বাংলাদেশে গত চার দিনে বজ্রপাতে অন্তত ২৮ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে গণমাধ্যমে, যার মধ্যে কেবল ২৬শে এপ্রিল এক দিনেই ১৪ জন। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের ১০ বছরে বজ্রপাতে ৩,৬৫৮ জন মারা গেছেন। ২০১৬ সালে দুই দিনে অর্ধশতাধিক মৃত্যুর পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাতকে 'জাতীয় দুর্যোগ' ঘোষণা করে। এক দশক পরেও কৃষিপ্রধান দেশটিতে এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণ যাচ্ছে মাঠে থাকা মানুষেরই।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম এ ফারুখ বিবিসি বাংলাকে জানান, দেশে বজ্রপাতে মারা যাওয়া ৮৭ শতাংশ মানুষ উন্মুক্ত স্থানে ছিলেন। তার হিসাবে, "গত ২০ বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, প্রতি বছর বন্যার তুলনায় বজ্রপাতে দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে।" জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণার ১০ বছর পরও সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়নি বলে তিনি মনে করেন।
বজ্রপাত তৈরিতে তিনটি উপাদান লাগে: বাতাসের আর্দ্রতা, অস্থিতিশীল বায়ু ও ঊর্ধ্বমুখী বল। বাংলাদেশের অবস্থানই একে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে আসে গরম আর্দ্র বাতাস, উত্তরে পাহাড় ও হিমালয় থেকে ঠান্ডা বাতাস, আর দুইয়ের সংমিশ্রণে বজ্রমেঘ। এ বছর বঙ্গোপসাগরের ওপর আর্দ্রতা বেশি থাকায় মেঘও বেড়েছে; তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও তাপপ্রবাহ মিলে বজ্রঝড়ের প্রকোপ বাড়িয়েছে বলে অধ্যাপক ফারুখের ব্যাখ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি-র তথ্যে পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে ছয় হাজার বজ্রপাত হয়; বজ্রপাতের সময় আশপাশের বাতাস প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে হঠাৎ প্রসারিত হয়, সেই শকওয়েভই বজ্রধ্বনি।
বৃষ্টি ছাড়াও বজ্রধ্বনি হতে পারে; একে বলে 'শুষ্ক বজ্রঝড়', যখন মেঘের নিচের গরম শুষ্ক বাতাসে বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পৌঁছার আগেই বাষ্প হয়ে যায়। এমন ঝড় দাবানলের জন্য কুখ্যাত। আর 'একই জায়গায় দুবার বজ্রপাত হয় না' প্রবাদের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যে অনুকূল জায়গায় বারবারই বজ্রপাত হতে পারে।
মানুষের ওপর বজ্রপাত হলে শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ বয়ে যায়; স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সামান্য আঘাতেও পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, বমিভাব, বিভ্রান্তি ও স্মৃতির সমস্যা দেখা দিতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের সমস্যা, কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ, বিষণ্ণতা ও ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন। আহত ব্যক্তিকে বৈদ্যুতিক শকের রোগীর মতোই চিকিৎসা দিতে হয়: কয়েক মিনিটের মধ্যে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ও সিপিআর দিয়ে হৃদপিণ্ড সচল রেখে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। আহত বা মৃত ব্যক্তির শরীরে বিদ্যুৎ থাকে না, তাই তাকে ধরায় কোনো ঝুঁকি নেই।
গত সপ্তাহে বজ্রপাতে মৃত সন্তানের লাশ চুরির ভয়ে রাত জেগে পাহারা দেওয়ার খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। 'বজ্রপাতে মৃত লাশ চুম্বক হয়ে যায়' এই কুসংস্কার থেকেই লাশ চুরি হয়; ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সাবেক প্রধান সোহেল মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, বৈদ্যুতিক শকে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির মরদেহের কোনো পার্থক্য নেই।
বাঁচার উপায় একটাই: বজ্রধ্বনি শুনলেই নিরাপদ স্থানে যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের মতে বাইরের কোনো জায়গাই নিরাপদ নয়। বজ্রঝড় সাধারণত ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা থাকে, এই সময় ঘরে থাকতে হবে; বেরোতে হলে রাবারের জুতা পরতে হবে। ধানখেত বা খোলা মাঠে থাকলে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসতে হবে; উঁচু গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ধাতব বস্তু ও মোবাইল টাওয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে; নদী বা সাগরে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। ঘরে থাকলেও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, সিঙ্ক, কল, কংক্রিটের দেয়াল-মেঝে, জানালা ও দরজা থেকে দূরে থাকা ভালো।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)