জুন-জুলাইয়ে ছাদের ড্রামে লাগানো আমের কলমটিতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেই প্রথম মুকুল এসেছে। হলুদাভ সবুজ ফুলের থোকা দেখে যে কারও মনে হবে, এবার বুঝি নিজের গাছের আম খাওয়া হবে। অথচ অভিজ্ঞ বাগানিদের পরামর্শ শুনলে অবাক লাগে: প্রথম বছরের সব মুকুল ভেঙে দিন। কেন এই আপাত নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত, আর বাড়ির চিলেকোঠা, ছাদ, বারান্দা কিংবা উঠোনে একটি আমগাছকে কীভাবে বছরের পর বছর ফলবান রাখা যায়, সেই পুরো নিয়মই এই প্রতিবেদনের বিষয়।
আম অতি জনপ্রিয় ও সুস্বাদু ফল; সাধারণভাবে একে ফলের রাজা বলা হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে এর চাষ হয়, আর ২০১০ সালে আমগাছকে বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণা করা হয়। মাঠে আমগাছ সাধারণত বিশাল আকারের হয়ে থাকে। কিন্তু কলমের চারা আর সঠিক পরিচর্যার জোরে এখন বাড়ির ছাদে কিংবা উঠোনের এক কোণেও এই ফল ফলানো সম্ভব। শুরুটা হয় মাটি আর পাত্র দিয়ে।
দেশে আমের উৎপাদনও বিশাল। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে, উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ লাখ ৮৯ হাজার টনে। তবু শহরের মানুষের কাছে আম মানে বাজারের ফল। বাড়িতে একটি গাছ সেই দূরত্ব কমায়, আর সরকারও ছাদবাগানে উৎসাহ দিচ্ছে; ২০২৩ সালে ঘোষণা এসেছে, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় ছাদে বাগান করলে হোল্ডিং করে ১০ শতাংশ ছাড় মিলবে।
টব আর মাটি: ভিত্তি তৈরির কাজ
আম চাষের জন্য সর্বপ্রথম টবের মাটি তৈরি করতে হবে। ড্রামে লাগালে আগে ড্রামের জন্য সারমাটি তৈরি করে নিতে হয়। টবে আম চাষের জন্য দোআঁশ মাটি সর্বোত্তম। দোআঁশ মাটি হলো বালি, পলি ও কাদার মাঝামাঝি মিশ্রণ, যা পানি ধরে রাখে আবার অতিরিক্ত পানি ঝরিয়েও দেয়।
টবের মাটির সঙ্গে পরিমাণমতো গোবর সার, কম্পোস্ট সার, এমওপি সার, টিএসপি সার, হাড়ের গুঁড়া ও ম্যাগনেসিয়াম সালফেট মিশিয়ে নিতে হয়। প্রতিটি উপাদানের আলাদা কাজ আছে। গোবর ও কম্পোস্ট মাটিকে ঝুরঝুরে রাখে এবং ধীরে ধীরে খাবার জোগায়। এমওপি হলো পটাশ সার, যা গাছকে রোগ প্রতিরোধে শক্ত করে ও ফলের মান ভালো রাখে। টিএসপি থেকে আসে ফসফরাস, শিকড় গঠনের জন্য যা জরুরি। হাড়ের গুঁড়া ধীরে ধীরে ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম ছাড়ে। আর ম্যাগনেসিয়াম সালফেট পাতাকে সবুজ রাখতে সাহায্য করে, কারণ পাতার সবুজ রঙের কণার কেন্দ্রেই থাকে ম্যাগনেসিয়াম।
সারমাটি ড্রামে ভরার আগে ড্রামের তলায় ছিদ্র করে নিতে হবে, যাতে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যেতে পারে। আমগাছের শিকড় জমে থাকা পানি একেবারেই সহ্য করতে পারে না; বাতাস না পেলে শিকড় পচে যায়। ছিদ্রের মুখে তিন দিক থেকে পুরোনো মাটির টবের ভাঙা টুকরো এমনভাবে বসাতে হবে, যাতে ছিদ্রের মুখ বন্ধ না হয়। তার ওপর আরেকটি টুকরো দিয়ে ঢেকে পাতলা স্তরে খড় বিছিয়ে দিতে হবে। এরপর সারমাটি দিয়ে ড্রাম ভরে দিতে হবে। এই ব্যবস্থায় পানি বের হয়ে যায়, কিন্তু মাটি ধুয়ে যায় না।
