সিংহকে বলা হয় বনের রাজা, কিন্তু বুনো সিংহের সংখ্যা কমে চলেছে। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের লাল তালিকায় ২০১৬ সালে প্রকাশিত মূল্যায়নে সিংহকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ (ভালনারেবল) প্রজাতি হিসেবে রাখা হয়। সেই মূল্যায়নে পৃথিবীতে প্রাপ্তবয়স্ক সিংহের সংখ্যা ধরা হয় ২৩ হাজার থেকে ৩৯ হাজার। এদের প্রায় সবাই আফ্রিকায়; এশিয়ায় সিংহ টিকে আছে কেবল ভারতের গুজরাট রাজ্যের গির অরণ্য ও তার আশপাশে। বিবিসি বাংলা ২০১৯ সালের জুলাইয়ে সিংহ নিয়ে যেসব তথ্য তুলে ধরেছিল, যাচাই করে সেগুলো এখানে দেওয়া হলো।
সিংহ আসলে একটিই প্রজাতি, বৈজ্ঞানিক নাম Panthera leo। প্রচলিতভাবে আফ্রিকান সিংহ ও এশীয় সিংহ নামে দুই ভাগে বলা হলেও আইইউসিএনের বিড়ালবিষয়ক বিশেষজ্ঞ দলের ক্যাট ক্লাসিফিকেশন টাস্ক ফোর্স ২০১৭ সালে সিংহের শ্রেণিবিন্যাস সংশোধন করে দুটি উপপ্রজাতি স্বীকৃতি দেয়: এশিয়া এবং পশ্চিম, মধ্য ও উত্তর আফ্রিকার P. l. leo, যার মধ্যে এশীয় সিংহও পড়ে, আর দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকার P. l. melanochaita।
পাঁচ মাইল দূর থেকে শোনা যায় গর্জন
যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জু জানায়, সিংহের গর্জন পাঁচ মাইল দূর থেকেও শোনা যায়। ২০১১ সালের নভেম্বরে বিজ্ঞান সাময়িকী প্লস ওয়ানে প্রকাশিত এক গবেষণায় সারা ক্লেমুক ও তাঁর সহকর্মীরা জানান, সিংহের ০.৫ থেকে ১.৫ সেকেন্ড দীর্ঘ গর্জনের শব্দচাপ এক মিটার দূরে ১১৪ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছায়।
এই জোরালো গর্জনের পেছনে আছে স্বরযন্ত্রের গঠন। ‘অ্যাডাপ্টেড টু রোর’ শিরোনামের ওই গবেষণায় বলা হয়, সিংহ ও বাঘের স্বরতন্ত্রীর ভেতরের দিকের তল বড় ও চ্যাপ্টা, যা অন্য অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর স্বরতন্ত্রীর মতো নয়। গবেষকদের মতে, এই গঠন তাদের গম্ভীর ও দূরে পৌঁছানো ডাকের উপযোগী করে তুলেছে।
দিনে কত মাংস খায়, শিকার করে কে
একটি প্রাপ্তবয়স্ক সিংহীর দিনে গড়ে প্রায় ৫ কেজি এবং পুরুষ সিংহের প্রায় ৭ কেজি মাংস দরকার হয়। তবে সুযোগ পেলে সিংহ এক বসায় ৩০ কেজি পর্যন্ত মাংস খেয়ে ফেলে। দলের বেশির ভাগ শিকার করে সিংহীরা; সান ডিয়েগো চিড়িয়াখানার তথ্য অনুযায়ী তারা একসঙ্গে মিলে শিকার করে এবং শাবক বড় করে।
সিংহ খুব দ্রুত দৌড়ায়, কিন্তু অল্প সময়ের জন্য: ছোট ছোট দৌড়ে ঘণ্টায় প্রায় ৪৮ থেকে ৫৯ কিলোমিটার গতিতে। একটি সিংহীর হৃৎপিণ্ড তার দেহের ওজনের মাত্র ০.৫৭ শতাংশ, পুরুষের প্রায় ০.৪৫ শতাংশ। তাই সিংহ বেশিক্ষণ দৌড়ে শিকার ধরতে পারে না; ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে তাকে শিকারের খুব কাছে চলে যেতে হয়।

