গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার নাকাইহাট এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শওকত আলী নিজের বসতবাড়ির আশপাশে ও পুকুরপাড়ে প্রায় এক হাজার বিলুপ্তপ্রায় ও দুর্লভ প্রজাতির ঔষধি ও ফলজ গাছের বাগান গড়ে তুলেছেন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ঢাকা ট্রিবিউন ও বার্তা সংস্থা ইউএনবির প্রতিবেদনে তার এই উদ্যোগের কথা উঠে আসে। বাগান থেকে পাওয়া ওষুধ ও ফল তিনি বিনামূল্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। শওকত আলী জানান, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং গাছ থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক ওষুধ দিয়ে রোগ নিরাময়ের সুযোগ বাড়ানোই তার লক্ষ্য।
শিক্ষক থেকে ‘বৃক্ষপ্রেমিক শওকত আলী’
ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শওকত আলীর বাড়ি নাকাই ইউনিয়নের শীতলগ্রামে। এলাকার মানুষ তাকে ‘শওকত মাস্টার’ নামে চেনেন। শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার সঙ্গেও যুক্ত। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তার বয়স ছিল নব্বইয়ের কাছাকাছি। মানুষ ও গাছের প্রতি তার ভালোবাসা শৈশব থেকেই। স্ত্রী, তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার, এবং পরিবারের সদস্যরাও তার কাজে খুশি।
সারা দিন চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি তিনি গাছের যত্ন নেন। বিলুপ্তপ্রায় ও দুর্লভ গাছ গ্রামের অন্য এলাকায় ছড়িয়ে দিতে বিনামূল্যে চারা বিতরণ করেন। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ডেকে এনে এসব গাছ চিনিয়ে দেন এবং বিভিন্ন গাছের গুণাগুণ জানান। গাছের প্রতি এই মমতার কারণে এলাকার মানুষ তার নাম দিয়েছেন ‘বৃক্ষপ্রেমিক শওকত আলী’। গাছ নিয়ে কাজের জন্য তিনি বঙ্গবন্ধু পুরস্কারসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একাধিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

প্রতিবেশীরা যা বলেন
স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল চৌধুরী প্রতিবেদককে বলেন, এলাকার বেশির ভাগ মানুষ নিজের প্রয়োজনে জমিতে ধান ও অন্যান্য ফসল চাষ করে বছরের খাবার জোগাড় করেন, কিন্তু শওকত মাস্টার ব্যতিক্রম। শুধু খাদ্যশস্য না করে মানুষের মঙ্গলের জন্য তিনি নিজের অনেক জমিতে বিরল প্রজাতির ঔষধি গাছ লাগিয়েছেন। মানুষ তার বাগান দেখতে আসেন, আর তাতে তিনিও খুশি হন। রুবেল চৌধুরীর ভাষায়, গাছ দিয়ে কত রকমের ওষুধ তৈরি হয়, তা তারা শওকত আলীর কাছ থেকেই জেনেছেন।
আরেক বাসিন্দা সাহেব উদ্দিন মাস্টার জানান, শওকত আলী মানুষের কল্যাণে চারা বিতরণ করেন, কোনো পয়সা নেন না, গাছের যত্ন কীভাবে নিতে হয় তা শেখান এবং গাছের গুণাগুণ নিয়ে কথা বলেন। শওকত আলীর ছেলে সোহাগ বলেন, তার বাবার মতো মানুষ সমাজে আরও দরকার, তাহলে সবাই ঔষধি গাছের গুণাগুণ সম্পর্কে জানতে পারত।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এস এম ফেরদৌস শওকত আলীর কাজকে সাধুবাদ জানিয়ে সবাইকে তার মতো গাছ রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। শওকত আলীর গাছের সংগ্রহ বাড়াতে বিরল গাছের চারা, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সহায়তার আশ্বাসও দেন তিনি।

বাংলাদেশের ঔষধি গাছ ও লোকজ জ্ঞান
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, উপমহাদেশে ঔষধি গুণসম্পন্ন উদ্ভিদের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার, যার মধ্যে ৪৫০ থেকে ৫০০টি বাংলাদেশে জন্মায় বা পাওয়া যায় বলে তালিকাভুক্ত হয়েছে। দেশের পরিচিত ঔষধি গাছের মধ্যে আছে বাসক, যার পাতা প্রচলিতভাবে কাশি, হাঁপানি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ব্যবহার হয়; নিম, যা খোসপাঁচড়া, ফোড়া ও চর্মরোগে ব্যবহৃত হয়; অর্জুন, যার বাকল হৃদ্যন্ত্রের টনিক হিসেবে পরিচিত; এ ছাড়া কালমেঘ, থানকুনি, সর্পগন্ধা ও বেল।
বাংলাপিডিয়া আরও উল্লেখ করেছে, গ্রামের কবিরাজি চিকিৎসার মতো লোকজ পদ্ধতির জ্ঞান অনেকটাই মুখে মুখে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে গেছে। আধুনিক চিকিৎসার প্রসার এবং মানুষ দেশি উদ্ভিদ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় এই জ্ঞান দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের গাছ চেনানো ও গুণাগুণ জানানোর মধ্য দিয়ে শওকত আলী সেই জ্ঞানই পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে যেকোনো রোগে ভেষজ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার আয়তন ৪৮১.৬৬ বর্গকিলোমিটার, যার এক-চতুর্থাংশ বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। করতোয়া, বাঙালি ও নলুয়া এখানকার প্রধান নদী। নাকাই উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের একটি, আর নাকাই হাট উপজেলার পরিচিত হাটগুলোর মধ্যে পড়ে। এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; প্রধান ফসল ধান, পাট, ভুট্টা, আখ, গম, আলু, সরিষা ও সবজি, আর প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, নারকেল ও পেঁপে।
ছবি: H. Zell / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, ইউএনবি (২৪ লাইভ নিউজপেপারে প্রকাশিত), বাংলাপিডিয়া (গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা; উদ্ভিদজগৎ: ঔষধি উদ্ভিদ)




মন্তব্য
(০)