মৌসুমের প্রায় শেষে চাঁদপুরের ঘাটে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে, দুই সপ্তাহে কেজিতে দাম কমেছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যে, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বড়স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ৭০০ থেকে ৮০০ মণ ইলিশ উঠেছে; এক কেজির ইলিশ তবু প্রায় ২ হাজার ৩০০ টাকা, দাম নেমেছে মূলত ছোট মাছের। কিন্তু বাংলা ট্রিবিউনের জামাল উদ্দিনের প্রতিবেদন বলছে, এই স্বস্তির আড়ালে উৎপাদনের চিত্র উদ্বেগের।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টনের বেশি ইলিশ উৎপাদনের পর ২০২৩-২৪-এ তা নেমে আসে প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে, ২০২৪-২৫-এ প্রায় ৫ লাখ টনে। দুই বছরে কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন, ১২ শতাংশের বেশি; শেষ বছরেই কমেছে প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
পতন সবচেয়ে বেশি সাগরে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে প্রায় ৩ লাখ ২২ হাজার টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল, ২০২৪-২৫-এ প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার টন—তিন বছরে প্রায় ২২ শতাংশ কম। অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে আহরণ তেমন কমেনি। অথচ সরকারি হিসাবে ২০১০-১১ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সামুদ্রিক যান্ত্রিক ছোট নৌযান বেড়েছে প্রায় ৫১ শতাংশ, তাই গবেষকেরা অতিরিক্ত আহরণ বা ‘ফিশিং প্রেসার’কে বড় সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন।
মাছের আকারও ছোট হচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় আহরিত ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি, ২০২৫-২৬-এ ১৩ দশমিক ৩৯ ইঞ্চি। ১ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ৯টি মৎস্য বন্দরে ইনস্টিটিউটের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ডিমওয়ালা ইলিশ মিলেছে ৯ থেকে ২৫ শতাংশে, যেখানে আগে এ সময় তা থাকত ৪৫ থেকে ৪৯ শতাংশ; তবে এটি চূড়ান্ত জাতীয় হিসাব নয়।
গবেষকেরা কারণ হিসেবে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন, সূক্ষ্ম ফাঁসের নিষিদ্ধ জাল, নদীতে চর-ডুবোচর ও প্রবাহের পরিবর্তন, শিল্প ও প্লাস্টিক দূষণ, অনিয়মিত বৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলছেন; দুই দশকে নদীর গতিপথ বদলানোয় পুরোনো অভয়াশ্রমের সীমানাও নতুন করে মূল্যায়নের তাগিদ দিচ্ছেন। এর মধ্যে ভারত থেকে অনুমোদিত ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টনের মধ্যে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল দিয়ে ৫৩৫ টন ইলিশ এসেছে; ২২ সেপ্টেম্বর ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিলের পর আমদানি বন্ধ।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, আহরণ কমে যাওয়া সংকটের পূর্বলক্ষণ, আর বেপরোয়া জাটকা নিধনের কারণেই এখন বড় ইলিশ কম মিলছে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আনিছুর রহমান মনে করেন, সংকটের কিছু লক্ষণ থাকলেও পরিস্থিতি ‘এখনও পুরোপুরি তেমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি’; প্রবণতা আরও কয়েক বছর চললে তা দুশ্চিন্তার হবে।
মা ইলিশ রক্ষায় ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকবে। আনিছুর রহমানের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা ঠিকভাবে কার্যকর করা এবং সে সময়ের প্রজননের চিত্র দেখার পরই ইলিশের অবস্থা নিয়ে নিশ্চিত করে বলা যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ২২ দিনের অভিযানে সমাধান হবে না; জাটকা নিধন ও নিষিদ্ধ জাল বন্ধ, জেলেদের বিকল্প জীবিকা এবং সাগরে আহরণক্ষমতার বৈজ্ঞানিক নিয়ন্ত্রণও দরকার।
ছবি: Jotiii / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন





মন্তব্য
(০)