কোন পাত্র, কত বড়
বাড়ির ছাদে আম চাষের জন্য মাঝারি ড্রাম বা হাফ ড্রাম সবচেয়ে ভালো। একটি পুরো ড্রাম মাঝখান থেকে কেটে দুটি হাফ ড্রাম বানানো যায়, তাতে খরচও কমে। এ ছাড়া মাটির বড় টবেও আমের চারা লাগানো যায়। মাটির টব বাতাস চলাচলের দিক থেকে ভালো, তবে ভারী এবং ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে; প্লাস্টিকের ড্রাম হালকা ও টেকসই। যে পাত্রই হোক, তাতে যেন যথেষ্ট মাটি ধরে এবং তলায় পানি বের হওয়ার পথ থাকে, এটাই মূল কথা।
বারান্দা, চিলেকোঠা না উঠোন
সব বাড়িতে খোলা ছাদ থাকে না। বারান্দায় আমগাছ রাখতে চাইলে প্রথমে দেখতে হবে সেখানে দিনে কতক্ষণ সরাসরি রোদ আসে; ছায়াঘেরা বারান্দায় গাছ বাঁচলেও ফুল-ফল কম আসে। বারান্দার মেঝেতে পানি বের হওয়ার পথ রাখতে টবের নিচে একটি ট্রে বসানো যায়, তবে ট্রেতে জমা পানি নিয়মিত ফেলে দিতে হবে, নইলে শিকড় পচবে। চিলেকোঠার পাশের খোলা জায়গাও ভালো বিকল্প, যদি সেখানে রোদ পড়ে।
উঠোন বা বাড়ির আঙিনায় জায়গা থাকলে আমগাছ সরাসরি মাটিতেই লাগানো যায়। সেখানে শিকড় ছড়ানোর বাধা নেই, তাই গাছ ড্রামের চেয়ে অনেক বড় হয়, ফলনও বেশি হয়, আর কয়েক বছর পর গাছ বদলানোর দরকার পড়ে না। বর্ষায় উঠোনের যে অংশে পানি জমে, সেখানে গাছ না লাগিয়ে একটু উঁচু জায়গা বেছে নেওয়া ভালো, কারণ ড্রামের মতো মাটিতেও আমের শিকড় জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তবে তখন বাড়ির দেয়াল, পাইপলাইন ও পাশের ভবন থেকে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে লাগাতে হয়। যেখানেই লাগান, ভালো চারা বাছাই সবার আগে। কেনার সময় কলমের জোড়ার জায়গাটি দেখে নিন; জোড়া মসৃণ ও শক্ত হলে বুঝবেন কলম ঠিকমতো লেগেছে। সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার বা পরিচিত নার্সারি থেকে চারা নেওয়াই নিরাপদ।
জাত বাছাই: কোন আম লাগাবেন
আমাদের দেশে অনেক জাতের আমের চাষ হয়, তার মধ্যে বেশ কিছু উন্নত জাত আছে। যেমন আম্রপালি, লতা, কেইট, বোম্বাই, সিন্দুরী, দশেরি, চৌষা, শ্রাবণী, মল্লিকা, নিলম ইত্যাদি। এর মধ্যে আম্রপালি জাতের আম খুব মিষ্টি, পাকার পর বেশ কয়েক দিন ঘরে রেখে খাওয়া যায়, আর গাছে ধরেও প্রচুর।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) আম্রপালিকে বারি আম-৩ নামে অবমুক্ত করেছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই জাত প্রতি বছর নিয়মিত ফল দেয়, গাছ তুলনামূলক খাটো ও খাড়া, আর শাঁস গাঢ় কমলা রঙের ও আঁশহীন। অনেক আমের জাত এক বছর বেশি ফল দিয়ে পরের বছর বিশ্রাম নেয়; নিয়মিত ফল দেওয়ার গুণের কারণেই টবের জন্য আম্রপালি এত জনপ্রিয়। এ ছাড়া থাইল্যান্ড থেকে আসা ‘ডক মাই’ জাতটিও ড্রামে লাগানো যায়।
