশাখী, শিলাবৃষ্টি বা আগাম বন্যা পাকা ধানের ক্ষতি করতে পারে, তাই সময়মতো কাটা জরুরি।

উন্নত ও সহনশীল জাতের ব্যবহার


বোরো মৌসুমে এখন শুধু বেশি ফলনের জাত নয়, প্রতিকূলতা সইতে পারে এমন জাতও চাষ হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় শুকনো মৌসুমে মাটি ও পানিতে লবণ বেড়ে যায়, যা সাধারণ ধানের জন্য ক্ষতিকর। এসব জমির জন্য ব্রি লবণাক্ততা সহনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। যেমন ব্রি ধান৬৭, যা বোরো মৌসুমের লবণসহিষ্ণু জাত হিসেবে অনুমোদন পায়। ব্রির তথ্য অনুযায়ী এর জীবনকাল প্রায় ১৪৫ দিন, চারা অবস্থায় এটি ১২ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার এবং পুরো জীবনকালে ৮ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। লবণাক্ততার মাত্রাভেদে এর ফলন হেক্টরে ৩.৮ থেকে ৭.৪ টন।

পুরোনো জাতগুলোর জায়গা নিতে নতুন জাতও এসেছে। ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ বহু বছর চাষ হওয়ায় এদের ফলন সক্ষমতা কমে আসছে এবং রোগের প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়ছে বলে ব্রি জানিয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে ২০১৮ সালে অবমুক্ত ব্রি ধান৮৮ প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৩ দিনে পাকে এবং হেক্টরে প্রায় ৭ টন ফলন দিতে পারে। ব্রি ধান৮৯ ও ব্রি ধান৯২ মাঠ পর্যায়ে ব্রি ধান২৯-এর চেয়ে বেশি ফলন দেখিয়েছে। কিছু জাত খরা বা জলাবদ্ধতাও সহ্য করতে পারে।

উপকূলের জন্য এর আগেও লবণসহিষ্ণু বোরো জাত এসেছে; যেমন ব্রি ধান৪৭, যা কৃষকের অংশগ্রহণে মাঠে যাচাইয়ের মাধ্যমে বোরো মৌসুমের লবণসহিষ্ণু জাত হিসেবে বাছাই করা হয়। এসব জাতের কারণে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মতো জেলার যেসব জমি শীতে লবণের কারণে পতিত থাকত, তার একাংশে এখন বোরো হচ্ছে। নতুন জাত মাঠে পৌঁছাতে কয়েক বছর লাগে, কারণ কৃষককে বীজ পেতে হয়, নিজের জমিতে ফল দেখে আস্থা পেতে হয়। এ কাজে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএডিসির বীজ বিতরণ বড় ভূমিকা রাখে।

দীর্ঘ জীবনকাল


বোরো ধানের জীবনকাল সাধারণত ১৪০ থেকে ১৫০ দিন, অর্থাৎ বীজ বোনা থেকে ধান কাটা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস। শীতের ঠান্ডায় গাছ ধীরে বাড়ে বলেই এত সময় লাগে। এই দীর্ঘ সময়ে গাছ ধীরে ধীরে শক্তি জমায়, আর তার প্রভাব পড়ে দানার গুণগত মানে।

দীর্ঘ জীবনকালের অন্য দিকও আছে। জমি যত বেশি দিন ধানে আটকে থাকে, সেচ তত বেশি লাগে, খরচও বাড়ে। আবার হাওরের মতো এলাকায় দেরিতে পাকা ধান আগাম বন্যার ঝুঁকিতে পড়ে। তাই এলাকাভেদে জাত বাছাই গুরুত্বপূর্ণ: যেখানে আগাম বন্যার ভয়, সেখানে কম জীবনকালের জাত; যেখানে সময় আছে, সেখানে বেশি ফলনের দীর্ঘ জীবনকালের জাত।

পানির প্রয়োজনীয়তা


বোরো ধান পানিপ্রিয় ফসল। হিসাব অনুযায়ী প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ লিটার পানি লাগে। পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ফলন কমে যায়, বিশেষ করে থোড় আসা থেকে ফুল ফোটার সময় পানির টান পড়লে দানা চিটা হয়ে যেতে পারে।

