শহরের বেশির ভাগ বাড়ির ছাদ সারা বছর পড়ে থাকে ধূসর কংক্রিট হয়ে। কাপড় শুকানো, পানির ট্যাংক আর দুপুরের তপ্ত রোদ, এর বাইরে সেখানে তেমন কিছু ঘটে না। অথচ শীত এলে সেই একই ছাদ হলুদ, সাদা, লাল আর গোলাপি ফুলে ভরে উঠতে পারে, যদি সেখানে কয়েকটি টবে চন্দ্রমল্লিকা লাগানো থাকে। মিষ্টি ঘ্রাণ আর উজ্জ্বল রঙের জন্য পরিচিত এই ফুল সঠিক যত্ন আর একটু পরিকল্পনায় একটি সাধারণ ছাদকে নান্দনিক ও মনোমুগ্ধকর বাগানে বদলে দিতে পারে।
চন্দ্রমল্লিকা শীতের ফুল। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, এই গাছ তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়া আর রোদেলা জায়গা পছন্দ করে, আর বাংলাদেশে শীতকালই এর চাষের সবচেয়ে ভালো সময়। বাগানপ্রেমীদের কাছে এর জনপ্রিয়তার কারণ বহুমুখী: রঙের বৈচিত্র্য, দীর্ঘ সময় ধরে ফোটা, টবে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, আর অল্প যত্নে ভালো ফল দেওয়া। ছাদবাগান যাঁরা নতুন শুরু করছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি ভালো প্রথম পছন্দ হতে পারে।
ছাদবাগান কেন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে সবুজের জায়গা দ্রুত কমছে। একের পর এক ভবনের ভিড়ে মাটি খুঁজে পাওয়াই কঠিন। এ অবস্থায় ছাদ হয়ে উঠেছে শহরের মানুষের সবচেয়ে বড় খোলা জায়গা। গাছে ঢাকা ছাদ রোদের তাপ সরাসরি কংক্রিটে পড়তে দেয় না, তাই নিচের ঘরগুলো কিছুটা কম গরম থাকে। পাখি আর প্রজাপতি ফিরে আসে, আর পরিবারের সদস্যরা পান খোলা বাতাসে বসার একটি জায়গা।
সরকারও ছাদবাগানকে উৎসাহ দিচ্ছে। ২০২৩ সালের জুনে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ঘোষণা দেন, দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় ছাদবাগান থাকলে বাড়ির মালিকেরা হোল্ডিং করে ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন। উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল শহরের তাপমাত্রা কমানো আর দেশকে আরও সবুজ করা। তবে এই সুবিধার জন্য শুধু কয়েকটি টব রাখলেই চলবে না; বাগানটি নিয়মিত যত্নে থাকতে হবে, এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন জমে থাকা পানিতে মশা জন্মাতে না পারে। বিস্তারিত শর্ত জানতে নিজের সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার সঙ্গে যোগাযোগ করাই ভালো।
কেন চন্দ্রমল্লিকা বেছে নেবেন
ছাদবাগানের জন্য অনেক ফুলই আছে, তবু চন্দ্রমল্লিকার কয়েকটি গুণ একে আলাদা করে তোলে।
প্রথম গুণ উজ্জ্বল রং। হলুদ, সাদা, লাল, গোলাপি, নানা রঙের চন্দ্রমল্লিকা পাওয়া যায়। ফুলের আকারেও বৈচিত্র্য আছে: কোনোটি বোতামের মতো ছোট আর গোল, কোনোটির পাপড়ি লম্বা ও কোঁকড়ানো, কোনোটি বিশাল বলের মতো। কয়েকটি জাত একসঙ্গে লাগালেই ছাদ রঙিন হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় গুণ কম যত্ন। গাছটি তরতর করে বাড়ে এবং খুব বেশি পরিচর্যা ছাড়াই ভালো ফুল দেয়। নিয়মিত রোদ, মাপমতো পানি আর মাঝে মাঝে সার, মূলত এটুকুই তার চাওয়া।
