ইলিশসহ রুই, কাতলা, আইড় ও বোয়ালের মতো দেশীয় মাছ আমদানি না করে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর সুপারিশ বারবার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর, কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদক মুছা মল্লিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর তৎকালীন মহাপরিচালক আবদুর রউফ স্বাক্ষরিত চিঠিতে দেশীয় মাছের আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যার ৩৭ দশমিক ০৬ শতাংশ (১৮ দশমিক ৬০ লাখ টন) কার্পজাতীয়; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯০ হাজার ৬২০ টন মৎস্যপণ্য রপ্তানিতে ৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা এসেছে এবং জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। আমদানি নীতি আদেশে ভারত ও মিয়ানমার থেকে রুই, কাতলা, ভেটকি, বোয়াল ও কাঁচকি আসছে; ঢালাও আমদানি অভ্যন্তরীণ মৎস্যচাষে বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং আমদানি করা মাছে ফরমালিন, ভারী ধাতু, অ্যান্টিবায়োটিক ও হিস্টামিনের ঝুঁকি আছে বলে সতর্ক করা হয়।
চিঠি পাঠানোর তিন মাসের বেশি পর ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের তা অতিরিক্ত সচিবকে ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়ে পাঠান, তবু অগ্রগতি হয়নি; চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর আমদানি-নির্ভরতা কমাতে পাঠানো নতুন চিঠিও ফাইলবন্দি। অতীতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এক বছরেই ৮ হাজার ১২৫ দশমিক ৬১৭ টন ইলিশ আমদানিতে প্রায় ৬১ লাখ ৬৪ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছিল; বেনাপোল দিয়ে ২০২৪-২৫-এ ৫৬৬ টন, ২০২৫-২৬-এ ৭৬৫ টন এবং চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত ৪৫০ টন এসেছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া ৪৩১ কোটি টাকার ইলিশ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হলেও টেকসই কাঠামো তৈরি হয়নি এবং অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে সূত্র জানায়। মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, ‘প্রকল্পে কী কী অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা উচিত’; কারা জড়িত ছিল ও কোন প্রক্রিয়ায় অর্থ বেহাত হয়েছে, গভীর অনুসন্ধানে অনেক কিছু বেরিয়ে আসতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। দাম অন্যায্যভাবে বাড়লে প্রতি বছর সীমিত ইলিশ আমদানি করে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা হয়, তবে আমদানি-নির্ভরতা না কমলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হবে বলেও তিনি জানান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরোপুরি আমদানি বন্ধের প্রধান বাধা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার গ্যাট চুক্তির ১১ অনুচ্ছেদ, যা শুল্ক ছাড়া কোটা বা লাইসেন্সের মতো পরিমাণগত নিষেধাজ্ঞা নিষিদ্ধ করে; তাই সরবরাহ, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা, জেলেদের জীবিকা ও মৎস্যসম্পদের ভারসাম্য বিবেচনায় তথ্যভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং নদী ও অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা, জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণে জোর দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএফআরআইয়ের সাবেক পরিচালক ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, বিশেষ সংকট না থাকলে দেশে উৎপাদিত মাছ বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজন তিনি দেখেন না; স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে ইলিশ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে হবে।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট — প্রতিবেদন: মুছা মল্লিক





মন্তব্য
(০)