এই পানি কম খরচে ও কম অপচয়ে দেওয়ার জন্য ব্রি একটি পদ্ধতি প্রচলন করেছে, যার নাম পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো, ইংরেজিতে সংক্ষেপে এডব্লিউডি। ফিলিপাইনে এই পদ্ধতির পরীক্ষা শুরু হয় ২০০২ সালে, আর বাংলাদেশে ব্রিতে এর প্রথম মাঠ পরীক্ষা হয় ২০০৫ সালে। পদ্ধতিটি এরকম: খেতে ২০ সেন্টিমিটার গভীর করে ছিদ্রযুক্ত একটি প্লাস্টিকের পাইপ বসানো হয়। চারা রোপণের প্রায় ১৫ দিন পর থেকে সেচ দেওয়ার পর পাইপের ভেতরে পানির স্তর মাটির ২০ সেন্টিমিটার নিচে নামলে তবেই আবার সেচ দেওয়া হয়। তবে ফুল আসা থেকে দানা শক্ত হওয়া পর্যন্ত খেতে ২ থেকে ৪ সেন্টিমিটার পানি রাখতে হয়।

ব্রির রাইস নলেজ ব্যাংকের তথ্যমতে এই পদ্ধতিতে ফলন না কমিয়েই সেচের পানি প্রায় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি সাশ্রয় করা যায়। এতে ভূগর্ভস্থ পানি কম তোলা লাগে, ডিজেল বা বিদ্যুৎ কম পোড়ে, কৃষকের টাকা বাঁচে।

পদ্ধতিটির মূল যুক্তি হলো, ধানগাছের শিকড় সব সময় পানিতে ডুবে থাকার দরকার নেই। মাটি কিছুটা শুকালে শিকড় বরং গভীরে যায়, গাছ শক্ত হয়। পাইপটি কৃষকের চোখ হিসেবে কাজ করে: বাইরে থেকে খেত শুকনো মনে হলেও পাইপের ভেতর তাকিয়ে বোঝা যায় মাটির নিচে এখনো কতটা পানি আছে। পাইপ হিসেবে পুরোনো প্লাস্টিকের নল বা বাঁশের চোঙও ব্যবহার করা যায়, খরচ সামান্য।

যেখানে পাম্পের মালিককে মৌসুম চুক্তিতে টাকা দেওয়া হয়, সেখানে কৃষকের নিজের পানি বাঁচানোর তাগিদ কম থাকে, আর এটিই এই পদ্ধতি ছড়ানোর পথে একটি বাধা বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন। ঘণ্টা বা পানির পরিমাণ ধরে দাম দেওয়ার ব্যবস্থা হলে পানি সাশ্রয় সরাসরি কৃষকের লাভে পরিণত হয়।

রোগ ও পোকামাকড়


বোরো ধানের কিছু উন্নত জাত ব্লাস্ট রোগ ও পাতামোড়ানো পোকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা রাখে। ব্লাস্ট একটি ছত্রাকজনিত রোগ, যাতে পাতায় চোখের মতো দাগ পড়ে, আর শিষের গোড়া বা গিঁট আক্রান্ত হলে পুরো শিষ সাদা হয়ে চিটা হয়ে যায়; একে নেক ব্লাস্ট বা শিষ ব্লাস্ট বলা হয়। পাতামোড়ানো পোকার কীড়া পাতা লম্বালম্বি মুড়িয়ে ভেতরের সবুজ অংশ খায়, ফলে পাতায় সাদা লম্বা দাগ পড়ে।

জাত বাছাইয়ে প্রতিরোধ ক্ষমতা কেন জরুরি, তা বোঝা যায় ২০১৭ সালের অভিজ্ঞতা থেকে। সে বছরের একটি গবেষণায় বোরো মৌসুমে ব্লাস্টে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত জাত হিসেবে ব্রি ধান২৮ (রোগের তীব্রতা ২৯.৬ শতাংশ) ও ব্রি ধান২৯ (২৫.৯ শতাংশ) চিহ্নিত হয়। তবে প্রতিরোধী জাত হলেই নিশ্চিন্ত থাকা যায় না; রোগবালাই কমাতে নিয়মিত খেত পর্যবেক্ষণ, সুষম সার, বিশেষ করে অতিরিক্ত ইউরিয়া এড়িয়ে চলা, আর প্রয়োজনে সঠিক সময়ে অনুমোদিত বালাইনাশক প্রয়োগ দরকার।

