সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°আংশিক মেঘলাআর্দ্রতা ৮০%বাতাস ১০ কিমি/ঘ

বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং তাদের উপকারিতা

ইলিশে ওমেগা-৩, রুইয়ে ভিটামিন ডি, কাতলায় ভিটামিন এ, পুঁটিতে ক্যালসিয়াম, মাগুরে আয়রন, শিংয়ে শক্তি। বাঙালির পাতের এগারোটি পরিচিত মাছের প্রতিটি শরীরকে আলাদা কিছু দেয়। কোন মাছে কী পুষ্টি, আর রোজকার খাবারে কীভাবে বেছে নেবেন।

বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং তাদের উপকারিতা
দৈনন্দিন

ভোরের মাছের বাজারে পা রাখলেই চোখে পড়ে রুপালি ইলিশের সারি, ঝুড়িভরা ছোট পুঁটি, পানির গামলায় লাফাতে থাকা শিং-মাগুর আর বড় বড় রুই-কাতলা। ক্রেতা দাম জিজ্ঞেস করেন, মাছ উল্টে কানকো দেখেন, তারপর থলেতে তোলেন। কিন্তু বাজারের এই বৈচিত্র্যের পেছনে আরেকটি বৈচিত্র্য লুকিয়ে থাকে, যা খালি চোখে দেখা যায় না: পুষ্টির বৈচিত্র্য। মাছ পুষ্টির অসাধারণ উৎস এবং সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তবে প্রতিটি মাছের আলাদা পুষ্টিগুণ ও আলাদা স্বাস্থ্য উপকারিতা আছে। কোন মাছ হৃদয়ের বন্ধু, কোনটি হাড়ের, কোনটি রক্তের, সেটা জানা থাকলে বাজারের থলেটা আরও বুঝেশুনে ভরা যায়।

বাঙালির পাতে মাছ: কিছু হিসাব


মাছে-ভাতে বাঙালি কথাটা শুধু প্রবাদ নয়, পরিসংখ্যানেও তার প্রমাণ মেলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী ২০২২ সালে দেশে একজন মানুষ দিনে গড়ে প্রায় ৬৭.৮ গ্রাম মাছ খেয়েছেন, যা ২০১৬ সালে ছিল ৬২.৬ গ্রাম। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪৯ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের বড় অংশই আসে মাছ থেকে।

অর্থাৎ মাছ এ দেশে বিলাসের খাবার নয়, প্রতিদিনের খাবার। তাই কোন মাছে কী আছে, তা জানা মানে পরিবারের পুষ্টির পরিকল্পনা আরও ভালোভাবে করতে পারা।

মাছে কী থাকে, কেন তা দরকার


প্রায় সব মাছেই থাকে উন্নত মানের আমিষ বা প্রোটিন, যা শরীরের পেশি, ত্বক, চুল ও রোগ প্রতিরোধের কোষ তৈরিতে লাগে। মাংসের তুলনায় মাছের আমিষ হজম হয় তাড়াতাড়ি, তাই শিশু, বয়স্ক ও রোগীর জন্যও তা উপযোগী।

আমিষের গুরুত্ব বোঝা যায় শরীরের প্রতিদিনের ক্ষয়পূরণের হিসাব থেকে। পেশি, রক্তের কণিকা, এনজাইম, হরমোন, সবই তৈরি হয় আমিষ দিয়ে, আর শরীর প্রতিদিন এসবের কিছু অংশ নতুন করে গড়ে। মাছের আমিষে শরীরের প্রয়োজনীয় সব অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে, যেগুলো শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না, খাবার থেকেই নিতে হয়। তাই ভাতের সঙ্গে এক টুকরো মাছ থালার পুষ্টির মান অনেকটা বাড়িয়ে দেয়।

