ফাল্গুনের শুরুতে রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো আমবাগানে ঢুকলে মুকুলের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে থাকে। বাগানমালিক গাছের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হিসাব কষেন, এবার কত মণ আম নামবে। কিন্তু সেই হিসাব উল্টে দিতে পারে চোখে প্রায় না পড়া কয়েকটি পোকা। কয়েক দিনের মধ্যে মুকুল কালো হয়ে ঝরে যায়, কচি গুটি পড়ে থাকে গাছের তলায়, আর পাকার মুখে ফল কেটে দেখা যায় ভেতরে পোকা। আম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ফল। এর চাষে নানা রকম ক্ষতিকর পোকামাকড় সমস্যা তৈরি করে, তবে ঠিক সময়ে চিনতে পারলে এবং সঠিক ব্যবস্থা নিলে প্রায় সবকটিকেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
আমের বাজার বড়, ঝুঁকিও বড়
বাংলাদেশে আম এখন শুধু মৌসুমি ফল নয়, উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির বড় ভরসা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশে আমের উৎপাদন ২৫ লাখ টন ছাড়িয়েছে। জেলার হিসাবে সবচেয়ে বেশি আম আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে, যাকে আমের রাজধানী বলা হয়; এর পরে নওগাঁ, রাজশাহী ও নাটোর। চাঁপাইনবাবগঞ্জেই প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান।
এত বড় একটি ফসলের সামান্য অংশও যদি পোকায় নষ্ট হয়, তার আর্থিক ক্ষতি বিশাল। আবার বিদেশে আম রপ্তানির চেষ্টাও চলছে, যেখানে দাগহীন, পোকামুক্ত এবং নিয়ম মেনে কীটনাশক দেওয়া ফলই শুধু জায়গা পায়। তাই আমের প্রধান ক্ষতিকর পোকাগুলো চেনা, কোনটি কখন আক্রমণ করে জানা, আর কোন ব্যবস্থায় সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে বেশি কাজ হয়, সেটা বোঝা বাগানমালিকের জন্য জরুরি। নিচে আমবাগানের ছয়টি প্রধান শত্রুর পরিচয়, ক্ষতির ধরন আর দমনের উপায় আলাদা করে তুলে ধরা হলো।
ফল ছিদ্রকারী পোকা: ফলের ভেতরে লুকানো শত্রু
নাম শুনেই বোঝা যায়, এই পোকা আমের ভেতরে ঢুকে পড়ে। বাইরে থেকে ফলটি দেখতে প্রায় ঠিকঠাক মনে হয়, হয়তো ছোট একটি দাগ বা ছিদ্র থাকে। কিন্তু ভেতরে পোকা শাঁস খেয়ে নষ্ট করে দেয়। আক্রান্ত ফল পচে যায়, অনেক সময় পাকার আগেই ঝরে পড়ে। যে আম বাজারে যায়, সেটিও কাটলে পোকা বেরোলে ক্রেতার আস্থা নষ্ট হয়, দাম কমে যায়।
দমনের প্রথম কাজ পরিচ্ছন্নতা। আক্রান্ত ফল গাছ থেকে পেড়ে এবং তলায় পড়ে থাকা ফল কুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলতে হবে, যাতে ভেতরের পোকা বড় হয়ে আবার বাগানে ছড়াতে না পারে। মাটিতে গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলা একটি কার্যকর উপায়। বাগানে ফেরোমন ফাঁদ ঝোলানো যায়। ফেরোমন হলো পোকার শরীর থেকে বের হওয়া এক ধরনের গন্ধ, যা দিয়ে তারা সঙ্গী খোঁজে; ফাঁদে সেই গন্ধের কৃত্রিম টোপ রেখে পুরুষ পোকাকে টেনে এনে আটকানো হয়। এতে পোকার বংশবৃদ্ধি কমে, আবার বাগানে কত পোকা আছে তারও ধারণা পাওয়া যায়।
