২০২০ সালের ৩১ মার্চ, দেশের আমবাগানে যখন মুকুল থেকে গুটি আসছিল, তখন অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪ আমের মুকুল ও গুটি ঝরে পড়ার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে একটি পরামর্শ প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মোটামুটি মার্চ মাসে আমগাছে মুকুল আসে, প্রতিটি মুকুলে থাকে হাজার হাজার ফুল এবং সেখান থেকেই আমের গুটি জন্ম নেয়। কিন্তু গুটি আসার পর নানা কারণে তা ঝরে যায়। ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ের কৃষি সম্প্রসারণ প্রকাশনা মনে করিয়ে দেয়, মুকুলের বেশির ভাগ ফুলই পুরুষ ফুল, যা থেকে ফল হয় না; তাই যে কয়টি ফুলে গুটি আসে, সেগুলো রক্ষা করার ওপরই ফলন নির্ভর করে।
মুকুল ও গুটি ঝরে পড়ার চার কারণ
জাগো নিউজ ২৪ মুকুল ঝরার চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছিল:
- অতিরিক্ত কুয়াশা, বৃষ্টি, ঝড় ও শিলাবৃষ্টি
- মাটিতে রসের অভাব
- হপার পোকার আক্রমণ
- মুকুলে অ্যানথ্রাকনোজ রোগ
ভারতের ন্যাশনাল হর্টিকালচার মিশনের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা অনুযায়ী আমের হপার মূলত তিন প্রজাতির পোকা: Idioscopus clypealis, Idioscopus nitidulus ও Amritodus atkinsoni। এদের বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক পোকা গাছের কচি অংশের রস চুষে খায়, বিশেষ করে মুকুল নষ্ট করে এবং গুটি ঝরিয়ে দেয়। পোকাগুলো মিষ্টি আঠালো রস নিঃসরণ করে, যার ওপর শুটি মোল্ড বা কালো ছত্রাক জন্মায়।

অ্যানথ্রাকনোজ রোগের জন্য দায়ী Colletotrichum gloeosporioides নামের ছত্রাক। ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ের কলেজ অব ট্রপিক্যাল এগ্রিকালচার অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্সেসের ২০০৮ সালের প্রকাশনায় একে বিশ্বজুড়ে আমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিকর রোগ বলা হয়েছে। মুকুলে প্রথমে ছোট কালো বা গাঢ় বাদামি দাগ পড়ে, দাগগুলো বড় হয়ে মিশে যায় এবং ফল ধরার আগেই ফুল মরে যায়। ভেজা, আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় রোগটি বাড়ে; বৃষ্টি বা সেচের পানির ছিটায় এর জীবাণু ছড়ায়, আর আক্রান্ত ডালের আগা ও পুরোনো পাতায় এক মৌসুম থেকে আরেক মৌসুম পর্যন্ত টিকে থাকে।

বাগান পরিচর্যায় যা করতে বলা হয়েছিল
মুকুল ও গুটি ঝরা ঠেকাতে প্রতিবেদনে যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল:
- আমবাগান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, আগাছামুক্ত ও খোলামেলা রাখা
- মরা ডালপালা ছেঁটে ফেলা এবং রোগাক্রান্ত ডাল ও পাতা পুড়িয়ে ফেলা
- গাছের নিচ থেকে ঝরা পাতা কুড়িয়ে পুড়িয়ে ফেলা
- এ সময় গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত পানি দেওয়া
- ছত্রাকের আক্রমণ ঠেকাতে গুটিতে সালফারজাতীয় বালাইনাশক স্প্রে করা
- আম মার্বেলের মতো হলে প্রতি লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ইউরিয়া মিশিয়ে স্প্রে করা
অন্য সূত্রগুলোও একই দিকে ইঙ্গিত করে। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা প্রতি বছর গাছ ছাঁটাই এবং মাটিতে পড়ে থাকা গাছের অবশিষ্ট সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেয়, কারণ জীবাণু সেখানেই টিকে থাকে। ন্যাশনাল হর্টিকালচার মিশন হপার দমনে ঘন করে গাছ না লাগানো এবং ভিড় করে থাকা ডাল ছেঁটে দেওয়ার কথা বলে। বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বামিস) জানায়, গুটি মটরদানার আকার পেলে বেসিন পদ্ধতিতে আবার সেচ দিতে হয়।
কখন স্প্রে করতে হয়, কখন নয়
জাগো নিউজ ২৪ লিখেছিল, হপার দমনের স্প্রে সাধারণত মুকুল আসার আগে এবং গুটি মটরদানার মতো হলে করতে হয়। বামিসের আম চাষ নির্দেশিকায় হপারের জন্য সাইপারমেথ্রিনজাতীয় কীটনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে প্রথমবার মুকুল ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার লম্বা হলে এবং দ্বিতীয়বার গুটি মটরদানার মতো হলে পুরো গাছে স্প্রে করতে বলা হয়েছে। অ্যানথ্রাকনোজের জন্য একই নির্দেশিকা ম্যানকোজেবজাতীয় ছত্রাকনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম হারে দেওয়ার কথা বলে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষিকথায় ২০১৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের একজন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা লিখেছিলেন, হপার ভালোভাবে দমন করতে পাতার সঙ্গে গাছের গুঁড়িতেও স্প্রে করা দরকার, আর আবহাওয়া রোগের অনুকূল হলে লক্ষণ দেখা না দিলেও প্রতিষেধক হিসেবে ছত্রাকনাশক দিতে হয়।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে জরুরি সতর্কতা ছিল ফুল ফোটার সময় নিয়ে। মুকুল ফোটার পর স্প্রে করার দরকার নেই, কারণ তখন পরাগায়নের জন্য অনেক উপকারী পোকা আসে; আর গাছে ৫০ শতাংশ ফল ধরার সময় কোনো ধরনের স্প্রে না করতে বলা হয়েছিল। ন্যাশনাল হর্টিকালচার মিশনের নির্দেশিকাও ফুল ফোটা ও পরাগায়নের সময় কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে এড়াতে এবং পরাগায়নকারী পোকা বাড়াতে বাগানে মৌমাছির বাক্স রাখার পরামর্শ দেয়।

ছবি: Kayser Ahmad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষিকথা), বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বামিস), ভারতের ন্যাশনাল হর্টিকালচার মিশন, ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই কলেজ অব ট্রপিক্যাল এগ্রিকালচার অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্সেস





মন্তব্য
(০)