কখন লাগাবেন চারা
আমের চারা রোপণের জন্য মূলত জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাস উত্তম, অর্থাৎ মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি। বর্ষার শুরুতে বাতাসে আর্দ্রতা থাকে, বৃষ্টি হয়, ফলে নতুন চারা দ্রুত মাটিতে শিকড় ছড়াতে পারে। আম্রপালির চারা লাগানোর ক্ষেত্রে ভাদ্র-আশ্বিন মাসও উপযুক্ত সময়।
ড্রামের মাঝখানে জুন-জুলাই মাসে আমের কলম সোজা করে পুঁতে দেওয়াই প্রচলিত নিয়ম। তবে সেচের সুবিধা থাকলে সারা বছরই চারা লাগানো যায়। শীতের মাঝামাঝি বা গ্রীষ্মের সবচেয়ে গরম সময়ে লাগালে চারার ওপর চাপ বেশি পড়ে, তাই তখন বাড়তি যত্ন দরকার হয়।
রোপণ ও প্রথম দিকের সেচ
আমের চারাগাছটিকে সোজা করে লাগাতে হবে। লাগানোর পর গাছের গোড়ায় মাটি কিছুটা উঁচু করে দিতে হবে এবং হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে হবে, যাতে ভেতরে ফাঁপা জায়গা না থাকে। খেয়াল রাখতে হবে, গাছের গোড়া দিয়ে যেন বেশি পানি না ঢুকতে পারে; গোড়ায় পানি জমলে কাণ্ডে পচন ধরতে পারে। কলমের জোড়ার জায়গাটি মাটির ওপরে রাখতে হবে।
চারা রোপণ করা হলে একটি সোজা কাঠি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে, যাতে বাতাসে হেলে না পড়ে। চারা লাগানোর পর প্রথম দিকে পানি কম দিতে হবে, তারপর আস্তে আস্তে পানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। চারা গাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ঘন ঘন সেচ দেওয়া দরকার। গাছ মাটিতে ভালোভাবে বসে গেলে শুকনো মৌসুমে প্রায় দশ দিন পর পর সেচ দিলেই চলে, তবে ছাদের গরমে ড্রামের মাটি কত দ্রুত শুকাচ্ছে তা দেখে এই হিসাব বদলাতে হয়। টবের গাছটিকে এমন জায়গায় রাখতে হবে, যেখানে প্রায় সারা দিন রোদ লাগে।
ড্রাম কোথায়, কীভাবে রাখবেন
টবে বা ড্রামে কলম লাগানোর পর পানি দিতে হবে। কলম যদি বেশি লম্বা হয় এবং ডগা মাটিতে লেগে যায়, তাহলে আগা কেটে কিছুটা খাটো করে দেওয়া যায়; এতে গাছ পাশের দিকে ডাল ছড়ায় এবং ঝোপালো হয়।
ড্রাম ছাদের ওপর এমনভাবে রাখতে হবে, যাতে ছাদ থেকে ড্রাম কিছুটা উঁচুতে বা ফাঁকা থাকে। তাহলে ছাদের কোনো ক্ষতি হয় না, কারণ ড্রামের নিচে পানি জমে থেকে ছাদের আস্তর নষ্ট হতে পারে না। এ জন্য ড্রামের তলায় চারপাশে চারটি ইট দিয়ে উঁচু করে দেওয়া যায়। আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার: ড্রামের সীমিত মাটিতে গাছ চিরকাল ভালো থাকে না। ড্রামে ছয়-সাত বছর গাছ রাখার পর সেটি সরিয়ে নতুন গাছ লাগালে ভালো হয়।
সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ
আম চাষে সঠিকভাবে যত্ন নিতে হবে। চারা রোপণের পর প্রতি বছর গাছে সার প্রয়োগ করতে হবে, আর আমের চারা যত বড় হবে, সারের মাত্রাও তত বাড়াতে হবে। নির্ধারিত নিয়মে বিভিন্ন জৈব ও অজৈব সার দিতে হবে, তাহলেই সঠিক ফলন পাওয়া যাবে।