তেলযুক্ত মাছে থাকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, একধরনের উপকারী চর্বি যা শরীর নিজে যথেষ্ট তৈরি করতে পারে না। হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালির স্বাস্থ্য, মস্তিষ্ক ও চোখের গঠনে এর ভূমিকা নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। এর বাইরে মাছে পাওয়া যায় ভিটামিন এ ও ডি, আর ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, পটাশিয়ামের মতো খনিজ। কোন মাছে কোনটি বেশি, তাতেই মাছে মাছে পার্থক্য।

ছোট মাছের কথা এখানে আলাদা করে বলা দরকার। আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের গবেষণা বলছে, মলার মতো যেসব ছোট মাছ কাঁটা ও মাথাসহ পুরোটা খাওয়া হয়, সেগুলো আয়রন, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ ও ভিটামিন বি১২ এর চমৎকার উৎস। তাদের গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পুরো ছোট মাছ থেকে শরীর যে হারে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করে, তা দুধের সমান।

একই গবেষণার আরেকটি তথ্য চোখ খুলে দেওয়ার মতো। বাড়ির পুকুরে চাষ করা মাছের মধ্যে ওজনের হিসাবে মলা ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ, অথচ ওই পুকুরগুলোর সব মাছ মিলিয়ে যত ভিটামিন এ উৎপন্ন হয়েছে, তার ৯৮ শতাংশই এসেছে মলা থেকে; আয়রনের ৫৬ শতাংশ আর জিঙ্কের ৩৫ শতাংশও এসেছে এই ছোট মাছটি থেকে। ওয়ার্ল্ডফিশের হিসাবে, পুকুরের মলা পরিবারেই খাওয়া হলে চারজনের একটি পরিবারের বছরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন এ এর অর্ধেক আর আয়রনের এক-চতুর্থাংশ মেটানো সম্ভব। ভিটামিন এ এর অভাব শিশুদের অন্ধত্বের একটি প্রধান প্রতিরোধযোগ্য কারণ, তাই এই হিসাবের গুরুত্ব অনেক।

মাছ রান্নার ধরনও পুষ্টির ওপর প্রভাব ফেলে। খুব বেশি তাপে দীর্ঘক্ষণ ভাজলে ওমেগা-৩ এর মতো সূক্ষ্ম চর্বি নষ্ট হয় এবং বাইরের তেল যোগ হয়। ঝোল, ভাপা বা অল্প তেলে রান্নায় মাছের নিজের গুণ বেশি টিকে থাকে। ভিটামিন ডি এর কথাও আলাদা করে মনে রাখা দরকার: খুব কম খাবারেই এটি প্রাকৃতিকভাবে থাকে, আর মাছ সেই অল্প কয়েকটি উৎসের একটি।

হৃদয়ের সুরক্ষায় মাছের ভূমিকা এতটাই স্বীকৃত যে যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতো স্বাস্থ্য সংস্থা সপ্তাহে অন্তত দুবার মাছ, বিশেষ করে তেলযুক্ত মাছ খাওয়ার পরামর্শ দেয়। বাংলাদেশের মানুষের জন্য এই পরামর্শ মানা কঠিন কিছু নয়, কারণ বেশির ভাগ পরিবারে মাছ প্রায় প্রতিদিনের খাবার। প্রশ্ন শুধু কোন মাছ, কীভাবে রান্না।

ইলিশ: হৃদয়ের বন্ধু


বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। ২০১৭ সালে ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, অর্থাৎ এটি আনুষ্ঠানিকভাবে এ দেশের নিজস্ব পরিচয়ের পণ্য। স্বাদে যেমন অতুলনীয়, পুষ্টিতেও তেমনি ভরপুর।

ইলিশ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। ইলিশের চর্বি নিয়ে দেশি-বিদেশি গবেষণায় দেখা গেছে, এতে ইপিএ ও ডিএইচএ নামের দুই ধরনের ওমেগা-৩ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকে; মাছের আকার, মৌসুম ও নদীভেদে এর মাত্রা ওঠানামা করে। এই চর্বি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক, ত্বক ও চুল সুস্থ রাখে, আর আর্থ্রাইটিস বা গিঁটে ব্যথা এবং শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে।

