সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা৩০°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৭ কিমি/ঘ

জমি ও কৃষক ছাড়াই কৃষিতে বিপ্লব: জাপানের উদ্ভাবনী প্রযুক্তির পথচলা

কৃষকের গড় বয়স প্রায় সত্তর, কৃষিজমি ছয় দশকে কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এই চাপে জাপান ভরসা রাখছে ভার্টিক্যাল ফার্ম, রোবট, ড্রোন, মাটিবিহীন চাষ আর স্বয়ংক্রিয় গ্রিনহাউসে। বিশ্বের জন্য এর বার্তা কী, আর বাংলাদেশ এখান থেকে কী নিতে পারে।

জমি ও কৃষক ছাড়াই কৃষিতে বিপ্লব: জাপানের উদ্ভাবনী প্রযুক্তির পথচলা
এগ্রোটেক

কিয়োটোর অদূরে কেইহান্না এলাকায় একটি কারখানার ভেতরে সারি সারি তাক, তাকের ওপর তাক। প্রতিটি তাকে সবুজ লেটুস বেড়ে উঠছে, কিন্তু কোথাও এক মুঠো মাটি নেই, মাথার ওপর আকাশও নেই। আলো আসছে বিশেষ ধরনের এলইডি বাতি থেকে, পানি ঘুরছে পাইপের ভেতর দিয়ে, আর চারা এক তাক থেকে আরেক তাকে সরিয়ে নিচ্ছে যন্ত্র। জাপানি প্রতিষ্ঠান স্প্রেড পরিচালিত এই টেকনো ফার্ম কেইহান্না থেকে প্রতিদিন প্রায় ত্রিশ হাজার লেটুস উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। জমি আর কৃষকের ওপর ভর না করে খাদ্য উৎপাদনের যে পথে জাপান হাঁটছে, এই কারখানা তার একটি জানালা মাত্র। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি হিসেবে জাপান কৃষিকাজের প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে, আর এই পরিবর্তন শুধু ফলন বাড়ানোর বিষয় নয়, বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নেও তা নতুন ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে।

কেন জাপানকে এই পথে হাঁটতে হলো


জাপানের এই যাত্রা শখের বশে শুরু হয়নি, শুরু হয়েছে প্রয়োজনের চাপে। দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব তুলে ধরে জাপানের সংবাদমাধ্যম নিপ্পন ডটকম জানিয়েছে, ২০০০ সালে দেশটিতে মূল পেশা হিসেবে কৃষিকাজে যুক্ত মানুষ ছিলেন প্রায় ২৪ লাখ। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ১১ লাখে। অর্থাৎ দুই দশকের কিছু বেশি সময়ে কৃষকের সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে। যাঁরা এখনো মাঠে আছেন, তাঁদের গড় বয়স ২০২৪ সালে ছিল ৬৯ দশমিক ২ বছর, আর তাঁদের প্রায় ৭২ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের বেশি।

জমির হিসাবও একই দিকে ইঙ্গিত করে। একই সূত্র অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে জাপানে কৃষিজমি ছিল প্রায় ৬১ লাখ হেক্টর, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ লাখ হেক্টরে, অর্থাৎ ছয় দশকে প্রায় ৩০ শতাংশ জমি চাষের বাইরে চলে গেছে। ধানের জমির চিত্রও একই রকম: ১৯৯৫ সালে যেখানে জাপানে ধানখেত ছিল প্রায় ২১ লাখ হেক্টর, ২০২৫ সালে তা প্রায় ১৫ লাখ হেক্টরে নামবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। শহর বেড়েছে, পাহাড়ি গ্রাম ফাঁকা হয়েছে, আর অনেক জমি চাষ করার মতো মানুষই আর নেই। এর পাশাপাশি দেশটি নিজের খাদ্যের বড় অংশ আমদানি করে। জাপান টাইমসের খবর অনুযায়ী, ক্যালরির হিসাবে জাপানের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার হার ২০২৩ অর্থবছরে ছিল মাত্র ৩৮ শতাংশ।

