ভাদ্রের শেষ দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী বা নওগাঁর আমবাগানে গেলে একটা অদ্ভুত নীরবতা চোখে পড়ে। কয়েক মাস আগেও এখানে ঝুড়ি, ভ্যান আর পাইকারের ভিড় ছিল; ফজলি আর আশ্বিনা নামানোর পর এখন শুধু সবুজ পাতার ছায়া। অনেকে ভাবেন, আম শেষ, বাগানের কাজও আপাতত শেষ। অভিজ্ঞ চাষিরা জানেন উল্টোটা: আগামী বছর গাছে কতটা মুকুল আসবে, কতটা গুটি টিকবে আর বাজারে কেমন আম উঠবে, তার বড় অংশ ঠিক হয়ে যায় এই নিরিবিলি মাসগুলোতেই।
আম আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রিয় ফলগুলোর একটি, আর এখন এটি বড় বাণিজ্যিক ফসলও। উচ্চ ফলন আর ভালো মানের ফল পেতে হলে আম বাগানের আগাম পরিচর্যা, অর্থাৎ মুকুল আসার আগেই গাছ ও মাটিকে তৈরি করে রাখা, খুবই জরুরি। ঠিকমতো এই যত্ন নিলে গাছ সুস্থ থাকে, রোগবালাই কমে এবং ফলন বাড়ে। এই প্রতিবেদনে সেই কাজগুলো ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো: বাগান পরিষ্কার, ছাঁটাই, মাটি পরীক্ষা, সার, সেচ, মালচিং, রোগ ও পোকা দমন এবং ফুল আসার সময়ের বিশেষ যত্ন।
আম এখন বড় অর্থনীতি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ ৭০ হাজার টন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী ও নাটোর এখন আমের প্রধান অঞ্চল; সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, দিনাজপুর ও পার্বত্য এলাকাতেও বাণিজ্যিক বাগান বেড়েছে। ধানখেতের আল ঘেঁষে বা পুরোনো ধানি জমিতেই অনেকে নতুন আমবাগান গড়েছেন, কারণ একবার বাগান দাঁড়িয়ে গেলে বছরের পর বছর আয় আসে।
আমের নামডাকও বেড়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া, খিরসাপাত, ফজলি ও আশ্বিনা, রংপুরের হাঁড়িভাঙা, মেহেরপুরের হিমসাগর এবং নওগাঁর নাক ফজলি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। জিআই মানে হলো, নির্দিষ্ট এলাকার মাটি, আবহাওয়া আর চাষের ঐতিহ্যের কারণে ফলটির যে আলাদা স্বাদ ও পরিচিতি, তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
তবে বিদেশের বাজারে আমাদের আম এখনো সামান্যই যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে ২০২৪ সালে রপ্তানি হয়েছিল ১,৩২১ টন, আর ২০২৫ সালে তা প্রায় ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। রপ্তানির বাজারে দাগহীন, সমান আকারের, রোগমুক্ত ফল চাই। সেই মানের ফল পাওয়ার শুরু মুকুল আসার অনেক আগে, বাগানের যত্ন থেকে। দেশের বাজারেও একই কথা খাটে: দেখতে সুন্দর, দাগহীন আমের দাম বেশি।
রপ্তানির তালিকায় কোন জাত বেশি যায়, সেটিও লক্ষ করার মতো। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, রপ্তানি হওয়া আমের প্রায় ৮০ শতাংশই আম্রপালি; এর বাইরে হিমসাগর, ল্যাংড়া, বারি আম-৪ ও ফজলিও বিদেশে যায়। জাত যা-ই হোক, ক্রেতা চান একই মাপের, দাগহীন, পোকামুক্ত ফল, আর সেই মান ধরে রাখার ভিত্তি তৈরি হয় বাগানের সারা বছরের যত্নে।