ইলিশ বাংলাদেশের মাছের ভান্ডারেও বিশেষ জায়গা নিয়ে আছে। মৎস্য গবেষণার তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে এই একটি প্রজাতি থেকে, আর বিশ্বের মোট ইলিশের সিংহভাগই ধরা পড়ে বাংলাদেশের নদী ও সাগরে। এই সম্পদ টিকিয়ে রাখতে প্রজনন মৌসুমে নির্দিষ্ট সময় ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, আর ছোট ইলিশ বা জাটকা ধরাও নিষেধ। ক্রেতা হিসেবে জাটকা না কেনাও তাই এই পুষ্টির উৎস রক্ষার অংশ।

ইলিশের এই উপকার পেতে রান্নার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। ভাপা বা ঝোলে রান্না করলে মাছের নিজের তেল অনেকটা মাছেই থাকে, কিন্তু ডুবো তেলে ভাজলে বাইরের তেল যোগ হয়।

রুই: প্রতিদিনের ভরসা


বাঙালির পাতে সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে রুইয়ের। পুকুর থেকে নদী, সবখানেই এই মাছ পাওয়া যায়, দামও নাগালের মধ্যে থাকে। রুই প্রোটিন ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ। ভিটামিন ডি শরীরকে খাবার থেকে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, ফলে হাড় মজবুত হয়।

রুইয়ের মাংস তুলনামূলক হালকা, তাই হজমশক্তি ভালো রাখতে সহায়ক। চর্বি কম হওয়ায় লাল মাংসের বদলে রুই খেলে রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতেও তা সাহায্য করে। রুইয়ের মাথা দিয়ে মুড়িঘণ্ট বা ডালের সঙ্গে রান্না এ দেশে বহুকালের রীতি, আর মাথাতেও রয়েছে পুষ্টি।

কাতলা: চোখ আর মস্তিষ্কের যত্নে


রুইয়ের জ্ঞাতিভাই কাতলা বড় মাথা আর চওড়া দেহের জন্য বাজারে এক নজরেই চোখে পড়ে। কাতলা ভিটামিন এ এবং ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ। ভিটামিন এ চোখের জন্য ভালো, রাতকানা রোগ প্রতিরোধে এর ভূমিকা সুপরিচিত।

কাতলার ওমেগা-৩ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। কাতলার বড় মাথাটি অনেক পরিবারে সবচেয়ে আদরের অংশ, আর তাতে চর্বি ও পুষ্টি দুটোই মেলে।

পুঁটি: ছোট মাছে বড় পুষ্টি


দামে সস্তা, আকারে ছোট, কিন্তু পুষ্টিতে বড়, এই হলো পুঁটি। ছোট মাছ হিসেবে পুঁটি কাঁটাসহ খাওয়া হয়, তাই এটি ক্যালসিয়ামে সমৃদ্ধ, যা হাড় ও দাঁতের জন্য উপকারী। বাড়ন্ত শিশু, গর্ভবতী মা আর বয়স্কদের জন্য এই ক্যালসিয়াম বিশেষ দরকারি।

পুঁটিতে থাকা আয়রন রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ করে। দেশে নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তশূন্যতা একটি পরিচিত সমস্যা, তাই ছোট মাছ নিয়মিত খাওয়া এর বিরুদ্ধে একটি কম খরচের উপায়। পুঁটি ত্বক উজ্জ্বল রাখতেও সাহায্য করে। পুঁটির চচ্চড়ি বা ভাজা, যেভাবেই খাওয়া হোক, কাঁটা ফেলে না দিয়ে পুরোটা খেলেই সবচেয়ে বেশি উপকার।

তেলাপিয়া: হালকা খাবারের সঙ্গী


আফ্রিকা থেকে আসা তেলাপিয়া এখন দেশের পুকুরে সবচেয়ে প্রচলিত চাষের মাছগুলোর একটি। দামে সাশ্রয়ী আর কাঁটা কম বলে শিশুরাও খেতে পছন্দ করে।