আক্রমণ বেশি হলে রাসায়নিক দমনের প্রয়োজন হয়। প্রচলিত পরামর্শে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলিলিটার ডেল্টামেথ্রিন বা সাইপারমেথ্রিন মিশিয়ে স্প্রে করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবার পরামর্শ হলো, ফল ছিদ্রকারী পোকার বিরুদ্ধে মুকুল আসার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ পোকা ফলের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর স্প্রে করে বিশেষ লাভ হয় না; সময়ের আগে প্রস্তুতিই আসল।
এখানে একটি প্রচলিত ভুলের কথা বলা দরকার। অনেক বাগানমালিক একটি ফল পোকায় ধরলে পুরো বাগানে বারবার কড়া ওষুধ ছিটাতে থাকেন। এতে খরচ বাড়ে, উপকারী পোকা মরে, আর ফলের গায়ে বিষের অবশেষ থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। তার চেয়ে ভালো উপায় হলো নিয়মিত বাগান ঘুরে আক্রান্ত ফল খুঁজে সরিয়ে ফেলা, ফাঁদ দিয়ে পোকার সংখ্যা বোঝা, আর আক্রমণ সত্যিই বেশি হলে তবেই অনুমোদিত মাত্রায় স্প্রে করা। বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা এ ক্ষেত্রে ১০ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রের কথা বলে, এর বেশি নয়।
লাল মাকড়: পাতার রস চুষে খায়
লাল মাকড়কে অনেকে মাকড়সা পোকা বলেন, তবে এটি আসলে পোকা নয়, মাকড়সার আত্মীয় ক্ষুদ্র একটি প্রাণী। আকারে এত ছোট যে খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না, বিবর্ধক কাচে দেখতে হয়। এরা পাতার নিচের দিকে দল বেঁধে থাকে এবং পাতার রস চুষে খায়। ফলে পাতায় সাদাটে বা হলদে ছোট ছোট দাগ পড়ে, পাতা বিবর্ণ হয়ে যায়। পাতা ঠিকমতো খাবার তৈরি করতে না পারায় গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
শুকনো, গরম আবহাওয়ায় লাল মাকড় দ্রুত বাড়ে। তাই নিয়মিত সেচ দিয়ে মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখলে এদের দাপট কমে। আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার অ্যাবামেকটিন মিশিয়ে স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মনে রাখা দরকার, মাকড় সাধারণ কীটনাশকে অনেক সময় মরে না; মাকড়ের জন্য আলাদা করে তৈরি ওষুধ, যাকে মাকড়নাশক বলে, সেটাই কাজ করে।
হপার পোকা: মুকুলের সবচেয়ে বড় শত্রু
আমচাষির কাছে সবচেয়ে পরিচিত এবং সবচেয়ে ভয়ের নাম হপার পোকা। গ্রামে একে শোষক পোকা বা ফুদকি পোকাও বলা হয়। ছোট, তিনকোনা আকারের এই পোকা গাছের বাকলের ফাটলে লুকিয়ে থাকে, মুকুল এলেই বেরিয়ে আসে। এরা মুকুল ও কচি পাতার রস চুষে খায়, ফলে মুকুল শুকিয়ে বাদামি হয়ে ঝরে যায়। গাছ ঝাঁকালে ঝাঁকে ঝাঁকে পোকা উড়তে দেখা যায়।
হপার শুধু রস খেয়েই ক্ষতি করে না। এর শরীর থেকে মধুর মতো আঠালো মিষ্টি রস বের হয়, যা পাতা ও মুকুলে জমে থাকে। সেই রসের ওপর কালো রঙের ছত্রাক জন্মায়, যাকে শুটি মোল্ড বলে। পাতা কালো আস্তরণে ঢেকে গেলে সূর্যের আলো পায় না, খাবার তৈরি কমে যায়। ফলে ফলন কমে, যে গুটি টিকে থাকে সেগুলোও ছোট হয়।