এই যত্নের কোনো কাজই আলাদা করে দেখার বিষয় নয়। ছাঁটাই না করলে রোগ বাড়ে, রোগ বাড়লে বালাইনাশকের খরচ বাড়ে; মাটি দুর্বল হলে সার দিয়েও সুফল মেলে না; আর ভুল সময়ে সেচ দিলে মুকুলের বদলে পাতা আসে। তাই পুরো কাজটিকে একটি ধারাবাহিক পরিকল্পনা হিসেবে দেখা ভালো, যার শুরু আম নামানোর দিন থেকেই।
বাগান ঘুরে দেখা: প্রথম কাজ
আগাম পরিচর্যার প্রথম ধাপ হলো ধীরে সুস্থে পুরো বাগান ঘুরে দেখা। প্রতিটি গাছের গোড়া, কাণ্ড, ডালপালা আর পাতার অবস্থা খেয়াল করতে হয়। কোন ডাল শুকিয়ে গেছে, কোথায় বাকল ফেটে আঠা ঝরছে, কোন পাতায় দাগ বা ছত্রাকের সাদা আস্তরণ, কোন গাছে পরগাছা বাসা বেঁধেছে, এসব টুকে রাখলে পরের কাজগুলো গুছিয়ে করা যায়।
এরপর গাছের চারপাশের জমি পরিষ্কার করা। গাছের নিচে জমে থাকা আগাছা, ঝরা পাতা আর পচে যাওয়া ফল অনেক রোগজীবাণু ও পোকার আশ্রয়। আমের মৌসুম শেষে যে ফলগুলো মাটিতে পড়ে পচে, সেগুলোর ভেতর ফলের মাছি ও অন্যান্য পোকার বংশ বেড়ে চলে। তাই গোড়া পরিষ্কার রাখা শুধু সৌন্দর্যের ব্যাপার নয়, পরের মৌসুমের রোগ-পোকার চাপ কমানোর প্রায় বিনা খরচের একটি উপায়।
ছাঁটাই: আলো-বাতাস ঢোকার পথ
মৃত, শুকনো ও রোগাক্রান্ত ডাল কেটে ফেলা আগাম পরিচর্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী আম সংগ্রহের পর, মোটামুটি আগস্ট মাসে, রোগাক্রান্ত, মরা ও অপ্রয়োজনীয় ডালপালা এবং পরগাছা ছেঁটে গাছের ভেতরে আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হয়। যাঁরা দেরিতে পাকা জাতের আম নামান, তাঁরা ফল নামানোর পরপরই কাজটি সেরে ফেলতে পারেন।
ছাঁটাইয়ের পেছনে যুক্তিটা পরিষ্কার। ঘন, জট পাকানো ডালের ভেতরে রোদ ঢোকে না, বাতাস চলে না; ফলে স্যাঁতসেঁতে ছায়ায় ছত্রাক জন্মায়, পোকা লুকিয়ে থাকে। ছাঁটাইয়ের পর গাছে নতুন ডাল গজায়, আর আমের মুকুল সাধারণত এমন সুস্থ, পরিণত ডালের ডগাতেই আসে। তাই ঠিক সময়ে ছাঁটাই করলে পরের মৌসুমে ফলন বাড়ে।
ডাল কাটার পর কাটা জায়গা খোলা রাখা ঠিক নয়। ক্ষতস্থানে ১ শতাংশ বোর্দো মিশ্রণের প্রলেপ দিলে ছত্রাক সেখান দিয়ে ঢুকতে পারে না। বোর্দো মিশ্রণ হলো তুঁতে বা কপার সালফেট আর চুনের মিশ্রণ, যা শতাধিক বছর ধরে ফলবাগানে ছত্রাকনাশক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ১ শতাংশ মিশ্রণ বানাতে সাধারণত ১০ লিটার পানিতে ১০০ গ্রাম তুঁতে আর ১০০ গ্রাম চুন আলাদা করে গুলে পরে একসঙ্গে মেশানো হয়। মিশ্রণ বানানোর দিনই ব্যবহার করা ভালো।
মাটি পরীক্ষা: অনুমানে নয়, হিসাব করে
গাছের খাবারের ভান্ডার মাটি। তাই সার দেওয়ার আগে মাটির অবস্থা জানা দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাটির পিএইচ, অর্থাৎ মাটি কতটা অম্ল বা ক্ষারীয় তার মাপ। আমের জন্য আদর্শ পিএইচ ৫.৫ থেকে ৭। পিএইচ এর চেয়ে কমে গেলে, অর্থাৎ মাটি বেশি অম্ল হলে, গাছ মাটিতে থাকা অনেক পুষ্টি ঠিকমতো টেনে নিতে পারে না, সার দিলেও তার পুরো সুফল মেলে না।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটি পরীক্ষার সুযোগ দেয়, আর উপজেলা কৃষি অফিস থেকেও নমুনা পাঠানোর পরামর্শ পাওয়া যায়। বাগানের কয়েকটি জায়গা থেকে মাটি তুলে মিশিয়ে একটি নমুনা বানিয়ে পরীক্ষা করালে জানা যায় কোন পুষ্টির ঘাটতি আছে, কতটা চুন লাগবে। অনুমানে বেশি সার দিলে খরচ বাড়ে, মাটিরও ক্ষতি হয়। মাটি পরীক্ষার খরচ তুলনামূলক কম, কিন্তু এর ফল কয়েক মৌসুম ধরে কাজে লাগে; কারণ একবার জানা হয়ে গেলে কোন সার কতটা দরকার, তা নিয়ে আর প্রতি বছর আন্দাজ করতে হয় না। বড় বাগানে এলাকা ভাগ করে আলাদা নমুনা নেওয়াই ভালো, কারণ একই বাগানের উঁচু আর নিচু অংশের মাটি এক রকম না-ও হতে পারে।
