২০২১ সালের অক্টোবরে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পীরগঞ্জ গ্রামের মাঠ জুড়ে আমন ধান তখনো সবুজ। সেই ধান পাকতে আর ঘরে তুলতে কৃষকের আরও মাসখানেক লাগার কথা ছিল। কিন্তু একই মাঠের এক খণ্ড জমির ধান পুরোপুরি পেকে হলুদ হয়ে গিয়েছিল। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেটি ছিল বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বীনা) উদ্ভাবিত আগাম আমন জাত বীনা-১১।
মাঠে কৃষকের অভিজ্ঞতা
পীরগঞ্জের কৃষক মো. আবু সাইয়ীদ ইত্তেফাককে জানিয়েছিলেন, চারা তৈরি থেকে কাটা পর্যন্ত এই ধানে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১১০ দিন লাগে। চারা তৈরিতে লাগে ২০ থেকে ২২ দিন; সেই সময় বাদ দিলে জমিতে ধানটি থাকে প্রায় ৯০ দিন, যা অন্য আমন জাতের চেয়ে এক মাস কম। তিনি বলেছিলেন, দু-এক দিনের মধ্যেই তিনি পাকা ধান কেটে ঘরে তুলবেন।
আরেক কৃষক আবু বকর সিদ্দিকের হিসাবে, উচ্চফলনশীল হওয়ায় বীনা-১১ অন্য আমন জাতের চেয়ে বিঘায় চার থেকে পাঁচ মণ বেশি ফলন দেয়। দানা লম্বা ও মাঝারি, বাজারে দামও ভালো মেলে। তাঁর মতে জাতটির বড় গুণ হলো বন্যা এর তেমন ক্ষতি করতে পারে না, জলমগ্ন অবস্থাতেও গাছ টিকে থাকে।

জলমগ্নতা সহ্য করার গুণ ও ফলন
বীনা ২০১৩ সালে বীনা-১১ জাতটি অবমুক্ত করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল তথ্যভান্ডারে জাতটিকে জলমগ্নতা সহনশীল বলা হয়েছে। বীনার তথ্য অনুযায়ী, বীজতলায় কিংবা চারা রোপণের দু-তিন দিন পর ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত পানিতে ডুবে থেকে চারার ওপরের অংশ পচে গেলেও মূল গাছ আবার বেড়ে উঠে স্বাভাবিক ফলন দেয়। ২০১৯ সালের নভেম্বরে এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রেও বীনা-১১ কে ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত জলমগ্নতা সহনশীল উচ্চফলনশীল আমন জাত বলা হয়েছিল; ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও সুনামগঞ্জ জেলায় জাতটির ফলন নিয়ে গবেষণাটি করা হয়।
ইত্তেফাককে দেওয়া বীনার হিসাবে, জলমগ্ন অবস্থায় হেক্টরে সাড়ে ৪ থেকে ৫ টন এবং জলমগ্ন না হলে ৬ থেকে সাড়ে ৬ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল তথ্যভান্ডারে জাতটির জীবনকাল জলমগ্ন না হলে ১১৫ থেকে ১২০ দিন এবং ২০ থেকে ২৫ দিন ডুবে থাকলে ১৩০ থেকে ১৩৫ দিন লেখা আছে; সেখানে জলমগ্ন অবস্থায় সম্ভাব্য ফলন হেক্টরে ৪.৫ টন এবং অন্য অবস্থায় ৫ থেকে ৫.৪ টন উল্লেখ করা হয়েছে। দানা মাঝারি লম্বা, এক হাজার দানার ওজন ২৮.১ গ্রাম।
বীনা জানিয়েছিল, দেশে প্রতি বছর অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যায় প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমির ধান কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২১ সালে বন্যায় ৫০ হাজার হেক্টরের বেশি এবং আগের বছর ১ লাখ হেক্টরের বেশি জমির আমন নষ্ট হয়েছিল বলে প্রতিষ্ঠানটির হিসাব।

দুই ফসলি জমি থেকে তিন ফসলি
বীনার তৎকালীন মহাপরিচালক ও জাতটির উদ্ভাবক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেছিলেন, আগের আমন জাতগুলোর জীবনকাল বেশি হওয়ায় উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক বছরে দুটির বেশি ফসল করতে পারতেন না। স্বল্প জীবনকালের বীনা-১১ চাষ করলে একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল করা যায়: আগাম আমনের পর সরিষা, পাটশাক বা অন্য রবি ফসল, তারপর বোরো। তাঁর ভাষ্য, বরেন্দ্রসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক এভাবে দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি করেছেন।
তিনি আরও জানিয়েছিলেন, আশ্বিনের শেষ ভাগ থেকেই এই ধান কাটা শুরু হয়, ফলে খড় দিয়ে গোখাদ্যের চাহিদা মেটে এবং খড় বিক্রি করে কৃষক বাড়তি আয় করেন। জাতটি ছড়িয়ে দিতে তখন সারা দেশে এক হাজারের বেশি মাঠ প্রদর্শনী চলছিল।

ছবি: Md Abu Naeem / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: ইত্তেফাক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল তথ্যভান্ডার, এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস সাময়িকী (২০১৯)




মন্তব্য
(০)