তৃতীয় গুণ বাতাস সতেজ রাখা। ১৯৮৯ সালে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার একটি পরিচিত গবেষণায় বদ্ধ কক্ষে রাখা কয়েকটি গাছ বেনজিন ও ফরমালডিহাইডের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক শোষণ করতে পেরেছিল, আর সেই তালিকায় চন্দ্রমল্লিকা বা ফ্লোরিস্টস মাম ছিল অন্যতম কার্যকর। তবে সেই পরীক্ষা হয়েছিল ছোট, বন্ধ কক্ষে। পরের গবেষকেরা বলেছেন, সাধারণ ঘরবাড়িতে বাইরের বাতাস চলাচলই দূষণ কমানোর প্রধান উপায়, আর কয়েকটি টবের গাছ সেখানে বড় পার্থক্য গড়ে না। তাই চন্দ্রমল্লিকা ছাদের পরিবেশকে সবুজ ও মনোরম করে ঠিকই, কিন্তু একে বায়ু পরিশোধন যন্ত্রের বিকল্প ভাবা ঠিক হবে না।
চতুর্থ গুণ ঔষধি ব্যবহার। কিছু প্রজাতির চন্দ্রমল্লিকার আরামদায়ক ঘ্রাণের পাশাপাশি ঔষধি গুণ আছে বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে চীনে, শুকনো চন্দ্রমল্লিকা ফুল দিয়ে চা বানানোর রীতি বহু পুরোনো। তবে বাগানের গাছে রাসায়নিক দেওয়া হলে সেই ফুল খাওয়ার কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়, আর কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
গাছটিকে একটু চিনে নেওয়া
চন্দ্রমল্লিকার বৈজ্ঞানিক নাম ক্রিস্যানথিমাম মরিফোলিয়াম। গাছটি ঝোপালো, পাতা খাঁজকাটা ও সামান্য সুগন্ধি। এর একটি বিশেষ স্বভাব হলো, দিন ছোট হয়ে আসতে থাকলে এটি ফুল ফোটানোর প্রস্তুতি নেয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় একে ছোট দিনের উদ্ভিদ বলা হয়। এ কারণেই হেমন্তের শেষে আর শীতের শুরুতে, যখন রাত লম্বা হতে থাকে, তখন কুঁড়ি আসে, আর ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে গাছ ফুলে ভরে ওঠে। ছাদে রাতে জোরালো আলো জ্বালালে এই স্বাভাবিক চক্রে বিঘ্ন ঘটতে পারে, সে কথা মনে রাখা ভালো।
নামটির পেছনেও একটি ইতিহাস আছে। ইংরেজি নাম ক্রিস্যানথিমাম এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ থেকে, যার অর্থ সোনা ও ফুল, অর্থাৎ সোনালি ফুল। হাজার বছরেরও বেশি আগে চীনে এই ফুলের চাষ শুরু হয়, পরে তা জাপানে পৌঁছায়। জাপানে চন্দ্রমল্লিকা এতটাই সম্মানিত যে দেশটির রাজপরিবারের প্রতীকই একটি চন্দ্রমল্লিকা ফুল। বাংলায় আমরা একে চিনি চন্দ্রমল্লিকা নামে।
দেশে চাষের উপযোগী জাতও আছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি চন্দ্রমল্লিকা-১ ও বারি চন্দ্রমল্লিকা-২ নামে দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে। বাজারে ও নার্সারিতে আরও নানা স্থানীয় ও বিদেশি জাতের চারা পাওয়া যায়।
কখন শুরু করবেন: চন্দ্রমল্লিকার বছর
চন্দ্রমল্লিকা চাষে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী, জমি বা টবে চারা রোপণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে নভেম্বর। বেডে লাগালে জাতভেদে সারি থেকে সারি প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার আর গাছ থেকে গাছ প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার দূরত্ব রাখার কথা বলা হয়েছে।
