বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর সই হওয়া গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের ডিসেম্বরে। বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক কলামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লেস্টারের পিএইচডি গবেষক খায়ের মাহমুদ যুক্তি দিয়েছেন, পুরোনো চুক্তি শুধু নবায়ন না করে আরও ন্যায্য, বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর একটি চুক্তির জন্য বাংলাদেশকে কাজ করতে হবে। মতামতগুলো লেখকের নিজস্ব।
চুক্তিটি ফারাক্কা পয়েন্টে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমের পানি ১০ দিন করে ভাগ করে। প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান পায়; ৭০ থেকে ৭৫ হাজারের মধ্যে হলে বাংলাদেশ পায় ৩৫ হাজার; ৭৫ হাজার বা বেশি হলে ভারত পায় ৪০ হাজার, বাকিটা বাংলাদেশ। ১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত তিনটি নির্দিষ্ট ১০ দিনে পালাক্রমে প্রত্যেক দেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পায়। চুক্তির ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে নবায়ন দুই দেশের সম্মতিতে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নয়।
লেখক চুক্তির মূল্য স্বীকার করেও কয়েকটি দুর্বলতা দেখিয়েছেন। পুরো শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য অবিচ্ছিন্ন ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চয়তা নেই; ফারাক্কায় প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নামলে শুধু জরুরি পরামর্শের কথা বলা আছে। বণ্টনসূচি দাঁড়িয়ে আছে ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের গড় প্রবাহের ওপর, অথচ এর মধ্যে উজানের ব্যবহার, সেচের চাহিদা আর জলবায়ু বদলে গেছে। তাঁর মতে নতুন চুক্তির ভিত্তি হওয়া উচিত পুরো অববাহিকার প্রবাহ, উজানের প্রত্যাহার আর বাঁধ-ব্যারাজের সম্মিলিত প্রভাব।
কৃষি ও পরিবেশের দিক থেকে লেখক বিশেষ জোর দিয়েছেন: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পর্যাপ্ত মিঠাপানি না এলে লবণাক্ততা বাড়ে, কৃষি ও খাওয়ার পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সুন্দরবন চাপে পড়ে। অথচ বর্তমান চুক্তিতে পরিবেশগত প্রবাহ, সুন্দরবনের মিঠাপানি, গড়াই নদীর পুনরুজ্জীবন, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ বা মৎস্যসম্পদ রক্ষার বাধ্যতামূলক কোনো মানদণ্ড নেই। শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথা ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে থাকলেও তিন দশকে তা অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
তিনি স্বচ্ছতার জন্য যৌথ রিয়েল-টাইম তথ্যভান্ডার, স্বাধীন কারিগরি যাচাই ও নিয়মিত প্রকাশ্য প্রতিবেদন, আর বিরোধ মেটাতে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও প্রয়োজনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বা সালিশি ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর সতর্কতা, ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে মতবিরোধের সময় বাংলাদেশের হিস্যার অন্তত ৯০ শতাংশ ছাড়ার যে সুরক্ষা আছে, তা শুধু চুক্তির মেয়াদকালের জন্য; ডিসেম্বরের মধ্যে সমঝোতা না হলে আইনগত ও পরিচালনাগত শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
লেখকের আহ্বান: বাংলাদেশ গঙ্গার পানিতে অনুগ্রহ চায় না, চায় ভাটির অংশীদার হিসেবে ন্যায্য, ন্যূনতম ও কার্যকরভাবে সুরক্ষিত হিস্যা, যেখানে নদীর জীবন আর ভাটির মানুষের অধিকারও স্বীকৃতি পাবে।
ছবি: Debmalyap / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন





মন্তব্য
(০)