বয়স্ক কৃষক, কমতে থাকা জমি আর আমদানিনির্ভর খাদ্য, এই তিন চাপ একসঙ্গে মিলে জাপানকে একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে: মানুষ কমে গেলে খাবার ফলাবে কে? দেশটির উত্তর হলো যন্ত্র, তথ্য আর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ। ২০২৪ সালে জাপান স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে আলাদা একটি আইনও পাস করেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) জানিয়েছে, এই আইনের লক্ষ্য শ্রমিক সংকট মোকাবিলা, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো; কৃষক, সমবায় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে আর্থিক সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে।

বহুতল ভবনে খেত: ভার্টিক্যাল ফার্মিং


জাপানের নতুন কৃষির সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো রূপ হলো ভার্টিক্যাল ফার্মিং, বাংলায় যাকে বলা যায় উল্লম্ব বা স্তরে স্তরে চাষ। মাঠে ফসল ছড়িয়ে থাকে পাশাপাশি, আর এখানে ফসল সাজানো হয় ওপরে ওপরে, বহুতল ভবনের তাকে। ফলে এক খণ্ড মেঝেতেই কয়েক গুণ বেশি গাছ রাখা যায়। জমির সীমাবদ্ধতা কাটানোর এটাই মূল কৌশল।

এই খামারে সূর্যের জায়গা নেয় স্বয়ংক্রিয় আলো। কোন ফসল দিনে কত ঘণ্টা আলো পাবে, কোন রঙের আলো পাবে, তা ঠিক করে দেয় কম্পিউটার। তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা, এমনকি ঘরের ভেতরের কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাইরে ঝড় হোক বা তুষার পড়ুক, ভেতরের ফসল তা টেরও পায় না। এ ধরনের চাষে পানির ব্যবহার প্রচলিত চাষের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ কমে আসে, কারণ পানি মাটিতে চুইয়ে হারিয়ে যায় না, বারবার ঘুরে ফিরে ব্যবহার হয়।

এখানে একটি প্রশ্ন ওঠে: সূর্য ছাড়া গাছ খাবার তৈরি করে কীভাবে? উত্তর লুকিয়ে আছে আলোর রঙে। গাছ পাতায় আলো শুষে নিয়ে খাবার তৈরি করে, যাকে বলে সালোকসংশ্লেষণ। এই কাজে গাছ সবচেয়ে বেশি কাজে লাগায় লাল আর নীল আলো। তাই অনেক উদ্ভিদ কারখানায় বাতিগুলো বেগুনি বা গোলাপি আভা ছড়ায়; গাছ যে রং বেশি ব্যবহার করে, শুধু সেটুকু দিলে বিদ্যুতের অপচয় কমে। এলইডি বাতি গরমও কম ছড়ায়, ফলে গাছের খুব কাছে রাখা যায় এবং তাকগুলো একটির ওপর আরেকটি ঘন করে সাজানো সম্ভব হয়।

স্প্রেডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টেকনো ফার্ম কেইহান্না চাষে ব্যবহৃত পানির ৯০ শতাংশের বেশি পুনর্ব্যবহার করে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, গাছ থেকে বের হওয়া জলীয় বাষ্পও ঘনীভূত করে আবার কাজে লাগানো হয়, ফলে একেকটি লেটুসের পেছনে পানি লাগে খোলা মাঠের তুলনায় সামান্য অংশ। সেখানে চারা বসানো থেকে শুরু করে বড় হওয়া গাছ সরানো পর্যন্ত বেশির ভাগ কাজ করে যন্ত্র, আর তাপমাত্রা ও আলোর হিসাব মেলাতে ব্যবহার হয় ইন্টারনেট অব থিংস, অর্থাৎ যন্ত্রে যন্ত্রে তথ্য আদান-প্রদানের প্রযুক্তি, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