জৈব সার, চুন ও রাসায়নিক সার
মাটির উর্বরতা বাড়াতে সবচেয়ে ভরসার জিনিস জৈব সার: পচা গোবর আর কম্পোস্ট। জৈব সার মাটিকে ঝুরঝুরে রাখে, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায় এবং উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বাড়ায়। আগাম পরিচর্যার অংশ হিসেবে প্রতিটি গাছের গোড়ায় ১৫ কেজি জৈব সার এবং ১ কেজি চুন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। চুন অম্ল মাটির পিএইচ ঠিক করতে সাহায্য করে এবং গাছকে ক্যালসিয়াম জোগায়।
জৈব সারের পাশাপাশি রাসায়নিক সার হিসেবে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সঠিক অনুপাতে দিতে হয়। ইউরিয়া নাইট্রোজেনের উৎস, যা পাতা ও ডালের বৃদ্ধি ঘটায়; টিএসপি ফসফরাস দেয়, যা শিকড় ও ফুলের জন্য দরকারি; আর এমওপি বা মিউরেট অব পটাশ পটাশিয়ামের উৎস, যা ফলের আকার, রং ও মিষ্টতায় ভূমিকা রাখে। গাছের বয়স যত বাড়ে, সারের মাত্রাও তত বাড়ে।
উদাহরণ হিসেবে, বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা বা বামিসের দেওয়া নির্দেশনায় পূর্ণবয়স্ক ফলন্ত গাছের জন্য বছরে ৫০ কেজি গোবর, ২ কেজি ইউরিয়া, ১ কেজি টিএসপি ও ৫০০ গ্রাম এমওপির কথা বলা হয়েছে। এই সার দুই কিস্তিতে দেওয়াই নিয়ম: প্রথম অর্ধেক বর্ষার আগে, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ে, আর বাকি অর্ধেক বর্ষার পরে, আশ্বিন মাসে। অর্থাৎ এখনই, এই আশ্বিনে, অনেক বাগানে দ্বিতীয় কিস্তির সময়। নিজের বাগানের সঠিক মাত্রা ঠিক করতে মাটি পরীক্ষার ফল আর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
নতুন বাগানের হিসাব আলাদা। চারা লাগানোর সময় গর্তেই সার মিশিয়ে দেওয়ার নিয়ম; বামিসের নির্দেশনায় প্রতি গর্তে ২২ কেজি গোবর, ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫৫০ গ্রাম টিএসপি ও ৩০০ গ্রাম এমওপির কথা বলা আছে। এরপর গাছ যত বড় হয়, প্রতি বছর মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ে। ছোট গাছে পূর্ণবয়স্ক গাছের মাত্রা দিলে শিকড় পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই বয়স অনুযায়ী হিসাব করাই নিরাপদ।
সার ছিটানোর জায়গাটাও গুরুত্বপূর্ণ। গাছের কাণ্ডের একেবারে গোড়ায় সার ঢাললে কাজ হয় কম, কারণ খাবার টেনে নেওয়ার সরু শিকড়গুলো থাকে ডালপালার ছায়া যতদূর ছড়িয়েছে তার কিনারা বরাবর। তাই কাণ্ড থেকে কিছুটা দূরে, ছায়ার সীমানা ধরে গোল করে মাটি আলগা করে সার মিশিয়ে দিয়ে হালকা সেচ দিলে সার দ্রুত শিকড়ে পৌঁছায়।
সেচ: কখন দিতে হবে, কখন নয়