নতুন চারা সাধারণত বীজ থেকে নয়, ডাল বা গোড়ার কুশি থেকে তৈরি হয়। এক বছর বয়সী সতেজ, সবল ডাল থেকে ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা অংশ তেরছা করে কেটে বেডে বা বালতিতে বসিয়ে দিলে তাতে শিকড় গজায়। আবার ফেব্রুয়ারির দিকে ফুল ফোটা শেষ হলে গাছগুলো মাটি থেকে ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রেখে কেটে দেওয়া হয়; কিছুদিন পর কাটা গোড়া থেকে নতুন কুশি বের হয়, যেগুলো আলাদা করে নতুন চারা হিসেবে লাগানো যায়। এভাবে একবার কয়েকটি ভালো গাছ জোগাড় করতে পারলে পরের বছরগুলোতে আর চারা কিনতে হয় না।
ফুলের মৌসুম শেষ হওয়ার পর গাছকে অবহেলা করলে পরের বছরের চারাও দুর্বল হয়। গ্রীষ্ম আর বর্ষার মাসগুলো মাতৃগাছ ও কুশিদের জন্য কঠিন সময়। চন্দ্রমল্লিকা যেহেতু জমা পানি সহ্য করতে পারে না, বর্ষায় টবের মাটি যেন কাদা হয়ে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়; প্রয়োজনে টব কিছুটা উঁচুতে তুলে রাখা বা টানা বৃষ্টির দিনে ছাউনির নিচে সরিয়ে নেওয়া যায়। এ সময় গাছ বাঁচিয়ে রাখাই মূল লক্ষ্য, ফুল নয়। শরতের শেষে যখন নতুন চারা লাগানোর সময় আসে, তখন এই যত্নের ফল পাওয়া যায় সবল, রোগমুক্ত চারায়।
ছাদবাগানির জন্য পুরো বছরটিকে তাই একটি সরল সময়সূচিতে সাজানো যায়:
- অক্টোবর থেকে নভেম্বর: টবে চারা রোপণ।
- রোপণের মাসখানেক পর: গাছের আগা কাটা, যাতে গাছ ঝোপালো হয়।
- নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বর: কুঁড়ি আসা, প্রয়োজনে কুঁড়ি ছাঁটাই ও কাঠির ঠেকনা।
- ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি: পূর্ণ ফোটার মৌসুম।
- ফেব্রুয়ারি: ফুল শেষে গাছ ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রেখে কেটে দেওয়া।
- এরপর: গোড়া থেকে বের হওয়া কুশি ও ডালের কাটিং থেকে পরের মৌসুমের চারা তৈরি।
এই সময়সূচি মেনে চললে প্রতি শীতে নতুন করে শুরু করতে হয় না; বাগান একটি চক্রের মতো নিজেই চলতে থাকে।
চাষের সাতটি ধাপ
চন্দ্রমল্লিকা চাষের পুরো প্রক্রিয়াকে সাতটি ধাপে ভাগ করা যায়। প্রতিটি ধাপ ছোট, কিন্তু কোনোটি বাদ দিলে ফুলের সংখ্যা ও মান দুটোই কমে যায়।
প্রথম ধাপ: সঠিক পাত্র বাছাই। মাটি ধরে রাখার জন্য মাটির বা সিরামিকের টব ব্যবহার করুন। মাটির টব বাতাস চলাচল করতে দেয় এবং রোদে কম গরম হয়। যে টবই হোক, তলায় পানি বের হওয়ার ছিদ্র থাকা আবশ্যক; না থাকলে গোড়ায় পানি জমে শিকড় পচে যায়। একটি গাছের জন্য মাঝারি আকারের টবই যথেষ্ট, খুব ছোট টবে গাছ দ্রুত শুকিয়ে যায়।
ছাদে অনেক টব রাখার পরিকল্পনা থাকলে ওজনের কথাও ভাবুন। মাটির টব ভারী, প্লাস্টিকের টব হালকা ও দামে কম, তবে কড়া রোদে প্লাস্টিক দ্রুত গরম হয় এবং কয়েক বছরে ভঙ্গুর হয়ে যায়। অনেক ছাদবাগানি তাই বড় গাছের জন্য মাটির টব আর ছোট চারার জন্য প্লাস্টিকের টব মিলিয়ে ব্যবহার করেন।