তবে এই মডেলের সীমাবদ্ধতাও আছে, সেটা জানা দরকার। সূর্যের আলো বিনা পয়সায় মেলে, কিন্তু বাতির আলোয় খরচ হয় বিদ্যুৎ। তাই এ ধরনের খামারে এখন মূলত লেটুস, শাক আর অল্প সময়ে বড় হওয়া পাতাজাতীয় ফসলই বেশি হয়। ধান বা গমের মতো প্রধান খাদ্যশস্য এভাবে ফলানো এখনো লাভজনক নয়। ফলে ভার্টিক্যাল ফার্ম মাঠের বিকল্প নয়, বরং শহরের কাছে টাটকা সবজির একটি বাড়তি উৎস।

মাঠে রোবট: শ্রমিকের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা


যে দেশে কৃষকের গড় বয়স প্রায় সত্তর, সেখানে ভারী কাজের জন্য তরুণ হাত খুঁজে পাওয়া কঠিন। জাপান তাই রোবটের দিকে ঝুঁকেছে। ফসল রোপণ, তোলা এবং সংরক্ষণ, তিন ধাপেই এখন যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। এতে কম শ্রমিক দিয়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর এসব পদ্ধতিতে চাষের সময় ও শ্রমের খরচ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা যায় বলে দাবি করা হয়।

জাপানের কৃষিযন্ত্র নির্মাতা কুবোটা এর একটি ভালো উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০১৭ সালে তারা এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ট্রাক্টর বাজারে আনে, যা চালকের আসনে কেউ না থাকলেও কৃষকের তত্ত্বাবধানে মাঠে কাজ করতে পারে। পরে একই ধারায় আসে চালকবিহীন ধান রোপণ যন্ত্র ও কম্বাইন হারভেস্টার, অর্থাৎ ধান কাটা ও মাড়াই একসঙ্গে করার যন্ত্র। কুবোটার হিসাবে ২০২৪ সাল নাগাদ এই সিরিজের প্রায় ৭০০টি যন্ত্র জাপানের বিভিন্ন খামারে কাজ করছিল। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালের এপ্রিলে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় এমন চালকবিহীন ট্রাক্টর বাজারে আনার ঘোষণাও দিয়েছে, যাতে মাঠে সারাক্ষণ কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে না হয়।

এই যন্ত্রগুলো উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থার সাহায্যে জমির সীমানা চিনে নেয়, সারির পর সারি সোজা পথে চলে, আর সামনে মানুষ বা বাধা পেলে থেমে যায়। একজন কৃষক একসঙ্গে একাধিক যন্ত্র চালাতে পারেন, একটিতে নিজে বসে আর অন্যটি পাশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে। বয়স্ক কৃষকের পক্ষে দিনভর ট্রাক্টর চালানো কষ্টকর; সেই কাজ যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দিলে তিনি অভিজ্ঞতা দিয়ে খামার পরিচালনায় মন দিতে পারেন।

আকাশ থেকে নজর: এআই আর ড্রোন


জাপানের ধানখেতে চালকবিহীন আকাশযানের ব্যবহার নতুন নয়। ১৯৮০-র দশকের শেষ দিকেই দেশটিতে ফসলে স্প্রে করার জন্য দূরনিয়ন্ত্রিত ছোট হেলিকপ্টার চালু হয়েছিল। এখন সেই জায়গা নিচ্ছে আরও হালকা, কম দামের ড্রোন, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, অর্থাৎ এমন কম্পিউটার প্রোগ্রাম যা বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

ড্রোন মাঠের ওপর দিয়ে উড়ে ছবি তোলে। সেই ছবি দেখে এআই বলে দিতে পারে কোন অংশের গাছ দুর্বল, কোথায় আগাছা বেশি, কোথায় মাটিতে পানি বা পুষ্টির ঘাটতি। ফলে পুরো খেতে সমানভাবে সার বা ওষুধ না ছিটিয়ে শুধু প্রয়োজনীয় জায়গায় দেওয়া যায়। এতে খরচ কমে, পরিবেশে রাসায়নিকের চাপও কমে। জমির বিশ্লেষণ, ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ আর আগাছা শনাক্ত করা, এই তিন কাজেই ড্রোন এখন জাপানের কৃষকের সহকারী।