দমনের জন্য গাছের গোড়া পরিষ্কার রাখতে হবে এবং বাগানে অতিরিক্ত সেচ এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ স্যাঁতসেঁতে, ঘন ছায়াঘেরা বাগানে হপার বেশি বাড়ে। রাসায়নিক দমনে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলিলিটার ইমিডাক্লোপ্রিড স্প্রের পরামর্শ দেওয়া হয়। স্প্রের সময় নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবার পরামর্শ স্পষ্ট: মুকুল যখন ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার লম্বা হয় তখন প্রথমবার, আর আম যখন মটরদানার আকার পায় তখন দ্বিতীয়বার। পুরো ফুল ফোটা অবস্থায় স্প্রে না করাই ভালো, কারণ তখন বাগানে পরাগায়ণের কাজ করা মৌমাছি ও মাছি থাকে। গাছের ডালপালা ছেঁটে বাগানে আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখলেও হপারের আক্রমণ কমে।
কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা: গাছকে ভেতর থেকে দুর্বল করে
এই পোকার আক্রমণ বোঝা যায় কাণ্ড বা মোটা ডালের গায়ে ছোট ছিদ্র দেখে। ছিদ্রের মুখে এবং গাছের গোড়ায় কাঠের গুঁড়ার মতো মিহি গুঁড়া জমে থাকে, সঙ্গে থাকে পোকার মল। পোকার কীড়া কাণ্ডের ভেতরে সুড়ঙ্গ কেটে এগোয় এবং রস চলাচলের পথ নষ্ট করে। দীর্ঘদিন আক্রান্ত থাকলে ডাল শুকিয়ে যায়, গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফলন কমে যায়। পুরোনো ও অযত্নে থাকা বাগানে এই পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়।
দমনের প্রচলিত পদ্ধতি হলো ছিদ্রের ভেতরে কীটনাশক ঢেলে মুখ কাদামাটি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া, যাতে ভেতরের কীড়া মারা যায়। পুরোনো পরামর্শে এ কাজে মনোক্রোটোফস নামের একটি কীটনাশকের কথা বলা হতো। তবে পাঠকের জানা দরকার, আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০০০ সালের শেষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণিবিভাগে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রথম শ্রেণির সব কীটনাশক কৃষিতে নিষিদ্ধ করে, আর মনোক্রোটোফস সেই তালিকায় ছিল। তাই এখন এ কাজে উপজেলা কৃষি অফিসের অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
গাছের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এই পোকা ঠেকানোর আরেকটি উপায়। মরা ও শুকনো ডাল কেটে সরিয়ে ফেললে পোকা লুকানোর জায়গা পায় না। কাটা ডালের মুখে আলকাতরা বা ছত্রাকনাশকের প্রলেপ দিলে সেখান দিয়ে নতুন করে পোকা বা রোগ ঢুকতে পারে না। নিয়মিত বাগান ঘুরে ছিদ্র খুঁজে দেখার অভ্যাস থাকলে আক্রমণ শুরুতেই ধরা পড়ে।
পাতা মোড়ানো পোকা: জাল বুনে পাতা খায়
বাগানে কিছু ডালের আগায় পাতাগুলো জাল দিয়ে একসঙ্গে জড়ানো অবস্থায় দেখা গেলে বুঝতে হবে পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ হয়েছে। এই পোকার কীড়া পাতা একত্র করে রেশমের মতো সুতার জাল বোনে এবং তার ভেতরে থেকে পাতা খায়। জালের ভেতরে থাকায় বাইরে থেকে ছিটানো ওষুধ অনেক সময় পোকার গায়ে পৌঁছায় না। আক্রান্ত পাতা বাদামি হয়ে শুকিয়ে যায়, গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জাল ধরা আক্রান্ত পাতা ও ডগা আঁকশি দিয়ে কেটে সংগ্রহ করা এবং পুড়িয়ে ফেলা। এতে জালের ভেতরের সব কীড়া একসঙ্গে ধ্বংস হয়। এরপর জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা যায়। এ ক্ষেত্রে বিটি বেশ কার্যকর। বিটি হলো ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস নামের মাটির এক ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি কীটনাশক, যা শুঁয়োপোকা ও কীড়া জাতীয় পোকার পেটে গিয়ে কাজ করে, কিন্তু মানুষ, পাখি বা মৌমাছির তেমন ক্ষতি করে না। এজন্য একে পরিবেশবান্ধব দমন ব্যবস্থা ধরা হয়।