দানার গুণগত মান


বোরো ধানের দানার মান তুলনামূলক ভালো এবং ভাত হিসেবে খাওয়ার জন্য উৎকৃষ্ট। অধিকাংশ জনপ্রিয় বোরো জাতের দানা মাঝারি আকারের ও মসৃণ। শহরের বাজারে যে মাঝারি চিকন চাল বেশি বিক্রি হয়, তার বড় অংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে।

বোরো ধান কাটা হয় শুকনো, রোদেলা সময়ে, তাই মাড়াই ও শুকানো তুলনামূলক সুবিধাজনক। ঠিকমতো শুকালে এই ধান দীর্ঘদিন গুদামে রাখা যায়, আর চালকলে ভাঙানোর সময় ভাঙা চালের পরিমাণও কম থাকে। তবে বৈশাখের হঠাৎ ঝড়বৃষ্টিতে কাটা ধান ভিজে গেলে মান নষ্ট হতে পারে, তাই কাটার পর দ্রুত মাড়াই ও শুকানো জরুরি।

কখন কাটতে হয়


বোরো ধান কাটার সময় চেনাও একটি দক্ষতা। শিষের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ দানা পেকে গেলে ধান কাটার উপযুক্ত সময় বলে ধরা হয়। এর আগে কাটলে দানা পুরো পুষ্ট হয় না, চাল ভাঙে বেশি; আবার অনেক দেরি করলে পাকা দানা খেতেই ঝরে পড়ে, ঝড় বা শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ে।

বোরো কাটার মৌসুমে গ্রামে শ্রমিকের চাহিদা হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়, আর অনেক এলাকায় সময়মতো শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে কম্বাইন হারভেস্টার, অর্থাৎ যে যন্ত্র একসঙ্গে ধান কাটে, মাড়াই করে ও ঝাড়াই করে, তার ব্যবহার বাড়ছে, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের হাওরে। সরকার হাওর এলাকায় এই যন্ত্র কিনতে ৭০ শতাংশ এবং সমতলে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়েছে।

কাটার পর ধান ভালোভাবে শুকানো সমান জরুরি। ভেজা ধান গাদা করে রাখলে গরমে দানা নষ্ট হয়, রং বদলে যায়, বাজারে দাম কমে। রোদে পাতলা করে বিছিয়ে কয়েক দিন শুকিয়ে তবেই গোলায় বা বস্তায় তোলা ভালো। দাঁতে কামড় দিলে দানা কট করে ভাঙলে বোঝা যায় ধান যথেষ্ট শুকিয়েছে, গ্রামের কৃষকেরা বহুদিন ধরে এভাবেই পরীক্ষা করে আসছেন।

খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান


বোরো ধান দেশের মোট চাল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় অংশ সরবরাহ করে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বোরো মৌসুম ভালো গেলে বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল থাকে, সরকারি গুদামে মজুত বাড়ে; খারাপ গেলে আমদানির চাপ বাড়ে।

বোরো কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় যখন এটি মার খায়। ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জসহ হাওর অঞ্চলে আগাম ঢলে পাকার আগেই বিস্তীর্ণ বোরো খেত তলিয়ে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে সে সময় প্রায় ২ লাখ হেক্টরের বোরো পানির নিচে চলে যায় এবং প্রায় ৬ লাখ টন ফসলের ক্ষতি হয়। এক মৌসুমের এমন ক্ষতির প্রভাব পড়ে সারা দেশের চালের বাজারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কাছে এর মানে ছিল আরও কঠিন: অনেক পরিবারের সারা বছরের খোরাক আর ধারদেনা শোধের ভরসা ছিল ওই একটি ফসল। এক ঢলে তাঁদের সারা বছরের পরিশ্রম পানিতে মিশে যায়।