প্রতি বছর বর্ষার আগে ও পরে ড্রামের মাটিতে গোবর ও অন্যান্য সার দিতে হবে। বছরে একবার প্রতি ড্রামে চারটি করে ট্যাবলেট সার পুঁতে দেওয়া যায়। ট্যাবলেট সার হলো চাপ দিয়ে বড়ির আকারে তৈরি সার, যা মাটির নিচে ধীরে ধীরে গলে অনেক দিন ধরে গাছকে খাবার দেয়। ট্যাবলেট সার দিলে শুধু গোবর সার দিলেই চলে, অন্য কোনো সার দেওয়ার দরকার হয় না।
মাঠের আমবাগানের জন্য কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শও এখানে কাজে লাগে। সেখানে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষ সময়ে পুরো পরিমাণ গোবর, টিএসপি, জিপসাম, জিংক সালফেট ও বোরিক এসিড এবং অর্ধেক ইউরিয়া ও অর্ধেক এমওপি সার দিতে হবে, আর গাছের বয়স অনুযায়ী পরিমাণ বাড়াতে হবে। ড্রামের গাছে পরিমাণ অনেক কম লাগবে, কিন্তু বর্ষার শেষে ভালো খাবার দেওয়ার এই সময়টি ছাদের গাছের জন্যও প্রযোজ্য।
মুকুল ঝরা ও পোকামাকড় দমন
আমগাছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। তার মধ্যে প্রথমটি হলো মুকুল ঝরা ও গুটি ঝরা। এই সমস্যা কমাতে প্লানোফিক্স নামের হরমোন মুকুল বের হওয়ার ঠিক আগে ও ঠিক পরে দুবার স্প্রে করা যায়। হরমোন হলো গাছের নিজের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিকের মতো উপাদান, যা ফুল ও কচি ফলকে বোঁটায় ধরে রাখতে সাহায্য করে। এ সময় প্রয়োজনে ছত্রাকনাশক ও কীটনাশকও ছিটানো যায়।
মুকুলের বড় রোগ অ্যানথ্রাকনোজ, যাতে মুকুল কালো হয়ে শুকিয়ে ঝরে পড়ে, পরে কচি আমের গায়েও কালো দাগ পড়ে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ হলো, মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে আক্রান্ত গাছে প্রতি লিটার পানিতে আধা মিলিলিটার টিল্ট-২৫০ ইসি অথবা ২ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ স্প্রে করা। আম মটরদানার আকার হলে কীটনাশকের সঙ্গে ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক মিশিয়ে আরেকবার স্প্রে করতে বলা হয়েছে। বাড়ির গাছে ওষুধ দেওয়ার সময় শিশু ও পোষা প্রাণীকে দূরে রাখা এবং মাত্রার বেশি না দেওয়া জরুরি।
এ ছাড়া আমগাছে শোষক পোকা বা হপার, থ্রিপস, ফলের মাছি ও ভোমরা পোকার আক্রমণে ফলন ও আমের গুণগত মান কমে যেতে পারে, তাই এসবের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। হপার মুকুলের রস চুষে খায় এবং মুকুল ঝরিয়ে দেয়। থ্রিপস অতি ক্ষুদ্র পোকা, যা কচি পাতা ও ফুলের ওপরের স্তর আঁচড়ে রস খায়। ফলের মাছি পাকার মুখে আমের ভেতরে ডিম পাড়ে, সেখান থেকে বের হওয়া কীড়া শাঁস নষ্ট করে। আর ভোমরা পোকার কীড়া আমের আঁটির ভেতরে থেকে ফল নষ্ট করে, বাইরে থেকে প্রায় বোঝাই যায় না।