দ্বিতীয় ধাপ: মাটি প্রস্তুত। দোআঁশ মাটির সঙ্গে পচা গোবর বা অন্য জৈব সার মিশিয়ে নিন। মাটি এমন হওয়া চাই যা কিছুটা আর্দ্রতা ধরে রাখে, আবার ভেতরে বাতাসও চলাচল করতে পারে। ছাদের ওপর ওজনের কথাও মাথায় রাখা ভালো, তাই মাটি অতিরিক্ত ভারী বা এঁটেল না হওয়াই উত্তম।
তৃতীয় ধাপ: চারা বা বীজ লাগানো। ভালো মানের চারা বা বীজ সংগ্রহ করুন। নির্ভরযোগ্য নার্সারি থেকে সুস্থ, সবল চারা কেনাই সবচেয়ে নিরাপদ। টবে বা বেডে গাছগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব রাখুন, যাতে প্রতিটি গাছ আলো-বাতাস পায় এবং রোগ এক গাছ থেকে আরেক গাছে দ্রুত না ছড়ায়।
চতুর্থ ধাপ: মাপমতো সেচ। চন্দ্রমল্লিকা অতিরিক্ত পানি পছন্দ করে না। মাটির ওপরের স্তর আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে শুকনো মনে হলে তবেই হালকা পানি দিন। ছাদে রোদ ও বাতাস বেশি বলে গ্রীষ্মে টব দ্রুত শুকায়, কিন্তু শীতে পানির চাহিদা কমে যায়। টবের নিচের থালায় পানি জমে থাকতে দেবেন না; এতে শিকড় পচে, আর মশাও জন্মায়।
পঞ্চম ধাপ: সার প্রয়োগ। মাসে একবার তরল জৈব সার দিন। গাছে কুঁড়ি আসা আর ফুল ফোটার সময় পটাশ ও ফসফেট জাতীয় সার কিছুটা বাড়তি দিলে ফুলের আকার ও সংখ্যা দুটোই ভালো হয়। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন দিলে পাতা বেশি হয়, ফুল কম।
ষষ্ঠ ধাপ: রোদের ব্যবস্থা। গাছকে দিনে অন্তত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সরাসরি সূর্যের আলোতে রাখুন। ছাদের যে অংশে পানির ট্যাংক বা পাশের উঁচু ভবনের ছায়া পড়ে, সেখানে চন্দ্রমল্লিকা ভালো ফুল দেয় না।
সপ্তম ধাপ: সময়মতো ছাঁটাই। শুকিয়ে যাওয়া পাতা ও ডাল নিয়মিত ছেঁটে ফেলুন। নতুন ডালপালা গজানোর জন্য প্রতি দুই মাসে একবার গাছ ছাঁটাই করুন। ঝরে পড়া পাতা আর পুরোনো ফুল টবে পড়ে থাকলে ছত্রাকের আক্রমণ বাড়ে, তাই সেগুলো সরিয়ে ফেলাও যত্নের অংশ।
বেশি ফুল আর বড় ফুলের কৌশল
অভিজ্ঞ বাগানিরা চন্দ্রমল্লিকায় দুটি বিশেষ কৌশল ব্যবহার করেন। প্রথমটি আগা কাটা বা ইংরেজিতে পিঞ্চিং। চারা লাগানোর মাসখানেক পর গাছের একেবারে মাথার কচি অংশটি আঙুলে টিপে ভেঙে দেওয়া হয়। তাতে গাছ ওপরের দিকে লম্বা না হয়ে পাশে একাধিক ডাল ছাড়ে, ঝোপালো হয়, আর প্রতিটি ডালে ফুল আসে বলে মোট ফুলের সংখ্যা বাড়ে।
দ্বিতীয় কৌশলটি কুঁড়ি ছাঁটাই বা ডিসবাডিং। যাঁরা বড় আকারের ফুল চান, তাঁরা একটি ডালের মাথার প্রধান কুঁড়িটি রেখে পাশের ছোট কুঁড়িগুলো তুলে ফেলেন। তাতে গাছের সব শক্তি একটি ফুলে যায়, আর সেটি অনেক বড় হয়। যাঁরা ছোট ছোট অনেক ফুল পছন্দ করেন, তাঁরা এই কাজ না করলেও চলে।
বড় ফুলের জাতের ডাল ফুলের ভারে নুয়ে পড়তে পারে। ছাদে বাতাসও বেশি। তাই গাছের পাশে একটি শক্ত কাঠি পুঁতে ডালগুলো আলগা করে বেঁধে দিলে গাছ সোজা থাকে এবং ফুল ভাঙে না।
পোকা ও রোগে নজর