আম গাছ অনেক গভীরে শিকড় ছড়ায়, তাই অন্য অনেক ফসলের মতো ঘন ঘন পানি চায় না। শীতকালে গাছের পানির চাহিদা কম থাকে, তবে মাটি একেবারে শুকিয়ে ফেটে যাক, সেটাও কাম্য নয়; মাটিতে কিছুটা আর্দ্রতা থাকা দরকার। শুষ্ক মৌসুমে গাছের অবস্থা বুঝে ১০ থেকে ১৫ দিন অন্তর সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, বিশেষ করে গুটি আসার পর চৈত্র-বৈশাখের গরমে, যখন পানির অভাবে কচি আম ঝরে পড়ে।
তবে মুকুল আসার ঠিক আগে ও ফুল ফোটার সময় সেচে সাবধান থাকতে হয়। অতিরিক্ত পানি দিলে ফুল ঝরে যেতে পারে, আবার গাছ মুকুলের বদলে নতুন পাতা ছাড়তে পারে। বামিসের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ফুল আসার আগের তিন মাস সেচ বন্ধ রাখতে হবে, তারপর দুই সময়ে সেচ দিতে হবে: মুকুল বের হওয়ার পর এবং গুটি যখন মটরদানার মতো হয়। এক কথায়, আমের সেচে পরিমাণের চেয়ে সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মালচিং ও আগাছা দমন
মালচিং মানে হলো গাছের গোড়ার চারপাশের মাটি খড়, শুকনো পাতা, কচুরিপানা বা অন্য জৈব আবরণে ঢেকে দেওয়া। এতে মাটির পানি রোদে কম উড়ে যায়, আর্দ্রতা বেশিদিন থাকে, আগাছা কম গজায় এবং আবরণ পচে গিয়ে মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ হয়। শুষ্ক মৌসুমে যাঁদের সেচের সুবিধা সীমিত, তাঁদের জন্য মালচিং বিশেষ উপকারী।
মালচ দেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হয় যেন আবরণ গাছের কাণ্ড ছুঁয়ে না থাকে; কাণ্ডের চারপাশে একটু ফাঁকা রাখলে সেখানে পচন ধরে না। আর গাছের নিচে জমে থাকা আগাছা ও পচা পাতা নিয়মিত সরিয়ে ফেলতে হয়, কারণ আগাছা মাটির পানি ও সারে ভাগ বসায়, আর পচা পাতা রোগজীবাণুর আস্তানা হয়ে ওঠে।
মুকুল আসার আগেই রোগ ও পোকার প্রস্তুতি
আমের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মুকুল আর কচি গুটির সময়ে। শীতের শেষে, মাঘ-ফাল্গুনে যখন গাছ মুকুলে ভরে যায়, তখন কয়েকটি রোগ ও পোকা একসঙ্গে হানা দিতে পারে। তাই বালাইনাশক ব্যবহারের পরিকল্পনা আগে থেকেই করে রাখতে হয়, যাতে ঠিক সময়ে, ঠিক মাত্রায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়, দেরিতে নয়।
রোগের মধ্যে প্রধান হলো পাউডারি মিলডিউ, যাতে মুকুল ও কচি পাতায় সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ পড়ে, আর অ্যানথ্রাকনোজ, যাতে মুকুল কালো হয়ে শুকিয়ে যায় এবং পরে ফলের গায়ে কালো দাগ পড়ে। এসব রোগের বিরুদ্ধে ১ শতাংশ বোর্দো মিশ্রণ স্প্রে করার পরামর্শ রয়েছে। বামিসের নির্দেশনায় অ্যানথ্রাকনোজের জন্য মুকুল ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে এবং গুটি মটরদানার মতো হলে ছত্রাকনাশক স্প্রে এবং ১০ দিন পরপর দুই থেকে তিনবার তা করার কথা বলা হয়েছে। পাউডারি মিলডিউর জন্য গন্ধকযুক্ত ছত্রাকনাশক ৫ থেকে ৭ দিন পরপর দুই থেকে তিনবার দেওয়ার পরামর্শ আছে।