এআই-এর আরেকটি বড় কাজ হলো পূর্বাভাস। আবহাওয়ার তথ্য, আগের বছরের ফলন আর গাছের বৃদ্ধির হার মিলিয়ে কম্পিউটার আগেভাগে জানিয়ে দিতে পারে কোন খেতে কেমন ফলন হতে পারে, কবে ফসল তোলার উপযুক্ত সময়। কৃষক সেই অনুযায়ী শ্রমিক, যন্ত্র আর বাজারজাতকরণের পরিকল্পনা করতে পারেন। অনুমানের বদলে তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া, এটাই এই প্রযুক্তির মূল শক্তি।

মাটি ছাড়াই ফসল: হাইড্রোপনিক্স ও অ্যাকুয়াপনিক্স


হাইড্রোপনিক্স শব্দটি শুনতে কঠিন লাগলেও ধারণাটি পরিষ্কার: মাটির বদলে পানিতে গাছ চাষ। গাছের শিকড় থাকে পুষ্টি মেশানো পানিতে, কিংবা নারকেলের ছোবড়া বা পাথরকুচির মতো কোনো ধারক উপাদানে। গাছের যা যা খাদ্য দরকার, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম আর অন্যান্য উপাদান, সবই মাপমতো গুলে দেওয়া হয় সেই পানিতে। মাটিতে শিকড়কে খাবার খুঁজে বেড়াতে হয়, এখানে খাবার পৌঁছে যায় সরাসরি। তাই গাছ দ্রুত বাড়ে।

মাটিবিহীন চাষে পানির মান নিয়মিত মাপতে হয়। পানিতে পুষ্টি উপাদান বেশি হয়ে গেলে শিকড় পুড়ে যেতে পারে, কম হলে গাছ দুর্বল হয়; আবার পানি বেশি অম্লীয় বা বেশি ক্ষারীয় হলে গাছ খাবার নিতে পারে না। জাপানের বড় খামারে এসব মাপজোখ করে যন্ত্র, আর কোনো মাত্রা সীমা ছাড়ালে নিজে থেকেই পুষ্টি মিশিয়ে বা পানি বদলে তা ঠিক করে দেয়। ছোট খামারে কৃষক হাতে ধরা মিটার দিয়ে দিনে একবার বা দুবার এই মাপ নেন।

অ্যাকুয়াপনিক্স এর এক ধাপ এগোনো রূপ। এখানে মাছ চাষ আর সবজি চাষ একসঙ্গে চলে। মাছের ট্যাংকের পানিতে মাছের বর্জ্য জমে; সেই পানি পাঠানো হয় গাছের শিকড়ে। উপকারী জীবাণু বর্জ্যকে গাছের খাবারে রূপান্তর করে, গাছ সেই খাবার শুষে নেয়, আর পরিষ্কার হওয়া পানি আবার ফিরে যায় মাছের কাছে। এক পানিতে দুই ফসল, মাছ আর সবজি।

মাটি না থাকায় মাটিবাহিত রোগ আর অনেক পোকার উপদ্রব কমে যায়, ফলে রাসায়নিকের ব্যবহারও কমে। পানি ঘুরে ফিরে ব্যবহার হয় বলে অপচয় কম। এই কারণেই এ পদ্ধতিকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই চাষাবাদ বলা হয়। জাপানে বড় বড় উদ্ভিদ কারখানার পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তারাও এ পদ্ধতিতে শাক, টমেটো, স্ট্রবেরি চাষ করছেন।