হাওর অঞ্চলের গুরুত্ব আলাদা করে বলা দরকার। সংবাদমাধ্যমের হিসাবে দেশের বোরো উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওর থেকে। তাই হাওরে ফসল ভালো হলে সারা দেশ স্বস্তি পায়, আর ঢলে ডুবলে তার ধাক্কা লাগে সবখানে। এ কারণেই হাওরে বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, কম জীবনকালের জাত আর দ্রুত ধান কাটার যন্ত্র নিয়ে প্রতি বছর আলোচনা হয়।

চাষের জন্য উপযোগী জমি


বোরো ধান চাষের জন্য উঁচু এবং মাঝারি নিচু জমি আদর্শ, যেখানে সেচের পানি দেওয়া ও প্রয়োজনে বের করে দেওয়া যায়। যে জমিতে পানি সারা বছর আটকে থাকে, নিষ্কাশনের কোনো পথ নেই, এমন জলাবদ্ধ জমিতে বোরো চাষ না করাই ভালো, কারণ সেখানে গাছের শিকড় ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারে না, আর সার ও পরিচর্যার সুফলও মেলে না।

হাওর বা বিলের মতো নিচু এলাকায় বর্ষায় জমি পানিতে ডুবে থাকে, তবে শীতে পানি নেমে গেলে সেই জমিতেই বোরো চাষ হয়; এসব এলাকার একমাত্র ফসলই অনেক সময় বোরো। এখানে সাফল্য নির্ভর করে পানি নামার সময়, জাতের জীবনকাল আর আগাম ঢল আসার আগে ধান কেটে ফেলার ওপর।

পানি সামলাতে পারলেই সবচেয়ে ভরসার ফসল


সব মিলিয়ে বোরো ধানের চরিত্র এরকম: শীতে শুরু, গরমে শেষ; পুরোপুরি সেচনির্ভর; উচ্চফলনশীল; দীর্ঘ জীবনকাল; পানির চাহিদা বেশি; রোগ প্রতিরোধী ও লবণসহিষ্ণু জাতের সুযোগ; ভালো মানের দানা; আর দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। এর প্রতিটি বৈশিষ্ট্যই এক সুতোয় বাঁধা, আর সেই সুতো হলো পানি।

যে কৃষক ঠিক সময়ে ঠিক পরিমাণ পানি দিতে পারেন, মাটির উপযোগী জাত বেছে নেন এবং নিয়মিত খেতের খোঁজ রাখেন, তাঁর জন্য বোরোই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফসল। আর দেশের জন্য বোরো হলো সেই মৌসুম, যার দিকে তাকিয়ে প্রতি বছর চালের হিসাব কষা হয়।

ছবি: সিলেটে বোরো ধানের খেত, AbuSayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

রেকর্ড এল নিনোর অতিবৃষ্টিতে থমকে যুক্তরাষ্ট্রের ফসল কাটা

নিউট্রিয়েন অ্যাগ সলিউশনসের আবহাওয়াবিদ এরিক স্নডগ্রাস বলছেন, ২০১৫ সালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া এল নিনোর প্রভাবে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে কর্ন বেল্টের কিছু এলাকায় ৩০ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। সামনে শুকনো কিছুদিন আর উত্তরে উষ্ণ শীতের আভাস।

Pro Farmer২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমে ছড়াচ্ছে সয়াবিনের রেড ক্রাউন রট, এবার আইওয়ায়

আইওয়ায় এ বছর মাটিবাহিত এই সয়াবিন রোগের প্রথম দুটি ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, খারাপ অংশে ফলন ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কমতে পারে; খেত পরিদর্শন, পরীক্ষা আর এক খেত থেকে অন্য খেতে মাটি যাওয়া ঠেকানো জরুরি।

DTN / Progressive Farmer২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
জৈব

ইউরোপের জৈব কৃষিতে জাত উদ্ভাবনের নতুন নিয়মে কৃষকের পছন্দ কমতে পারে: ইউরোসিডস

ইইউর জৈব উৎপাদন বিধি সংশোধন নিয়ে অবস্থানপত্রে বীজশিল্পের সংগঠন ইউরোসিডস সংশোধনী ১৪ বাদ দিতে বলেছে, যা জৈব জাত কীভাবে উদ্ভাবন হবে সে বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনকে বাড়তি নিয়ম করার ক্ষমতা দিত।

Seed World Europe২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)