ছাতরা পোকা: সাদা তুলার মতো আস্তরণ
অনেকে একে আম ছাতা পোকা বলেন, তবে মাঠে এটি ছাতরা পোকা নামেই বেশি পরিচিত, ইংরেজিতে মিলিবাগ। এর শরীর সাদা মোমের মতো গুঁড়ায় ঢাকা, তাই দূর থেকে কচি ডাল, মুকুল ও গুটির গায়ে সাদা তুলার দলার মতো দেখায়। এরা দল বেঁধে রস চুষে খায়, ফলে মুকুল ও গুটি ঝরে যায়। হপারের মতো এদের শরীর থেকেও মিষ্টি রস বের হয়, আর তার ওপর কালো ছত্রাক জন্মে পাতা কালো করে দেয়। গাছের বৃদ্ধি ও ফলন দুটোই কমে।
ছাতরা পোকার বাচ্চা মাটি থেকে গাছের কাণ্ড বেয়ে ওপরে ওঠে। এই স্বভাব কাজে লাগিয়েই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে: গাছের গোড়ার দিকে কাণ্ডে আঠালো ব্যান্ড বা পলিথিনের চওড়া বেড় লাগিয়ে দেওয়া। পোকা বেয়ে উঠতে গিয়ে আঠায় আটকে যায় বা পিছলে পড়ে যায়। আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলিলিটার ডাইমিথোয়েট স্প্রের পরামর্শ দেওয়া হয়। জৈব পদ্ধতিতে লেডিবার্ড বিটল কাজে লাগানো যায়। লাল কালো ফোঁটাওয়ালা এই ছোট গুবরে পোকা ছাতরা ও জাব পোকা খেয়ে বাঁচে, তাই বাগানে এদের দেখলে মেরে ফেলা উচিত নয়।
যত্নে থাকা বাগানে পোকা কম
অভিজ্ঞ আমচাষিরা একটি কথা প্রায়ই বলেন: অযত্নের বাগানেই পোকা ঘর বাঁধে। কথাটির পেছনে যুক্তি আছে। ঘন ডালপালায় ঢাকা, আলো বাতাস না ঢোকা গাছে হপার, ছাতরা ও পাতা মোড়ানো পোকা নিরাপদ আশ্রয় পায়। মরা ডাল আর গাছের ফাটলে পোকার ডিম ও কীড়া লুকিয়ে থাকে। গাছের তলায় জমে থাকা পাতা ও পচা ফল পরের মৌসুমের পোকার উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
তাই আম পাড়ার পর গাছের মরা, রোগা ও ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া ডাল ছেঁটে দেওয়া পোকা দমনেরই অংশ। ছাঁটাই করলে গাছের ভেতরে আলো ঢোকে, নতুন ডাল আসে, আর স্প্রে করলে ওষুধ সব জায়গায় পৌঁছায়। সুষম সার ও সময়মতো সেচ গাছকে সবল রাখে; সবল গাছ পোকার আক্রমণ সহ্য করে দ্রুত সেরে ওঠে। বাগানের মাটি আগাছামুক্ত রাখলে পোকার লুকানোর জায়গাও কমে।
আরেকটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার। মুকুল কালো হয়ে ঝরে যাওয়ার কারণ সবসময় পোকা নয়; অ্যানথ্রাকনোজ নামের ছত্রাকজনিত রোগেও মুকুল ও গুটিতে কালো দাগ পড়ে ঝরে যায়। পোকার জন্য কীটনাশক আর রোগের জন্য ছত্রাকনাশক আলাদা জিনিস। কারণ না বুঝে ভুল ওষুধ দিলে টাকা যায়, সমস্যা থেকে যায়। তাই সন্দেহ হলে আক্রান্ত মুকুল বা পাতা নিয়ে কৃষি অফিসে দেখিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
পোকা দমনে সাধারণ নিয়ম
প্রতিটি পোকার আলাদা চরিত্র থাকলেও কয়েকটি নিয়ম সব পোকার ক্ষেত্রেই কাজে আসে। কৃষিবিদেরা একে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বলেন: আগে পরিচ্ছন্নতা ও প্রাকৃতিক উপায়, তারপর জৈব কীটনাশক, আর একেবারে শেষে প্রয়োজন হলে রাসায়নিক কীটনাশক। এই ক্রম মেনে চললে খরচ কমে, উপকারী পোকা বাঁচে, আর ফলে বিষের অবশেষ থাকার ঝুঁকিও কমে।
