সকালে বাজারে না গিয়ে নিজের বাগান থেকে সবজি তুলে রান্না, রান্নার জ্বালানি বাড়ির জৈব বর্জ্য থেকে, সন্ধ্যার আলো সূর্যের বিদ্যুতে—ভারতের কেরালার সংগীত ও কাব্যা দম্পতির বাড়িতে দিনের পর দিন এভাবেই চলছে। সঞ্চয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থে গড়া বাড়িটি বাইরে থেকে সাধারণ, তবে ভেতরে বাগান, গরু-মুরগি ও রান্নাঘরের বর্জ্যকে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত করে তাঁরা গড়ে তুলেছেন নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর এক স্বনির্ভর ব্যবস্থা।
এই জীবনের শুরু ভ্রমণ থেকে। বাড়িতে থিতু হওয়ার আগে দশ বছরের বেশি সময় তাঁরা ভারতের নানা প্রান্তে ঘুরেছেন; চাকরি সেই ভ্রমণে বাধা হলে দুজনই চাকরি ছেড়ে ফ্রিল্যান্স কাজ শুরু করেন। গাড়িতেই রান্না, সঙ্গে তাঁবু ও অল্প কাপড়, হোটেল-রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভরতা নেই—কম জিনিসে চলা ও নিজের খাবার নিজে তৈরির যে অভ্যাস পথে গড়ে উঠেছিল, সেটিই এখন তাঁদের জমি ও বাড়িকে ঘিরে স্থায়ী রূপ পেয়েছে।
বাড়ির বাগানে তাঁরা সব ধরনের সবজি চাষ করেন, মাছও চাষ করেন, ধান ফলানোর চেষ্টা চলছে। গরু থেকে দুধ, মুরগি থেকে ডিম—প্রতিদিনের খাবারের বড় অংশ বাড়ি থেকেই আসে, মাস শেষে বাজারের খরচ অনেকটা কমে যায়। অল্প জায়গায় মাশরুমও চাষ করেন তাঁরা; উপযুক্ত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে ২৫ দিন অন্তর মাশরুম সংগ্রহ করেন।
গরুর গোবর এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাড়ির এক অংশে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে রান্নাঘরের পচনশীল বর্জ্য ও গোবর দেওয়া হয়; অক্সিজেনবিহীন অবস্থায় অণুজীবের ভাঙনে তৈরি গ্যাসে রান্না হয়, আর প্ল্যান্টের অবশিষ্টাংশ ফিরে যায় কৃষিকাজে। ছাদের সোলার প্যানেলের বিদ্যুৎ দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি সেচেও ব্যবহার করেন তাঁরা; প্রয়োজনের বেশি উৎপাদন হলে তা থেকে আয়েরও সম্ভাবনা আছে।
বাড়ির চারপাশে কাঠের বাক্সে মৌমাছির বাসা থেকে মধু মেলে, আর ফুলে ফুলে ঘোরা মৌমাছি বাগানের ফসলের পরাগায়নেও ভূমিকা রাখে। কাজল, ময়েশ্চারাইজার ও ফেসওয়াশের মতো প্রসাধনও তাঁরা তৈরি করেন বাড়ির নারকেল, কমলা ও আমলকী দিয়ে—গাছগুলো শুধু খাবারের নয়, দৈনন্দিন প্রয়োজনেরও উৎস।
প্রকৃতির সঙ্গে এই সম্পর্ক বাড়ির সীমানায় থামেনি। গত দেড় বছরে ভ্রমণপথে তাঁরা ১০ হাজারের বেশি গাছের চারা লাগিয়েছেন, জিপিএস ট্র্যাকে সেগুলোর অবস্থান রাখছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বেচ্ছাসেবীদের দিয়ে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন; আগামী পাঁচ বছরে লক্ষ্য এক লাখ গাছ। বাগান থেকে খাবার, গরু থেকে দুধ ও গোবর, গোবর থেকে গ্যাস, গ্যাসের অবশিষ্ট থেকে সার, সূর্য থেকে বিদ্যুৎ, মৌমাছি থেকে মধু ও পরাগায়ন—আঙিনা কৃষির এই চক্রে এক ব্যবস্থার ‘বর্জ্য’ অন্যটির সম্পদ হয়ে ফিরে আসে। প্রথম আলো এই প্রতিবেদন লিখেছে ইনস্টাগ্রাম, টাইমস লাইফ ও দ্য বেটার ইন্ডিয়া অবলম্বনে।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)