কৃষি তথ্য সার্ভিস হপার দমনে কয়েকটি সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। মুকুল বের হওয়ার আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ দিন আগে কীটনাশক দিয়ে পুরো গাছ ভালোভাবে ধুয়ে দিতে হবে। এরপর মুকুল ১০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে কিন্তু ফুল ফোটার আগে, এবং আম মটরদানার আকার হলে, সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হারে স্প্রে করতে হবে। ফুল ফোটা অবস্থায় স্প্রে করা ঠিক নয়, তাতে মৌমাছির মতো পরাগায়নকারী পোকার ক্ষতি হয়। ফলের মাছি ও ভোমরা পোকা থেকে রক্ষায় কচি আম কাগজের ব্যাগে মুড়ে দেওয়াকে সবচেয়ে কার্যকর ও লাভজনক উপায় বলে উল্লেখ করেছে কৃষি তথ্য সার্ভিস। বাড়ির গাছে কয়েকটি আম হাতে মুড়ে দেওয়া কঠিন কিছু নয়।
প্রথম বছরের মুকুল কেন ভেঙে দেবেন
এবার ফিরে আসা যাক শুরুর প্রশ্নে। দেখা যায়, জুন-জুলাইয়ে লাগানো কলমের গাছে সাধারণত পরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে মুকুল আসে। কিন্তু প্রথম বছর মুকুল না রেখে সব ভেঙে দিতে হবে, আর পরের বছর আসা মুকুল রেখে দিতে হবে। তাতে দেখা যাবে, আমের ফলন প্রচুর হয়েছে।
এর পেছনের যুক্তি পরিষ্কার। সদ্য লাগানো কলমের শিকড় তখনো ড্রামের মাটিতে পুরোপুরি ছড়ায়নি, ডালপালাও সরু। এই অবস্থায় ফল ধরতে দিলে গাছের জমানো শক্তি ফলের পেছনে খরচ হয়ে যায়; গাছের বৃদ্ধি থেমে যায়, কখনো কখনো গাছ মরেও যায়। প্রথম বছরের মুকুল ভেঙে দিলে সেই শক্তি যায় শিকড় আর ডালপালা গঠনে। পরের বছর থেকে শক্ত গাছে শুরুতে পরিমিত ফল রেখে ধীরে ধীরে ফলন বাড়তে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সেচের ক্ষেত্রেও মুকুলের সময়টির সঙ্গে একটি সতর্কতা যুক্ত। কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, ফুল আসার এক মাস আগে আমগাছে সেচ না দেওয়াই উত্তম, কারণ তখন সেচ দিলে নতুন পাতা বের হয় এবং মুকুলের সংখ্যা কমে যায়। ফল ধরার পর থেকে বর্ষা শুরু পর্যন্ত মাসে একবার সেচ দেওয়া ভালো। ড্রামের মাটি দ্রুত শুকায় বলে গাছ যেন নেতিয়ে না পড়ে, সেটুকু লক্ষ রেখে এই নিয়ম মানতে হয়।
ছাঁটাই: আলো-বাতাসের পথ খোলা রাখা
গাছের ভেতরে যাতে আলো-বাতাস ঢুকতে পারে, সে জন্য অপ্রয়োজনীয় ডালপালা এবং রোগাক্রান্ত, শুকনো, মরা ও দুর্বল শাখাগুলো কেটে ফেলতে হবে। ঘন ডালপালার ভেতরে আর্দ্রতা আটকে থাকে, সেখানে ছত্রাকজনিত রোগ ও পোকার বাসা বাঁধে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ হলো, আম সংগ্রহের পরপরই রোগাক্রান্ত বা মরা ডাল কিছুটা ভালো অংশসহ কেটে ফেলা, কারণ তোলার পরেই গাছে নতুন ডাল গজায় এবং সেই ডালেই পরের বছর মুকুল আসে। ড্রামের গাছে ছাঁটাই আকার নিয়ন্ত্রণেরও উপায়; গাছ ছোট রাখলে ড্রামের মাটি তার খাবার জোগাতে পারে।
কখন ও কীভাবে আম তুলবেন, রাখবেন
আম গ্রীষ্মকালীন ফল। আমাদের দেশে সাধারণত জুন-জুলাই আম সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মূল সময়। আম তোলার সময় দু-তিনটি পাতাসহ বোঁটা কেটে তুলতে হবে; তাতে বোঁটার কষ আমের গায়ে লেগে দাগ পড়ে না, আম বেশি দিন ভালো থাকে।