যন্ত্রে চলা গ্রিনহাউস


গ্রিনহাউস হলো কাচ বা স্বচ্ছ প্লাস্টিকে ঘেরা চাষের ঘর, যেখানে সূর্যের আলো ঢোকে কিন্তু বাইরের ঠান্ডা, ঝড় বা ভারী বৃষ্টি ঢুকতে পারে না। জাপানের আধুনিক গ্রিনহাউসে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ। সেন্সর নামের ছোট যন্ত্র প্রতি মুহূর্তে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা আর আলো মাপে। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে জানালা নিজে থেকে খুলে যায়, ছায়ার পর্দা নেমে আসে; বাতাস শুকিয়ে গেলে কুয়াশার মতো পানি ছিটানো শুরু হয়; আলো কম হলে বাড়তি বাতি জ্বলে ওঠে।

ভূমিকম্প, টাইফুন আর ভারী তুষারপাতের দেশ জাপানে এই ব্যবস্থা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ফসল রক্ষার একটি কার্যকর উপায়। কৃষক মুঠোফোনেই দেখে নিতে পারেন ঘরের ভেতরের অবস্থা, দূর থেকেই বদলে দিতে পারেন সেটিং। ফলে একজন মানুষ আগের তুলনায় অনেক বড় জায়গা সামলাতে পারেন।

জমি ও কৃষক কম লাগলে লাভ কোথায়


জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে এই কৃষির কয়েকটি সুবিধা পরিষ্কারভাবে উঠে আসে। প্রথমত, সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার। ভার্টিক্যাল ফার্মিং আর মাটিবিহীন চাষে অল্প জায়গায় অনেক বেশি ফসল ফলানো যায়। যে দেশে জমি কম, সেখানে এর মূল্য অনেক।

দ্বিতীয়ত, টেকসই উৎপাদন। পানি, সার আর বালাইনাশকের মাপমতো ব্যবহারে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করেও উচ্চ ফলন নিশ্চিত করা যায়। তৃতীয়ত, খাদ্য সংকট মোকাবিলা। জনসংখ্যা বাড়ছে, খাবারের চাহিদাও বাড়ছে; নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের কৃষি সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন দিয়ে সেই চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।

চতুর্থত, দ্রুত উৎপাদন চক্র। প্রযুক্তির সাহায্যে আলো, তাপ ও পুষ্টি সবসময় আদর্শ মাত্রায় রাখা যায় বলে বীজ বোনা থেকে ফসল তোলা পর্যন্ত সময় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব বলে বলা হয়। বছরে একই জায়গা থেকে বেশিবার ফসল তোলা যায়। পঞ্চমত, কম খরচে বেশি লাভের সম্ভাবনা। মানুষের শ্রমের জায়গায় রোবট আর ড্রোন কাজ করলে দীর্ঘমেয়াদে শ্রমের খরচ কমে, যদিও শুরুতে যন্ত্র কেনার বিনিয়োগ বেশ বড়।

বিশ্বের জন্য জাপানের বার্তা


জাপানের কৃষি বিপ্লব বিশ্বকে প্রথম যে কথাটি বলে তা হলো, খাদ্য নিরাপত্তার লড়াইয়ে প্রযুক্তি একটি বড় হাতিয়ার। জমি ও শ্রমিক কমে গেলেও উদ্ভাবন দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখা যায়। বিশ্বের বহু দেশে কৃষকের বয়স বাড়ছে, তরুণেরা গ্রাম ছাড়ছেন; জাপান সেই ভবিষ্যৎ আগেভাগে দেখছে এবং তার মোকাবিলার পথ খুঁজছে।

দ্বিতীয় বার্তাটি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে। অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, অতিবৃষ্টি আর তাপপ্রবাহ মাঠের ফসলকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের চাষ আবহাওয়ার এই খামখেয়ালি থেকে ফসলকে অনেকটা আড়াল করতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিকে আরও পরিবেশবান্ধব করা এবং কার্বন নির্গমন যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা এই যাত্রার একটি ঘোষিত লক্ষ্য। তবে বিদ্যুৎনির্ভর খামারের পরিবেশগত লাভ অনেকটাই নির্ভর করে বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসছে তার ওপর; নবায়নযোগ্য উৎস না হলে সেই হিসাব বদলে যেতে পারে।