চন্দ্রমল্লিকার সাধারণ শত্রুদের মধ্যে আছে জাবপোকা, যা কচি ডগা ও কুঁড়ির রস শুষে খায়, আর পাতায় সাদা গুঁড়ার মতো ছত্রাকের আবরণ তৈরি করা পাউডারি মিলডিউ রোগ। নিয়মিত পাতার দুই পিঠ দেখে নেওয়ার অভ্যাস করলে সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়ে। আক্রান্ত পাতা বা ডাল কেটে সরিয়ে ফেলা, গাছের মাঝে বাতাস চলাচলের জায়গা রাখা আর পাতা না ভিজিয়ে গোড়ায় পানি দেওয়া, এসব সাধারণ অভ্যাসেই অনেক রোগ দূরে থাকে। আক্রমণ বেশি হলে কোন ওষুধ কতটা দিতে হবে, তা জানতে স্থানীয় কৃষি অফিস বা কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
নতুন বাগানিদের সাধারণ ভুল
যাঁরা প্রথমবার চন্দ্রমল্লিকা লাগাচ্ছেন, তাঁদের কয়েকটি ভুল প্রায়ই হয়। আগে থেকে জানা থাকলে এগুলো এড়ানো যায়:
- ভালোবাসার আতিশয্যে রোজ পানি দেওয়া, যাতে গোড়া পচে যায়।
- ছায়ায় টব রাখা, ফলে গাছ লম্বা ও দুর্বল হয়, ফুল আসে কম।
- তলায় ছিদ্র নেই এমন সুন্দর পাত্রে গাছ লাগানো।
- পাতা বাড়ানোর আশায় বেশি নাইট্রোজেন সার দেওয়া।
- আগা কাটতে ভুলে যাওয়া, ফলে গাছ একটি লম্বা কাণ্ডে সীমিত থাকে।
- কুঁড়ির মৌসুমে সারা রাত গাছের ওপর জোরালো বাতি জ্বালিয়ে রাখা।
নার্সারি থেকে চারা কেনার সময়ও কয়েকটি বিষয় দেখে নিন। পাতার উল্টো পিঠে পোকা বা সাদা দাগ আছে কি না, কাণ্ড শক্ত কি না, আর টবের তলা দিয়ে সাদা সুস্থ শিকড় দেখা যায় কি না। হলদে, ঝিমিয়ে পড়া বা অতিরিক্ত লম্বা চারা এড়িয়ে চলাই ভালো। শুরুতে অল্প কয়েকটি গাছ নিয়ে যত্নের অভ্যাস গড়ে তুললে পরের বছর বাগান বড় করা অনেক বেশি নিশ্চিন্তের কাজ হয়।
ছাদ সাজানোর কৌশল
গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠলে এবার আসে সাজানোর পালা। টবগুলো কোথায়, কীভাবে রাখা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে পুরো ছাদের চেহারা।
রঙের নকশা তৈরি করুন। বিভিন্ন রঙের চন্দ্রমল্লিকা দিয়ে ছাদের এক কোণে একটি সুন্দর নকশা বানাতে পারেন। যেমন মাঝখানে হলুদ, চারপাশে সাদা, কিংবা ঢেউয়ের মতো পরপর লাল আর গোলাপি। কাছাকাছি রঙের ফুল পাশাপাশি রাখলে চোখে শান্ত লাগে, বিপরীত রং পাশাপাশি রাখলে নকশা আরও চোখে পড়ে।
উচ্চতা অনুযায়ী সাজান। টব ও গাছের উচ্চতা বুঝে সারি করুন: লম্বা গাছ পেছনে, মাঝারি মাঝখানে, আর ছোট ঝোপালো গাছ সামনে। এতে সব ফুল একসঙ্গে দেখা যায়, কোনোটি অন্যটির আড়ালে পড়ে না। ইট বা কাঠের তাক ব্যবহার করে ধাপে ধাপে টব রাখলেও একই ফল পাওয়া যায়।
বসার জায়গার চারপাশে রাখুন। ছাদে কয়েকটি চেয়ার বা একটি মাদুর বিছিয়ে বসার জায়গা তৈরি করে তার চারপাশে চন্দ্রমল্লিকার টব রাখুন। শীতের বিকেলে রোদে বসে চা খাওয়ার জায়গাটি তখন ফুলে ঘেরা একটি ছোট উঠানে পরিণত হয়।
আলো দিয়ে সাজান। সন্ধ্যায় ছাদের সৌন্দর্য বাড়াতে এলইডি বাতি ব্যবহার করতে পারেন। কম বিদ্যুৎ খরচের ছোট বাতির মালা টবের পাশে বা রেলিং ধরে লাগালে রাতেও ফুলগুলো দেখা যায়। তবে আগেই বলা হয়েছে, চন্দ্রমল্লিকা দিনের দৈর্ঘ্যের প্রতি সংবেদনশীল; কুঁড়ি আসার মৌসুমে সারা রাত গাছের ওপর জোরালো আলো ফেলে রাখলে ফুল আসতে দেরি হতে পারে। তাই বাতি গাছের দিকে না ফেলে পথ বা বসার জায়গার দিকে রাখা এবং রাতে নির্দিষ্ট সময়ে নিভিয়ে দেওয়াই ভালো।
