বছরের বেশির ভাগ সময় পানিতে ডুবে থাকে জমি, মাটি নেই। সেই পানির ওপরই কচুরিপানা, শ্যাওলা আর জলজ উদ্ভিদ দিয়ে ভাসমান ক্ষেত বানিয়ে সবজি ফলাচ্ছেন বরিশালের বানারীপাড়া ও আগৈলঝাড়া উপজেলার কয়েকটি গ্রামের কৃষক। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি প্রায় দুইশো বছরের ঐতিহ্য; পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা পদ্ধতিতেই এখনো চাষ চলছে।
উমারের পাড় গ্রামের কৃষক সাইফুল হাওলাদার জানান, কচুরিপানা, শ্যাওলা ও দুলালীলতা স্তরে স্তরে সাজিয়ে প্রায় দুই ফুট পুরু ভাসমান ধাপ বা বীজতলা বানানো হয়। একেকটি ধাপ ৫০ থেকে ৬০ মিটার লম্বা, প্রায় দেড় মিটার চওড়া; তৈরিতে খরচ প্রায় ১০ হাজার টাকা। ধাপে সরাসরি বীজ বোনা যায় না, তাই ছোট কচুরিপানা, দুলালীলতা ও নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া দিয়ে ‘দৌল্লা’ নামের ছোট আধার বানিয়ে তাতে অঙ্কুরিত বীজ পোঁতা হয়। দৌল্লা বানানোর কাজটি মূলত নারীরা করেন।
তিন থেকে সাত দিন পর দৌল্লাগুলো সারি করে ধাপে বসানো হয়, আর পাঁচ-ছয় দিন পরপর ধাপের নিচের কচুরিপানার শিকড় ও শ্যাওলা তুলে গোড়ায় দেওয়া হয়। ২০ থেকে ২২ দিনে অঙ্কুরিত বীজ পূর্ণাঙ্গ চারা হয়ে ওঠে। পানি থাকলে একই ধাপে কয়েকবার চাষ করা যায়; নতুন করে জলজ উদ্ভিদ যোগ করলে ধাপ আবার ব্যবহারযোগ্য হয়, তবে পানি শুকালে তা আর কাজে আসে না।
ধাপে বেগুন, পেঁপে, লাউ, শিম, কুমড়া, টমেটো, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, কাঁচা ও বোম্বাই মরিচ, করলা, শসা ও বরবটিসহ নানা সবজি এবং চারা হয়। এসব যায় বরিশাল বিভাগের জেলাগুলো ছাড়াও পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট ও মাদারীপুরে। ধাপের উপকরণ জোগাতে বিশারকান্দির খালে প্রতিদিন ভোরে জলজ উদ্ভিদের একটি ভাসমান হাটও বসে। কৃষকেরা বলছেন, আশাতীত লাভ না হলেও ডুবে থাকা জমি থেকে যে আয় হয়, তাতে সংসার চলে।
বানারীপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসনাইন জানান, উপজেলায় প্রায় ২০০ হেক্টরে ভাসমান চাষ হচ্ছে। আগৈলঝাড়ার কৃষি কর্মকর্তা সুনীতি কুমার সাহা জানান, তাঁর উপজেলাতেও প্রায় ২০০ হেক্টর ভাসমান বেডে চাষ হচ্ছে, যুক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবার; আগে বোরো কাটার পর বর্ষায় যে জমি পতিত থাকত, এখন সেখান থেকেই আয় হচ্ছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের কাছ থেকে তাঁরা তেমন সহায়তা পান না।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বরিশালের পাশাপাশি পিরোজপুরেও এমন চাষ হচ্ছে এবং জলাবদ্ধ অন্য এলাকায়ও পদ্ধতিটি ছড়াচ্ছে; কৃষি বিভাগ সম্প্রসারণে উৎসাহ দিচ্ছে।
প্রতিবেদনটি বাংলা ট্রিবিউনের বরিশাল প্রতিনিধির প্রতিবেদন অবলম্বনে।
ছবি: Azimronnie / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন





মন্তব্য
(০)