ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য আসাম ক্রমেই গরম হচ্ছে, কিন্তু দেশটির নিয়ম অনুযায়ী সেখানে প্রায় কখনো তাপপ্রবাহ হয় না। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) সমতলে তাপপ্রবাহ ঘোষণা করে তখনই, যখন কোনো স্টেশনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় এবং টানা দুই দিন স্বাভাবিকের চেয়ে ৪.৫ থেকে ৬.৪ ডিগ্রি বেশি থাকে, অথবা সরাসরি ৪৫ ডিগ্রি ছোঁয়। এতে আর্দ্রতার কোনো হিসাব নেই। ফলে আসামে থার্মোমিটারের পাঠ আর মানুষের অনুভবের মধ্যে বড় ফারাক থেকে যায়, জানিয়েছে মোঙ্গাবে ইন্ডিয়া।
পরিসংখ্যানেই সমস্যাটা স্পষ্ট। ২০২৪ সালের ২৫ মে গুয়াহাটিতে তাপমাত্রা ছিল ৪০.১ ডিগ্রি, স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ৮ ডিগ্রি বেশি; আর্দ্রতা ছিল ৪০ থেকে ১০০ শতাংশ, অনুভূত তাপমাত্রা প্রায় ৫২ ডিগ্রি। একই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর, শহরের ইতিহাসে সেপ্টেম্বরের উষ্ণতম দিনে, অনুভূত তাপমাত্রা দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ ডিগ্রি। ২০২৬ সালের ৪ জুলাই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মাত্র ৩৬ ডিগ্রি হলেও আর্দ্রতা ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ওঠায় অনুভূত তাপমাত্রা হয় প্রায় ৫২ ডিগ্রি।
গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী পার্থজ্যোতি দাস বলেন, এটি স্ববিরোধ নয়, সংজ্ঞার একটি অন্ধ জায়গা। তাপপ্রবাহ ঘোষিত না হওয়ায় গরমকে ঝুঁকি হিসেবেই ধরা হয়নি; বিশেষজ্ঞদের মতে আসামের এখনো তাপ কর্মপরিকল্পনা না থাকার এটি একটি কারণ, যেখানে ২৩টি রাজ্যের ২৫০টির বেশি শহর ও জেলায় এমন পরিকল্পনা চালু আছে। দাসের মতে, আসামের তাপজনিত চাপ বোঝাতে ভেজা বাল্বের তাপমাত্রা (ওয়েট-বাল্ব) বেশি কার্যকর, কারণ এটি ঘাম শুকিয়ে শরীর ঠান্ডা হওয়ার ক্ষমতা হিসাব করে। ৮০ শতাংশের বেশি আর্দ্রতায় ৩৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা মানে ভেজা বাল্বে ৩১-৩২ ডিগ্রি।
প্রমাণ বাড়ছে। আসামের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনা ২.০ অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সালে বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বছরে ০.০৪৯ ডিগ্রি করে বেড়েছে। আইএমডির বিজ্ঞানীদের ২০২৬ সালের অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২-২০২৪ সালে গুয়াহাটিতে মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তাপ সূচক ৪০ ডিগ্রির ওপরে ছিল, সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ৫৫.৫ ডিগ্রি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পড়েছে লেখকদের "চরম বিপদ" শ্রেণিতে, ১৯৯১-২০২০ সময়ে যে পর্যায়ে কোনো মাস পৌঁছায়নি। ২০২৩ সালে ৩৭টি তাপ কর্মপরিকল্পনার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ পরিকল্পনা শুধু দিনের তাপমাত্রা দিয়েই ঝুঁকি নির্ধারণ করে।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। ২০২৬ সালের এক গবেষণার হিসাবে, বিশ্বে ১০ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫৬ কোটি শিশু, অর্থাৎ প্রায় ৪৩ শতাংশ, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরে অন্তত এক মাস বাড়তি তাপজনিত চাপ ভোগ করছে; দক্ষিণ এশিয়া সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি। আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ইউনিসেফের মাঠ কার্যালয়ের প্রধান মধুলিকা জোনাথন বলেন, গরম শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি, স্কুলে উপস্থিতি ও শেখার ওপর একসঙ্গে প্রভাব ফেলে। আসামের প্রায় অর্ধেক জেলা ভারতের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জেলার তালিকায়।
অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এখন একটি তাপ কর্মপরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে, জানান এসিসিএমএসের কারিগরি পরামর্শক রিজওয়ান উজ জামান; আসামের জন্য আলাদা মানদণ্ড দরকার কি না, তাও যাচাই হবে। রাজ্যে ছয়টি কৃষি-জলবায়ু অঞ্চল থাকায় তিনি প্রতিটি অঞ্চলের ঝুঁকি মাপতে বহুমাত্রিক সূচকের প্রস্তাব দেন। দাস চান, আইএমডি বাতাসের তাপমাত্রার পাশাপাশি আর্দ্রতাভিত্তিক তাপ সূচকও প্রকাশ করুক, যাতে মানুষ বোঝে স্বাভাবিক দেখানো তাপমাত্রাও তাপজনিত চাপের বড় ঝুঁকি বহন করতে পারে।
ছবি: Anushila Bharali / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: Mongabay India




মন্তব্য
(০)