- বাগান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন; আগাছা ও জঙ্গল সরিয়ে ফেলুন।
- গাছের নিচে পড়ে থাকা ফল ও পাতা নিয়মিত সরিয়ে নষ্ট করুন, কারণ এগুলোতে পোকার ডিম ও কীড়া থাকে।
- জৈব কীটনাশক ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে পোকা নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিন।
- রাসায়নিক কীটনাশক কেবল প্রয়োজন হলে ব্যবহার করুন, আর মাত্রা ও সময়ের দিকে কড়া নজর রাখুন।
- স্প্রের সময় মুখোশ, দস্তানা ও পুরো হাতার জামা পরুন, বাতাসের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে স্প্রে করবেন না।
- ফল পাড়ার আগে কীটনাশকের বোতলে লেখা অপেক্ষার সময় মেনে চলুন।
শেষ দুটি নিয়ম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি কীটনাশকের মোড়কে লেখা থাকে স্প্রের কত দিন পর ফল তোলা নিরাপদ। সেই সময়ের আগে আম পাড়লে ফলের গায়ে বিষের অবশেষ থেকে যেতে পারে, যা খাওয়ার জন্য ক্ষতিকর এবং রপ্তানির বাজারে ফল বাতিল হওয়ার অন্যতম কারণ। আবার বেশি মাত্রায় বা ঘন ঘন কীটনাশক দিলে পোকার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়; তখন আগের ওষুধে আর কাজ হয় না।
কোন পোকা কখন আসে
আমবাগানে পোকার আক্রমণ সারা বছর সমান থাকে না; প্রতিটি পোকার নিজস্ব সময় আছে। এই সময়ের হিসাব জানা থাকলে বাগানমালিক আগেভাগে প্রস্তুত থাকতে পারেন, আর অকারণে বারবার স্প্রে করে টাকা নষ্ট করতে হয় না। শীতের শেষ থেকে বসন্তের শুরু, অর্থাৎ মুকুল আসার আগে ও মুকুলের সময়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় হপার ও ছাতরা পোকা সক্রিয় হয়, আর ফল ছিদ্রকারী পোকার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিতে হয় মুকুল আসার আগেই।
গুটি থেকে আম বড় হওয়ার সময় নজর রাখতে হয় ফলের ওপর: কোনো ফলে ছিদ্র বা পচন দেখা গেলে দেরি না করে সরিয়ে ফেলতে হয়। বর্ষার আগে ও পরে গাছে যখন নতুন কচি পাতা আসে, তখন পাতা খাওয়া পোকার উপদ্রব বাড়ে। বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা পাতা কাটা উইভিল নামের আরেকটি পোকার কথাও বলে, যা কচি পাতা কেটে মাটিতে ফেলে দেয়। এদের দমনে কচি পাতা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১০ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার অনুমোদিত কীটনাশক স্প্রের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুকনো মৌসুমে লাল মাকড় বাড়ে, আর কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকার খোঁজ নিতে হয় সারা বছর।
এই হিসাব থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: পোকা দমন মানে শুধু পোকা দেখা দিলে ওষুধ ছিটানো নয়। বছরের শুরুতেই একটি ছোট খাতায় লিখে রাখা যায়, কোন মাসে কোন পোকার দিকে নজর দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে একবার বাগান ঘুরে কয়েকটি গাছের পাতা, মুকুল, কাণ্ড আর ফল খুঁটিয়ে দেখলেই বেশির ভাগ সমস্যা শুরুতে ধরা পড়ে। শুরুতে ধরা পড়লে দমনের খরচও কম।
মৌমাছি বাঁচলে আমও বাঁচে