তেলাপিয়া কম ক্যালোরি এবং বেশি প্রোটিনযুক্ত, তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। যাঁরা ওজন কমাতে চান কিন্তু আমিষ কমাতে চান না, তাঁদের জন্য এটি ভালো বিকল্প। এটি হৃদরোগ প্রতিরোধেও কার্যকর বলে ধরা হয়। তেলাপিয়ায় পটাশিয়াম থাকে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

চিংড়ি: সেলেনিয়ামের ভান্ডার


বাজারে যাকে চিংড়ি মাছ বলা হয়, প্রাণিবিজ্ঞানের হিসাবে সেটি আসলে মাছ নয়, কাঁকড়ার মতো খোলসধারী জলজ প্রাণী। তবে বাঙালির রান্নাঘরে চিংড়ি মাছের সম্মানই পায়; মালাইকারি থেকে লাউ-চিংড়ি, সব রান্নায় এর কদর। বাগদা ও গলদা চিংড়ি দেশের রপ্তানি আয়েরও একটি পরিচিত উৎস।

চিংড়ি সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ। সেলেনিয়াম একটি খনিজ, যা শরীরের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে, থাইরয়েড গ্রন্থির কাজে লাগে এবং রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে; ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক উপাদান হিসেবেও এর কথা বলা হয়। চিংড়ির প্রোটিন ও ভিটামিন ডি ত্বক ও চুলের জন্য ভালো।

কোলেস্টেরল প্রসঙ্গে একটু সতর্ক হয়ে বলা দরকার। চিংড়িতে সম্পৃক্ত চর্বি খুব কম, আর পুষ্টিবিদেরা বলেন, রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ায় মূলত সম্পৃক্ত চর্বি। তবে চিংড়িতে নিজেই কিছুটা কোলেস্টেরল থাকে, তাই যাঁদের হৃদরোগ বা উচ্চ কোলেস্টেরল আছে, তাঁরা পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। আর ঘি-মাখন বা বেশি তেলে রান্না করলে চিংড়ির উপকার অনেকটাই কমে যায়।

তেলাপিয়া ও পাঙ্গাসের মতো চাষের মাছের একটা বড় সুবিধা হলো সারা বছর পাওয়া যায়, দামও তুলনামূলক স্থির থাকে। নদীর মাছের মৌসুম ফুরোলেও এসব মাছ বাজারে থাকে, ফলে পরিবারের আমিষের জোগান বছরজুড়ে বজায় রাখা যায়।

বোয়াল: হজমে হালকা আমিষ


নদী আর বিলের বড় শিকারি মাছ বোয়াল, মুখভর্তি ধারালো দাঁত আর নরম মাংসের জন্য পরিচিত। বোয়ালের মাংসে কাঁটা কম, তাই খেতে আরামদায়ক।

বোয়াল হজমশক্তি ভালো রাখতে সহায়ক এবং শরীরকে পুষ্টিকর প্রোটিন সরবরাহ করে। এর পুষ্টি উপাদান ত্বক ভালো রাখে এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে। বোয়াল সাধারণত ঝাল ঝোলে রান্না হয়; তেল-মসলা পরিমিত রাখলে এর হালকা ভাবটা বজায় থাকে।

জিওল মাছ: কেন রোগীর পথ্য


মাগুর, শিং আর কৈ, এই তিন মাছকে একসঙ্গে জিওল মাছ বলা হয়। জিওল শব্দটা এসেছে জীবিত বা জ্যান্ত থাকার ধারণা থেকে। এদের ফুলকার পাশাপাশি বাড়তি একটি শ্বাসযন্ত্র থাকে, যা দিয়ে এরা পানির ওপর থেকে সরাসরি বাতাস নিতে পারে। তাই অল্প পানিতে, এমনকি কাদার মধ্যেও এরা অনেকক্ষণ বেঁচে থাকে, আর বাজারে জ্যান্ত অবস্থায় বিক্রি হয়।