কেশর, লেজের গোছা আর আয়ু
পুরুষ সিংহ চেনার সহজ উপায় তার কেশর। স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জুর তথ্যে, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ঝাঁকড়া কেশরের রং হালকা সোনালি থেকে লালচে বাদামি, এমনকি কালোও হয়। কৈশোরে শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন বাড়লে কেশর গজাতে শুরু করে, পূর্ণ আকার পায় প্রায় চার বছর বয়সে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পেটন ওয়েস্ট ও ক্রেগ প্যাকার তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটি জাতীয় উদ্যানে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফল ২০০২ সালে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশ করেন। তাঁরা দেখান, গাঢ় কেশর ভালো পুষ্টি ও বেশি টেস্টোস্টেরনের ইঙ্গিত দেয়, আর তা সিংহীর পছন্দ এবং পুরুষদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুটিকেই প্রভাবিত করে। গাঢ় কেশরের পুরুষের প্রজননকাল দীর্ঘ হয় এবং তাদের শাবক বেশি বাঁচে, তবে গরমের মাসগুলোতে তারা বেশি তাপে ভোগে।
লেজের ডগায় পশমের গোছা সিংহের আরেকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। জন্মের সময় এটি থাকে না; সাড়ে পাঁচ মাস বয়সের দিকে গজায় এবং সাত মাস বয়সে স্পষ্ট চেনা যায়। বুনো পরিবেশে একটি সিংহী ১৬ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে, কিন্তু পুরুষ সিংহ সাধারণত ১২ বছরের বেশি বাঁচে না; চিড়িয়াখানায় সিংহ কুড়ির কোঠার শুরু পর্যন্তও বাঁচে।

আফ্রিকায় সংখ্যা কমছে, গিরে টিকে আছে এশীয় সিংহ
আইইউসিএনের ২০১৬ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ২১ বছরে, অর্থাৎ সিংহের প্রায় তিন প্রজন্মে, সিংহের সংখ্যা আনুমানিক ৪৩ শতাংশ কমেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, নামিবিয়া ও জিম্বাবুয়ে এবং ভারতে নমুনা জনগোষ্ঠীগুলো ১২ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু আফ্রিকার বাকি অংশে কমেছে ৬০ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার ১২টি দেশ থেকে সিংহ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পশ্চিম আফ্রিকায় সিংহ ‘মহাবিপন্ন’ শ্রেণির মানদণ্ডে পড়ে।
সংখ্যা কমার প্রধান কারণ হিসেবে মূল্যায়নে বলা হয়েছে মানুষের জীবন ও গবাদিপশু রক্ষার নামে নির্বিচারে সিংহ হত্যা, আবাসস্থল হারানো এবং শিকার-প্রাণী কমে যাওয়া, যার বড় কারণ চোরাশিকার ও বুনো প্রাণীর মাংসের ব্যবসা। প্রথাগত ওষুধের জন্য সিংহের হাড় ও দেহাংশের বাণিজ্যকে নতুন হুমকি বলা হয়েছে।
এশীয় সিংহ ভারতে ‘বিপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। গুজরাটের গির অরণ্যে ১৯৬৫ সালে ১ হাজার ৪১২.১ বর্গকিলোমিটার এলাকা সিংহ সংরক্ষণের অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। ২০১৫ সালের শুমারিতে গিরে ৫২৩টি সিংহ গোনা হয়। মার্কিন সম্প্রচার সংস্থা পিবিএসের তথ্যে, এশীয় সিংহের পেটের নিচ বরাবর চামড়ার একটি ভাঁজ থাকে এবং পুরুষের কেশর তুলনামূলক ছোট।

ছবি: Dylan Walters / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, আইইউসিএন লাল তালিকা (Panthera leo, ২০১৬), প্লস ওয়ান (ক্লেমুক ও অন্যান্য, ২০১১), সায়েন্স (ওয়েস্ট ও প্যাকার, ২০০২), স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জু, সান ডিয়েগো চিড়িয়াখানা, পিবিএস নেচার, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)