আমের মুকুলে হাজার হাজার ছোট ফুল থাকে, আর সেগুলো থেকে গুটি হতে হলে পরাগায়ণ দরকার। পরাগায়ণ মানে এক ফুলের পরাগরেণু আরেক ফুলে পৌঁছানো। আমের ক্ষেত্রে এ কাজ মূলত করে মৌমাছি, মাছি ও নানা রকম ছোট পোকা। মুকুল পুরো ফোটার সময় বাগানে ভনভন শব্দ শোনা যায়, সেটাই এই পরাগায়ণের শব্দ।
এ কারণেই পুরো ফুল ফোটা অবস্থায় কীটনাশক স্প্রে না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তখন স্প্রে করলে হপার হয়তো মরে, কিন্তু পরাগায়ণকারী পোকাও মারা যায়, ফলে গুটি কম ধরে। হপারের প্রথম স্প্রে তাই মুকুল ফোটার আগে, আর দ্বিতীয় স্প্রে গুটি মটরদানার মতো হলে। যেসব বাগানের পাশে কেউ মৌমাছির বাক্স রাখেন, সেখানে এই নিয়ম আরও কঠোরভাবে মানা দরকার।
স্প্রে করার ঠিক নিয়ম
ভুল উপায়ে স্প্রে করলে ভালো ওষুধও কাজ করে না। প্রথমত, পরিষ্কার পানিতে নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধ মেশাতে হবে; বেশি দিলে বেশি কাজ হয়, এ ধারণা ভুল। দ্বিতীয়ত, স্প্রে করা উচিত সকালে বা বিকেলে, যখন রোদ কড়া নয় এবং বাতাস শান্ত। বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে সেদিন স্প্রে না করাই ভালো, কারণ বৃষ্টিতে ওষুধ ধুয়ে যায়। তৃতীয়ত, বড় গাছের ওপরের ডাল পর্যন্ত ওষুধ পৌঁছাতে উপযুক্ত স্প্রেযন্ত্র লাগে; শুধু নিচের ডালে ছিটালে পোকা ওপরে গিয়ে বেঁচে যায়।
নিজে নিজে কয়েকটি ওষুধ একসঙ্গে মিশিয়ে ছিটানো ঝুঁকিপূর্ণ; কোন ওষুধ কোনটির সঙ্গে মেশানো যায়, তা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়া উচিত। ব্যবহারের পর খালি বোতল ও প্যাকেট পুকুর বা খালের পানিতে ফেলা যাবে না, মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। শিশু ও গবাদিপশুকে স্প্রে করা বাগান থেকে কয়েক দিন দূরে রাখতে হবে। স্প্রের পর সাবান দিয়ে হাত মুখ ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
পোকা দমনে বাগানমালিকের লাভ
সময়মতো পোকা দমনের সুফল বাগানমালিক হাতে হাতে পান। গাছ সুস্থ থাকলে তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে, কারণ পোকার ক্ষত দিয়েই অনেক রোগজীবাণু গাছে ঢোকে। ফলের আকার, রং ও স্বাদ ভালো হয়, উৎপাদনও বাড়ে। দাগহীন পোকামুক্ত আমের চাহিদা ও দাম দুটোই বেশি, আর রপ্তানির দরজাও খোলে কেবল এমন ফলের জন্য। সবচেয়ে বড় কথা, যত্নে থাকা গাছ বহু বছর সুস্থ থেকে ফল দেয়, যা একটি আমবাগানের আসল সম্পদ।
আমের বাগানে ক্ষতিকর পোকামাকড় ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ফলনের পরিমাণ ও মান দুটোই ধরে রাখা যায়। পোকা চেনা, সময় বোঝা আর পরিবেশবান্ধব উপায়কে আগে রাখা, এই তিনটি অভ্যাসই আমচাষির সবচেয়ে বড় পুঁজি। কোনো পোকা চিনতে না পারলে বা ওষুধের মাত্রা নিয়ে সন্দেহ থাকলে ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিন। কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি কল সেন্টারে ১৬১২৩ নম্বরে ফোন করেও পরামর্শ পাওয়া যায়।
ছবি: আমের হপার পোকা (Idioscopus), arian.suresh from Chennai, India / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)





মন্তব্য
(০)