জ্যান্ত কেনা যায় বলে এসব মাছের টাটকা থাকা নিয়ে সন্দেহ থাকে না, আর এদের মাংস নরম ও কম চর্বির, হজমেও হালকা। এ কারণেই বহু প্রজন্ম ধরে বাংলার ঘরে ঘরে অসুস্থ, প্রসূতি বা সদ্য সেরে ওঠা মানুষের পথ্য হিসেবে জিওল মাছের পাতলা ঝোলের চল। নিচে এই তিন মাছের কথা আলাদা করে।

মাগুর: রক্ত আর শক্তির জোগান


গ্রামবাংলায় অসুস্থ মানুষের পথ্য হিসেবে মাগুর মাছের ঝোলের কথা বহুকাল ধরে প্রচলিত। মাগুর আয়রন সমৃদ্ধ, যা রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ করে।

মাগুর শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। হালকা মসলায় রান্না করা মাগুরের ঝোল পেটের অসুখে উপকারী বলে ধরা হয়, কারণ এটি হজমে ভারী নয়। এখন হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশি মাগুরের পোনা উৎপাদন করে পুকুরে চাষও হচ্ছে।

শিং: শরীরের শক্তি আর ক্ষত সারাতে


মাগুরের মতো শিংও জিওল মাছ, অর্থাৎ বাতাস থেকে শ্বাস নিতে পারে বলে কম পানিতেও অনেকক্ষণ বেঁচে থাকে। তাই বাজারে শিং সাধারণত জ্যান্ত বিক্রি হয়। সাবধান থাকতে হয় এর কাঁটা নিয়ে; শিংয়ের কাঁটার খোঁচা বেশ যন্ত্রণাদায়ক।

শিং ক্যালসিয়াম এবং আয়রনে সমৃদ্ধ, যা হাড় মজবুত করে। এটি শরীরের শক্তি বাড়ায় এবং ক্ষত নিরাময়ে সহায়ক বলে পরিচিত। অস্ত্রোপচার বা অসুখের পর দুর্বল রোগীকে শিং মাছের পাতলা ঝোল দেওয়ার চল অনেক পরিবারেই আছে।

পাঙ্গাস: সাশ্রয়ী শক্তি


চাষের মাছের মধ্যে পাঙ্গাস এখন অন্যতম সাশ্রয়ী মাছ। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পাতে আমিষ পৌঁছে দিতে এর অবদান বড়।

পাঙ্গাস প্রোটিন ও চর্বি সরবরাহ করে, যা শরীরের শক্তি বজায় রাখে। পাঙ্গাস হৃদরোগ প্রতিরোধেও সহায়ক বলে ধরা হয় এবং পরিমিত পরিমাণে খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। রান্নার আগে পেটের চর্বির বাড়তি অংশ কেটে ফেললে মাছটি আরও হালকা হয়।

হাওর, বিল আর বড় নদীতে বোয়াল পাওয়া যায়, আর আকারে অনেক বড় হতে পারে। বড় বোয়াল কেটে ভাগ করে বিক্রি হয়, তাই ছোট পরিবারও প্রয়োজনমতো কিনতে পারে।

কৈ: রোগ প্রতিরোধের বন্ধু


শক্ত আঁশ আর তেজি স্বভাবের জন্য কৈ মাছ বিখ্যাত। কই মাছের প্রাণ, এই প্রবাদই বলে দেয় মাছটি কতটা কষ্টসহিষ্ণু। শিং-মাগুরের মতো কৈও বাতাস থেকে শ্বাস নিতে পারে।

কৈ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শরীরকে দ্রুত শক্তি দেয়। শীতের দিনে সর্দি-কাশি এবং পেটের রোগ প্রতিরোধে কৈ মাছ কার্যকর বলে ধরা হয়। কৈয়ের তেলে রান্না বা কৈ পাতুরি বাঙালি রান্নার পরিচিত পদ।

শিশু, মা আর বয়স্কদের পাতে


পরিবারের সবার পুষ্টির চাহিদা এক রকম নয়। বাড়ন্ত শিশুর দরকার হাড় গঠনের ক্যালসিয়াম, মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য ওমেগা-৩ আর রক্তের জন্য আয়রন। কাঁটা বেছে দেওয়া রুই-কাতলা, বেটে নেওয়া ছোট মাছ আর মাঝেমধ্যে ইলিশ এই তিন চাহিদাই মেটাতে পারে।

গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়ের শরীরে আয়রন ও ক্যালসিয়ামের চাহিদা বাড়ে; রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে পুঁটি, মলা, মাগুর বা শিংয়ের মতো মাছ কাজে আসে। বয়স্কদের হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে, তাই ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে রুই ও ছোট মাছ উপকারী; আর হালকা, হজমে সহায়ক জিওল মাছের ঝোল তাঁদের জন্য ভালো বিকল্প। যাঁদের কিডনি বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে, তাঁদের খাবারের তালিকা অবশ্য চিকিৎসকের পরামর্শে ঠিক করা উচিত।

থলে ভরার আগে কয়েকটি পরামর্শ


কোন মাছ কী দেয়, তা জানার পর প্রশ্ন আসে, তাহলে কোনটা কিনব? উত্তর হলো বৈচিত্র্য। একেক মাছ একেক পুষ্টি দেয় বলে সপ্তাহজুড়ে নানা মাছ খেলে সব ধরনের পুষ্টি মেলে। একদিন রুই বা কাতলা, একদিন ছোট মাছ, মৌসুমে ইলিশ, মাঝে মাঝে শিং-মাগুর, এভাবে ঘুরিয়ে খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে দুই দিন রুই বা কাতলা, দুই দিন পুঁটি বা মলার মতো ছোট মাছ, এক দিন তেলাপিয়া বা পাঙ্গাস, এক দিন শিং, মাগুর বা কৈ, আর মৌসুমে এক দিন ইলিশ রাখলে এই প্রতিবেদনে বলা প্রায় সব পুষ্টিই পাতে চলে আসে: আমিষ, ওমেগা-৩, ভিটামিন এ ও ডি, ক্যালসিয়াম আর আয়রন। বাজেট ও পছন্দ অনুযায়ী এই তালিকা বদলে নেওয়া যায়, মূল কথা হলো একই মাছ বারবার না খেয়ে ঘুরিয়ে খাওয়া।

  • ছোট মাছ কাঁটা ও মাথাসহ খান; ক্যালসিয়াম, আয়রন আর ভিটামিনের বড় অংশ সেখানেই।
  • ভাপা, ঝোল বা হালকা ভুনা রান্না ডুবো তেলে ভাজার চেয়ে স্বাস্থ্যকর।
  • টাটকা মাছ চেনার জন্য দেখুন উজ্জ্বল চোখ, লাল কানকো আর আঙুলে চাপ দিলে ফিরে আসা শক্ত মাংস।
  • শিশুর খাবারে কাঁটা বেছে মাছ দিন; ছোট মাছ বেটে বা ভর্তা করে খাওয়ানো যায়।
  • কোনো নির্দিষ্ট রোগ থাকলে কোন মাছ কতটা খাবেন, তা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের কাছ থেকে জেনে নিন।

কোথা থেকে মাছ কিনছেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। পরিচিত ও পরিচ্ছন্ন বাজার থেকে কেনা, কেনার পর দ্রুত পরিষ্কার করে রান্না বা ঠান্ডায় সংরক্ষণ করা, আর কাটা মাছ বেশিক্ষণ বাইরে ফেলে না রাখা, এই অভ্যাসগুলো মাছের পুষ্টি ও নিরাপত্তা দুটোই রক্ষা করে।

দামের কথাও ভাবতে হয়। ইলিশ বা বড় চিংড়ির দাম অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে থাকে। কিন্তু পুষ্টির হিসাবে দামি মাছই সবসময় সেরা নয়। পুঁটি, মলা বা অন্যান্য ছোট মাছ অনেক কম দামে ক্যালসিয়াম ও আয়রনের মতো পুষ্টি দেয়। তেলাপিয়া আর পাঙ্গাস কম খরচে আমিষের জোগান দেয়। ফলে সীমিত বাজেটেও পরিবারের পাতে পুষ্টিকর মাছ রাখা সম্ভব।

একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। কোনো একটি মাছ কোনো রোগের ওষুধ নয়। মাছ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ; শাকসবজি, ফল, ডাল আর পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে মিলেই এর পূর্ণ সুফল মেলে।

বাজার থেকে রান্নাঘর: পুষ্টি ধরে রাখার উপায়


ভালো মাছ কিনলেই কাজ শেষ নয়; ঘরে আনার পর কীভাবে রাখা হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে পুষ্টি আর নিরাপত্তা। মাছ কেনার পর যত দ্রুত সম্ভব আঁশ ছাড়িয়ে, পেটের ময়লা ফেলে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নেওয়া উচিত। সেদিনই রান্না না হলে ফ্রিজে বা ডিপ ফ্রিজে রাখা ভালো, আর একবার বরফ গলানো মাছ আবার জমিয়ে না রাখাই নিরাপদ।

কাটার সময় ছোট মাছের মাথা আর কাঁটা ফেলে দেওয়ার অভ্যাস অনেক ঘরে আছে, অথচ পুষ্টির বড় অংশ সেখানেই। বড় মাছের মাথা, কলিজা আর ডিমও পুষ্টিকর, তবে ডিম ও কলিজায় কোলেস্টেরল তুলনামূলক বেশি থাকে, তাই পরিমিত খাওয়াই ভালো। রান্নার সময় বেশি মসলা ও তেল না দিয়ে মাছের নিজের স্বাদ ফোটানোই স্বাস্থ্যকর রীতি।

রোজকার পাতে মাছ, রোজকার সুরক্ষা


মাছ বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ এবং শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় মাছ রাখলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। ইলিশের ওমেগা-৩, রুইয়ের ভিটামিন ডি, কাতলার ভিটামিন এ, পুঁটির ক্যালসিয়াম, মাগুর-শিংয়ের আয়রন, প্রতিটি মাছই তার নিজের মতো করে শরীরের একটা দিক আগলে রাখে।

তাই পরের বার বাজারে গিয়ে শুধু দাম আর স্বাদের কথা না ভেবে পুষ্টিগুণের কথাও মাথায় রাখা যেতে পারে। পুষ্টিগুণ অনুযায়ী মাছ বেছে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে মাছে-ভাতে বাঙালির পুরোনো পরিচয়টাই হয়ে উঠবে সুস্থ জীবনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী উপায়।

ছবি: কিশোরগঞ্জের মাছের বাজার, Rmrony / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

দৈনন্দিন

সম্পর্কিত খবর

ইসলাম

প্রবীণদের সম্মান ও যত্ন ঈমানি দায়িত্ব: কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা

সুরা আল-ইসরার ২৩ নম্বর আয়াতে বার্ধক্যে পৌঁছানো মা-বাবাকে ‘উহ্’ পর্যন্ত না বলার নির্দেশ এসেছে; প্রবীণদের খোঁজ নেওয়া, পাশে বসা আর পরামর্শ নেওয়াকে ঈমানি দায়িত্ব বলছে আওয়ার ইসলাম।

আওয়ার ইসলাম১ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মাশরুম ভাজতে গেলে জল বেরিয়ে রবারের মতো হয়ে যায়? পাঁচটি কৌশল

মাশরুম বেশি না ধোয়া, জল বেরোলে আঁচ বাড়ানো, জল শুকানোর পর মশলা আর একেবারে শেষে নুন; মাশরুম রান্নার পাঁচটি সহজ কৌশল।

এই সময়১ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ইসলাম

সুখী দাম্পত্যের জন্য কোরআন ও হাদিসের পাঁচ শিক্ষা

এক ঘরে থেকেও স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন; সুরা রুম, সুরা নিসা, সুরা বাকারা আর মহানবী (সা.)-এর হাদিস ধরে পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ় করার পাঁচটি উপায় তুলে ধরেছেন মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর।

প্রথম আলো১ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)