বোঁটার নিচে আমের ত্বকে সামান্য হলুদাভ রং ধরলে, অথবা আধাপাকা আম গাছ থেকে নিজে নিজে পড়তে শুরু করলে বুঝতে হবে আম সংগ্রহের উপযুক্ত সময় হয়েছে। পাকা আম খাওয়া ছাড়াও কাঁচা আম শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়, যা সারা বছর রান্না ও আচারে কাজে লাগে।
পেড়ে আনা আম ছায়ায়, খবরের কাগজ বা খড় বিছিয়ে একটি স্তরে সাজিয়ে রাখলে কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সমানভাবে পেকে ওঠে। একটির ওপর আরেকটি চাপা দিয়ে রাখলে চাপ লাগা জায়গায় দ্রুত পচন ধরে। বাড়ির গাছ থেকে সব আম একদিনে না পেড়ে যেটি আগে পরিপক্ব হয়েছে সেটি আগে তুললে পুরো মৌসুমজুড়ে একটু একটু করে টাটকা আম খাওয়া যায়।
একটি গাছ থেকে কত আম
একটি আমগাছ থেকে বেশ কিছু আম পাওয়া যায়। সঠিকভাবে যত্ন নিয়ে গাছ বড় করতে পারলে একটি মাঝারি আকারের গাছ থেকে ১৫৫ থেকে ১৭০টি ফল পাওয়া সম্ভব। অবশ্য ড্রামের গাছে ফলের সংখ্যা নির্ভর করে জাত, গাছের বয়স আর পরিচর্যার ওপর; তাই প্রথম কয়েক বছর সংখ্যার চেয়ে গাছের স্বাস্থ্যের দিকেই বেশি নজর দেওয়া ভালো।
পুষ্টি আর রান্নাঘরে আম
আম অতীব রসালো ও মিষ্টি ফল, আর এই সুস্বাদু ফলে রয়েছে নানা খাদ্যগুণ। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্য তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম পাকা আমে প্রায় ৬০ ক্যালরি এবং প্রায় ৩৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে। পাকা আমের হলুদ-কমলা রং আসে এমন উপাদান থেকে, যা শরীরে গিয়ে ভিটামিন এ তৈরি করে, আর ভিটামিন এ চোখের জন্য জরুরি।
শুধু পাকা আম খাওয়াই নয়, কাঁচা আম দিয়ে নানা ধরনের সুস্বাদু আচার তৈরি হয়। আম দিয়ে জ্যাম, জেলি ইত্যাদিও তৈরি করা যায়। কাঁচা আম লবণ-মরিচ দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া বাঙালির চিরচেনা স্বাদ। এ ছাড়া ডাল, টক, চাটনি থেকে শুরু করে আমের নানা মিষ্টি খাবার তৈরি হয়। নিজের গাছের আম হলে কাঁচা অবস্থায় কিছু পেড়ে রান্নায় ব্যবহার করা আর বাকিগুলো গাছে পাকতে দেওয়ার সুযোগ থাকে।
বছরজুড়ে একটি আমগাছের যত্নের হিসাব
পুরো নিয়মটি এক জায়গায় আনলে দাঁড়ায় এমন: জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ে ভালো জাতের কলম সোজা করে লাগান, কাঠিতে বেঁধে দিন, প্রথমে অল্প পরে বেশি পানি দিন। বর্ষার আগে ও পরে গোবর ও সার দিন। প্রথম বছরের মুকুল ভেঙে দিন। ফুল আসার আগে সেচ কমান, মুকুলের সময় হপার আর ছত্রাকের দিকে নজর রাখুন, ফুল ফোটা অবস্থায় স্প্রে করবেন না। আম তোলার পর মরা ও রোগা ডাল ছেঁটে দিন। ছয়-সাত বছর পর ড্রামের গাছ বদলে নিন। এই কয়েকটি নিয়ম মেনে চললে বাড়ির ছাদ বা উঠোনের একটি গাছই বছরের পর বছর পরিবারের পাতে মিষ্টি আম তুলে দিতে পারে।
ছবি: আমের মুকুল, Kayser Ahmad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)





মন্তব্য
(০)