আবহাওয়াও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। মুকুলের সময় টানা কুয়াশা, মেঘলা আকাশ বা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি থাকলে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যায়, আর অ্যানথ্রাকনোজ ও পাউডারি মিলডিউর মতো ছত্রাকজনিত রোগ তখন দ্রুত ছড়ায়। তাই এ সময় আবহাওয়ার পূর্বাভাসে চোখ রাখা দরকার। বামিসের ওয়েবসাইট ও কৃষি আবহাওয়া বার্তায় ফসলভিত্তিক পরামর্শ দেওয়া হয়, যা স্প্রের দিন ঠিক করতে কাজে আসে; বৃষ্টির ঠিক আগে স্প্রে করলে ওষুধ ধুয়ে যায়, টাকাও নষ্ট হয়।
পোকার মধ্যে আমের ঝিঁঝি পোকা বা হপার সবচেয়ে পরিচিত শত্রু। এরা মুকুলের রস চুষে খায়, ফলে মুকুল শুকিয়ে ঝরে যায়; আর এদের ছড়ানো মধুর মতো আঠালো রসে কালো ছত্রাক জন্মে পাতা ঢেকে দেয়। বামিসের নির্দেশনা অনুযায়ী মুকুল ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার লম্বা হলে একবার এবং গুটি মটরদানার মতো হলে আরেকবার সাইপারমেথ্রিন গোত্রের কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। বায়ো-পেস্টিসাইড বা জৈব বালাইনাশক দিয়েও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যায়।
আমের গুটিযুক্ত পোকা বা ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ থেকে ফল বাঁচাতেও আগে থেকে প্রস্তুতি দরকার। এখানে ফেরোমন ফাঁদ কাজে আসে। ফেরোমন হলো পোকার নিজস্ব গন্ধ-সংকেত; ফাঁদে সেই কৃত্রিম গন্ধ রেখে পুরুষ পোকাকে টেনে এনে আটকে ফেলা হয়, ফলে বংশবৃদ্ধি কমে যায়। এতে বিষ ছিটানোর দরকারও কমে, আর ফলে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থাকার ঝুঁকিও কমে, যা রপ্তানির বাজারে বড় বিবেচনা।
যে বালাইনাশকই ব্যবহার করা হোক, লেবেলে লেখা মাত্রা আর নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। ফুল পুরোপুরি ফোটার সময় কীটনাশক স্প্রে এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ তখন মৌমাছিসহ পরাগ বহনকারী পোকারা বাগানে আসে; ওরা না এলে ফুল থাকলেও গুটি কম ধরে। কোন ওষুধ কখন দেবেন, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে উপজেলা কৃষি অফিস বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
ফুল আসার সময় বিশেষ যত্ন
মুকুল বের হওয়ার পর থেকে গাছের চাহিদা বদলে যায়। এ সময় নাইট্রোজেন সার কম দিয়ে পটাশিয়াম সার বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। নাইট্রোজেন বেশি পেলে গাছ নতুন পাতা আর ডাল গজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ফুল আর গুটির দিকে শক্তি কম যায়। পটাশিয়াম ফুল ও কচি ফলকে শক্ত রাখে এবং ঝরে পড়া কমায়।
ফুলের সময় অতিরিক্ত পানি বা সার দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হয়। অনেকে ভালো ফলনের আশায় এই সময় বাড়তি সার বা পানি ঢালেন, কিন্তু তাতে উল্টো ফুল ঝরে যেতে পারে। মনে রাখা দরকার, গাছে যত মুকুলই আসুক, তার সামান্য অংশই শেষ পর্যন্ত পাকা আমে রূপ নেয়; লক্ষ্য হলো সেই অংশটা যতটা সম্ভব বাড়ানো।
মাস ধরে কাজের তালিকা
ওপরের পরামর্শগুলো ক্যালেন্ডারে সাজালে কাজের একটা পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়। অঞ্চল ও জাতভেদে কয়েক সপ্তাহ আগে-পিছে হতে পারে, তবে মোটা দাগে বছরের কাজ এমন:
- আম নামানোর পর, মোটামুটি শ্রাবণ-ভাদ্রে বা আগস্টে: মরা, রোগাক্রান্ত ও অপ্রয়োজনীয় ডাল এবং পরগাছা ছাঁটাই; কাটা জায়গায় বোর্দো মিশ্রণের প্রলেপ।
- আশ্বিনে: সারের দ্বিতীয় কিস্তি, সঙ্গে জৈব সার ও প্রয়োজনে চুন; সার দেওয়ার পর হালকা সেচ।
- কার্তিক থেকে পৌষ: বাগান পরিষ্কার, আগাছা দমন, গোড়ায় মালচিং; মুকুলের আগের তিন মাস সেচ বন্ধ রাখা।
- মাঘে মুকুল বের হলে: মুকুল ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার হলে হপার দমনে স্প্রে, ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার হলে অ্যানথ্রাকনোজ দমনে ছত্রাকনাশক; এ সময় একবার সেচ।
- ফাল্গুনে ফুল পুরো ফুটলে: কীটনাশক স্প্রে এড়ানো, নাইট্রোজেন কমিয়ে পটাশ বাড়ানো, বাড়তি পানি না দেওয়া।
- চৈত্রে গুটি মটরদানার মতো হলে: দ্বিতীয় দফা স্প্রে ও সেচ; এরপর গরমে ১০ থেকে ১৫ দিন অন্তর সেচ, ফল ছিদ্রকারী পোকার জন্য ফেরোমন ফাঁদ।
প্রতিটি কাজ কোন দিন করা হলো, কোন ওষুধ কত মাত্রায় দেওয়া হলো, একটি খাতায় লিখে রাখার অভ্যাসও কাজে আসে। পরের বছর কোন গাছে ফলন কম হলো তার কারণ খুঁজতে এই হিসাব সাহায্য করে, আর রপ্তানিকারক বা বড় ক্রেতারা অনেক সময় বালাইনাশক ব্যবহারের এমন রেকর্ডই দেখতে চান।
আগাম যত্নে কী মেলে
নিয়ম মেনে আগাম পরিচর্যা করলে তার ফল চোখে পড়ে পরের মৌসুমেই। মাঠের অভিজ্ঞতা ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মিলিয়ে সুফলগুলো এমন:
- গাছের ফুল ঝরে পড়া কমে যায়।
- রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়, বালাইনাশকের খরচও কমে।
- গাছের বৃদ্ধি ভালো হয় এবং ফলন বাড়ে।
- ফলের আকার, গুণগত মান ও স্বাদ উন্নত হয়, বাজারে দামও ভালো মেলে।
- গাছ দীর্ঘদিন ধরে ভালো ফলন দেওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখে।
শেষ সুফলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমগাছ কয়েক দশক ধরে ফল দেয়। যে বাগান প্রতি বছর যত্ন পায়, তার গাছ সুস্থ থাকে, বছর বাদ দিয়ে ফল দেওয়ার প্রবণতাও তুলনামূলক কম দেখা যায়। আর যে বাগান অবহেলায় পড়ে থাকে, সেখানে এক বছর বাম্পার ফলনের পর পরের বছর প্রায় শূন্য, এমন ওঠানামা বেশি হয়।
আশ্বিনের পরিশ্রম, জ্যৈষ্ঠের হিসাব
আম বাগানের আগাম পরিচর্যা সঠিক সময়ে আর সঠিক পদ্ধতিতে করলে ফলনের পরিমাণ ও মান দুটোই বাড়ে। ছাঁটাই, মাটি পরীক্ষা, সার, মাপা সেচ, মালচিং আর সময়মতো বালাই দমন, এই কাজগুলোর কোনোটিই খুব ব্যয়বহুল নয়, কিন্তু একসঙ্গে করলে এর প্রভাব বড়। ঠিকমতো যত্ন নেওয়া বাগান শুধু ভালো ফলনই দেয় না, একটি লাভজনক কৃষি উদ্যোগেও পরিণত হতে পারে।
এখন যখন বাগানে কোনো ফল নেই, তখনই আসলে কাজের সময়। আজ যে ডালটি ছাঁটা হলো, যে গাছের গোড়ায় জৈব সার পড়ল, সেখান থেকেই আগামী মাঘে মুকুল ফুটবে, আর জ্যৈষ্ঠে বাজারে উঠবে ভালো দামের আম। কৃষকেরা এই পরামর্শগুলো মেনে চললে তাঁদের আম বাগান আরও সফল এবং লাভজনক হবে বলে আশা করা যায়।
ছবি: ধানখেতের পাশে আমবাগান, SyedAminul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)





মন্তব্য
(০)