আফ্রিকার মোট খাদ্যের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত আসে মূল ও কন্দ ফসল থেকে, অথচ এসব ফসলের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোক্তার কাছে পৌঁছার আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এই হিসাবকে সামনে রেখেই ২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় “ফিডিং গ্রোয়িং সিটিজ: রিডিউসিং ফুড লস অ্যান্ড ওয়েস্ট থ্রু ইনোভেশন, পার্টনারশিপস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স” শিরোনামের ওয়েবিনার। আয়োজক ছিল সিজিআইএআর ফুড ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড সিকিউরিটি প্রোগ্রাম, সঞ্চালনা করেন আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্র (CIP)-এর আফ্রিকা আঞ্চলিক পরিচালক ড. জয়েস মারু (Joyce Maru)।
সমস্যাটি বিশ্বজুড়ে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর হিসাবে, ফসল তোলার পর খুচরা পর্যায়ে পৌঁছার আগেই পৃথিবীর ১৩.৩ শতাংশ খাদ্য নষ্ট হয়, আর প্রতিবছর ১০৫ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়—ভোক্তার জন্য উপলব্ধ মোট খাদ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ। ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৯৬০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে ধারণা, যার ৭০ শতাংশ থাকবে শহরে; আর শহরে যা খাওয়া হয় তার ৮০ শতাংশের বেশি উৎপাদিত হয় শহরের সীমানার বাইরে। আফ্রিকান ইউনিয়নের CAADP কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা ২০২৬–২০৩৫-এ ২০৩৫ সালের মধ্যে ফসলোত্তর ক্ষতি অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
CIP-এর নগর খাদ্যব্যবস্থা বিভাগের প্রধান ড. মুকানি মোয়ো (Mukani Moyo) বলেন, প্রতিরোধ শুরু করতে হবে উৎস থেকে—উন্নত জাত, ভালো কৃষিতাত্ত্বিক ও ফসল তোলার পদ্ধতি, তারপর সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ফসলোত্তর প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী বাজারব্যবস্থা। কেভিয়ান কেনিয়া ফার্মস (Kevian Kenya Farms)-এর মহাব্যবস্থাপক এমেরিটাস কাসি (Emeritus Kasee) জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠান উন্নত জেনেটিকস ও পরিচ্ছন্ন বীজের সঙ্গে টিস্যু কালচার, অ্যারোপনিক ও হাইড্রোপনিক উৎপাদন, মাটি ও গ্রোয়িং মিডিয়ার স্বাস্থ্য এবং উত্তম কৃষিচর্চা মিলিয়ে কাজ করে; উন্নত জাত ও সুস্থ উৎপাদনব্যবস্থাই পটেটো সিস্ট নেমাটোড ও লেট ব্লাইটের মতো রোগ-পোকার ক্ষতি কমায়।
ফসলোত্তর ক্ষতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ফল ও শাকসবজিতে। ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টার (WorldVeg)-এর কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মার্সি মোয়াম্বি (Mercy Mwambi) তানজানিয়া ও কেনিয়ার সবজি ব্যবসায়ীদের মধ্যে কুল বক্স প্রযুক্তির উদাহরণ দেন, যা তাঁদের ক্ষতি কমিয়ে সঞ্চয় বাড়িয়েছে। পার্টনার্স ইন ফুড সলিউশনস (Partners in Food Solutions)-এর পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা ক্লায়েন্ট পোর্টফোলিওর পরিচালক জনসন কিরাগু (Johnson Kiragu) বলেন, সাধারণ সমাধান চাপিয়ে না দিয়ে প্রত্যেক ব্যবসার ক্ষেত্রে হ্যান্ডলিং, পরিবহন, কোল্ড স্টোরেজ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বিপণনের কোন ধাপে খাদ্য নষ্ট হচ্ছে তা আগে নির্ণয় করা উচিত।
যেখানে অপচয় ঘটেই যায়, সেখানে আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট (IWMI)-এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. তোসিন সোমোরিন (Tosin Somorin) ভিয়েতনাম, ঘানা ও কেনিয়ার উদাহরণ তুলে ধরেন, যেখানে জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট, ব্রিকেট, পশুখাদ্য ও সার তৈরি হচ্ছে—পুষ্টি উপাদান ফিরে যাচ্ছে খামারে, তৈরি হচ্ছে আয়ের সুযোগ। তবে এমন চক্রাকার সমাধান বড় পরিসরে নিতে অর্থায়ন, সচেতনতা, দক্ষতা ও বাস্তব সহায়তা লাগবে বলে তিনি জানান।
নগর সরকারগুলোকে এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। নাইরোবি সিটি কাউন্টির খাদ্যব্যবস্থা ও খাত কর্মসূচি পরিচালক উইনফ্রেড কাতুমো (Winfred Katumo) বলেন, নাইরোবির খাদ্যের ৮০ শতাংশ আসে কাউন্টির বাইরে থেকে, তাই শহরটি ফসলোত্তর হ্যান্ডলিং, সংরক্ষণ, খাদ্য পুনরুদ্ধার ও মূল্য সংযোজনে বিনিয়োগ করছে; আলাদা আলাদা প্রকল্পের গণ্ডি ছাড়াতে এসব কাজ নীতি, বাজার পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ কাঠামোয় যুক্ত করতে হবে। ICLEI আফ্রিকার আফ্রিকান সিটি ফুড সেন্টারের প্রধান ড. লুক মেটেলারক্যাম্প (Luke Metelerkamp) বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্পষ্টতই স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব, এবং সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য ঘিরে জোট গড়ার আহ্বান জানান।
সিজিআইএআর ফুড ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড সিকিউরিটি সায়েন্স প্রোগ্রামের পরিচালক ড. আনা ওকেলো (Anna Okello) বলেন, ঘানা, ভিয়েতনাম ও ভারতের অভিজ্ঞতা সরকার, ব্যবসা ও এনজিওর কাছে পৌঁছে দেওয়া—দেশ থেকে দেশে প্রমাণভিত্তিক জ্ঞান জোড়া লাগানোই সিজিআইএআরের শক্তি। সমাপনী বক্তব্যে CIP-এর মহাপরিচালক ড. সাইমন হেক (Simon Heck) বলেন, খাদ্যের ক্ষতি ও অপচয় এমন এক সমস্যা, যার স্থানীয় জরুরিত্ব স্থানীয় সরকার, ব্যবসা, জনগোষ্ঠী ও গবেষকদের এক টেবিলে আনতে পারে; কর্মসূচির কাজ হলো জেনেটিকস, উৎপাদন, বাজার ও ফসলোত্তর প্রযুক্তির বিজ্ঞানকে শহরগুলোতে জমতে থাকা এই গতির সঙ্গে যুক্ত করা। কৃষক ও ব্যবসায়ীর জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—খাদ্য নষ্ট হওয়া ঠেকানো আরও বেশি উৎপাদনের সমান মূল্যবান।
সূত্র: সিজিআইএআর (CGIAR)





মন্তব্য
(০)