ফুলদানিতেও চন্দ্রমল্লিকা
চন্দ্রমল্লিকা শুধু টবে রেখে দেখার ফুল নয়। কাটা ফুল হিসেবেও এর কদর আছে, কারণ ফুলদানিতে এটি অনেক দিন তাজা থাকে। ফুল তোলার ভালো সময় সকাল বা বিকেল, যখন রোদের তেজ কম। বাইরের পাপড়িগুলো পুরোপুরি খুলে গেলে লম্বা বোঁটাসহ ধারালো কাঁচি দিয়ে কেটে নিন, আর সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার পানিতে রাখুন। ফুলদানির পানি প্রতি দুই এক দিনে বদলে দিলে ফুল আরও বেশি দিন টেকে। এভাবে ছাদের বাগান থেকে ঘরের টেবিলেও শীতের রং পৌঁছে যায়।
ছাদে শুধু চন্দ্রমল্লিকা না রেখে শীতের অন্য ফুলের সঙ্গেও মিলিয়ে লাগানো যায়। গাঁদা, ডালিয়া, গোলাপ বা পিটুনিয়ার মতো শীতের ফুল চন্দ্রমল্লিকার সঙ্গে ভালো মানায়, আর বাগানে রং ও আকারের বৈচিত্র্য বাড়ায়। মাঝে মাঝে পুদিনা, ধনেপাতা বা লেটুসের মতো শাকের টব রাখলে বাগান শুধু দেখার জিনিস না থেকে রান্নাঘরেরও কাজে আসে।
ছাদের নিরাপত্তা আগে
ছাদবাগান শুরু করার আগে ভবনের দিকটাও ভাবতে হবে। অনেকগুলো মাটিভর্তি টব আর পানির ওজন ছাদের ওপর চাপ তৈরি করে, তাই বড় বাগান করার আগে প্রয়োজনে একজন প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া ভালো। টব সরাসরি ছাদের মেঝেতে না রেখে ইট বা স্ট্যান্ডের ওপর রাখলে নিচে পানি জমে না এবং ছাদের আস্তরণ ভালো থাকে। ছাদের পানি নিষ্কাশনের নালা যেন ঝরা পাতা বা মাটিতে বন্ধ না হয়, সেদিকে নিয়মিত নজর রাখুন। আর বর্ষায় টবের থালা, ভাঙা পাত্র বা যেকোনো জায়গায় পানি জমে থাকলে তা ফেলে দিন, কারণ এডিস মশা এমন পরিষ্কার জমা পানিতেই ডিম পাড়ে।
ফুল থেকে মনের প্রশান্তি
চন্দ্রমল্লিকা দিয়ে ছাদ সাজানো শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, মনের প্রশান্তি ও স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। প্রতিদিন সকালে বা বিকেলে কিছুক্ষণ গাছের যত্ন নেওয়া, পানি দেওয়া, শুকনো পাতা ছাঁটা, নতুন কুঁড়ি খোঁজা, এসব কাজ ব্যস্ত শহুরে জীবনে একটু থামার সুযোগ দেয়। পরিবারের শিশুরাও এতে গাছ চেনে, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।
ছাদবাগান প্রতিবেশীদের মধ্যেও সম্পর্ক গড়ে দেয়। নিজের গাছ থেকে তৈরি কুশি বা কাটিং পাশের বাড়ির কাউকে দিলে সেখানেও একটি নতুন বাগান শুরু হতে পারে। এভাবে একটি ছাদের চন্দ্রমল্লিকা ধীরে ধীরে পুরো মহল্লার ছাদে ছড়িয়ে পড়তে পারে, আর ধূসর শহরে যোগ হতে পারে আরও কিছু রং।
অক্টোবরে কয়েকটি চারা লাগালে ডিসেম্বরের মধ্যেই ছাদ রঙিন হয়ে উঠতে পারে। ফুল শেষ হলে গাছ কেটে রাখা কুশি থেকে পরের বছরের চারা তৈরি হয়, ফলে একবারের সামান্য খরচে বছরের পর বছর বাগান চলতে থাকে। একটু যত্ন আর একটু পরিকল্পনা থাকলেই ধূসর কংক্রিটের ছাদ হয়ে উঠতে পারে সবুজ আর রঙিন এক আশ্রয়।
ছবি: চন্দ্রমল্লিকা (Chrysanthemum × morifolium), Shuvaev / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)



মন্তব্য
(০)