বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন বালুময় সৈকত কক্সবাজার দ্রুত ভাঙছে, আর তা ঠেকানোর প্রাকৃতিক শক্তি লুকিয়ে আছে বালিয়াড়ি বা স্থানীয় ভাষায় 'ডেইল'-এ। প্রথম আলোয় প্রকাশিত কলামে এমন যুক্তি দিয়েছেন লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী পাভেল পার্থ। মতামতটি লেখকের নিজস্ব।
জার্নাল অব সি রিসার্চে প্রকাশিত রশিদ ও অন্যদের (২০২৫) গবেষণার বরাতে তিনি লিখেছেন, ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কক্সবাজারের ১ হাজার ৮৫ হেক্টর ভূমি সাগরে হারিয়ে গেছে। আগস্টের শেষ সপ্তাহে নাজিরারটেক থেকে ইনানী পর্যন্ত ঘুরে তিনি ২০টির বেশি ভাঙন এলাকা দেখেছেন: জিও ব্যাগ ছেঁড়া, বালিয়াড়ি অরক্ষিত, গাছের আচ্ছাদন নেই। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, দূষণ, সৈকত দখল, পাহাড় কাটা আর এলোপাতাড়ি পর্যটন অবকাঠামোকে তিনি দায়ী করেছেন।
সুগন্ধা থেকে কলাতলী পর্যন্ত বালিয়াড়ি নষ্ট করে ১ দশমিক ২ কিলোমিটার চার লেনের সড়ক ও কংক্রিটের 'শহর রক্ষা বাঁধ' নির্মাণ প্রকল্পের সমালোচনা করেছেন লেখক; জাইকার অর্থায়নে ৬৩ দশমিক ৫০ কোটি টাকার এ প্রকল্প ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছেন। কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের ১০ হাজার ৪৬৫ হেক্টর ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষিত হলেও অধিকাংশ বালিয়াড়ি আজ বিক্ষত।
রাখাইনরা উপকূলকে সমুদ্র থেকে পাহাড় পর্যন্ত ছয় স্তরে ভাগ করেন: সমুদ্র, সৈকত, বালিয়াড়ি, নিচু জমি, উঁচু জমি ও পাহাড়। প্রবীণদের স্মৃতিতে কেবল নিচু জমিতে চাষ আর উঁচু জমিতে বসতি হতো; বালিয়াড়ি থেকে মাছ, ভেষজ, বুনো খাবার ও লাকড়ি সংগ্রহ করা হতো মাত্র। একসময় এসব জমিতে লম্বরু, হেমাতা, কদমণি, বিনি ধানের মতো স্থানীয় জাতের ধান চাষ হতো। ২০-৩০ ফুট উঁচু ডেইলের নিচে থাকে মিঠাপানির আধার।
বালিয়াড়িতে সাগরলতা, মুথাঘাস, কেয়া, নিশিন্দার মতো লতাগুল্ম জন্মাত, যাদের শিকড় বালু আটকে রাখে; এগুলো বিপন্ন জলপাই কচ্ছপ ও লাল কাঁকড়ারও বিচরণভূমি। ১৯৭২-৭৩ সালে লাগানো ঝাউ কক্সবাজারের স্থানীয় প্রজাতি নয়। লেখক কোস্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং জার্নালসহ একাধিক গবেষণা উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন, উদ্ভিদ-আচ্ছাদিত বালিয়াড়ি উপকূল সুরক্ষার প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান।
তাঁর প্রস্তাব: বালিয়াড়িকে আইনি স্বীকৃতি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জীবন্ত বালিয়াড়িতে স্থায়ী অবকাঠামো নিষিদ্ধ করা, ক্ষতিগ্রস্ত বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধারে 'বালিয়াড়ি বিমা', আর বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত রক্ষায় বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল আদায়ে সক্রিয় জলবায়ু কূটনীতি। লোকায়ত জ্ঞানকে উন্নয়নের মূলধারায় আনলে ভাঙন এত তীব্র হতো না বলে তাঁর মত।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)