ভোক্তার দিক থেকেও এর একটি মানে আছে। মাঠ থেকে শহরের বাজারে পৌঁছাতে সবজিকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়; ট্রাকে, আড়তে, দোকানে পড়ে থেকে অনেক পণ্য নষ্ট হয়, টাটকা ভাবও হারায়। শহরের ভেতরে বা আশপাশে গড়ে ওঠা খামার সেই পথ ছোট করে দেয়। সকালে তোলা শাক দুপুরে থালায় পৌঁছাতে পারে। পরিবহন কম লাগলে জ্বালানিও কম পোড়ে।

তৃতীয় বার্তাটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য। জাপানের মডেল দেখায়, সীমিত সম্পদে বেশি উৎপাদন সম্ভব। সব যন্ত্র হুবহু আমদানি করার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন নিজের বাস্তবতায় উপযোগী অংশগুলো বেছে নেওয়া, যেমন পানির মাপা ব্যবহার, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত আর শহরের কাছে সবজি উৎপাদন।

বাংলাদেশের জমি, বাংলাদেশের সম্ভাবনা


বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও জরুরি। পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে প্রতি বছর বাড়িঘর, রাস্তা, কলকারখানা আর নগরায়ণের কারণে কৃষিজমি কমছে। একই সঙ্গে গ্রামের তরুণদের বড় অংশ কাজের খোঁজে শহরে বা বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন, ফলে ধান রোপণ ও কাটার মৌসুমে অনেক এলাকায় শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। জাপানের সমস্যা আর বাংলাদেশের সমস্যা হুবহু এক নয়, কিন্তু দিকটা মিলে যায়: কম জমি আর কম হাতে বেশি খাদ্য।

জাপানের উদ্ভাবনী পদ্ধতি থেকে বাংলাদেশ শিখতে পারে, কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে জমি ও শ্রমিকের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আধুনিক কৃষিকাজ করা যায়। বিশেষ করে শহুরে কৃষিতে ভার্টিক্যাল ফার্মিং ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো শহরের চারপাশে ছোট আকারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের খামার টাটকা সবজি সরবরাহ করতে পারে, পরিবহনের খরচ ও পথে নষ্ট হওয়া কমিয়ে।

এ পথে কিছু কাজ দেশেও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) মাটি ছাড়া পানিতে সবজি চাষের কৌশল নিয়ে কাজ করেছে। শহরের ছাদবাগান উৎসাহিত করতে সরকার ২০২৩ সালে ঘোষণা দিয়েছে, দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় ছাদে বাগান করলে বাড়ির মালিক হোল্ডিং করে ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে। ধান রোপণ ও কাটায় যন্ত্রের ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়ছে, আর মাঠে বালাইনাশক ছিটাতে ড্রোনের পরীক্ষামূলক ব্যবহার নিয়েও আলোচনা চলছে।

মাঠের যন্ত্রায়নেও সরকারের উদ্যোগ ছিল। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে অনুমোদিত প্রায় ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের আওতায় কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ বিভিন্ন যন্ত্র কিনতে সমতলে ৫০ শতাংশ এবং হাওরাঞ্চলে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল। একেকটি কম্বাইন হারভেস্টারের দামই ত্রিশ থেকে চল্লিশ লাখ টাকার মতো, তাই ভর্তুকি ছাড়া সাধারণ কৃষকের পক্ষে এমন যন্ত্র কেনা কঠিন। প্রকল্প শেষে ভর্তুকি বন্ধ হওয়ায় যান্ত্রিকীকরণের গতি কমে যাওয়ার খবরও এসেছে সংবাদমাধ্যমে। জাপানের অভিজ্ঞতা বলে, প্রযুক্তি ছড়াতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক নীতিসহায়তা দরকার।

তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। জাপানের মতো উচ্চমূল্যের যন্ত্র ছোট কৃষকের নাগালের বাইরে। তাই সমবায় বা ভাড়াভিত্তিক সেবার মাধ্যমে যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। বিদ্যুতের দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা ভার্টিক্যাল ফার্মের খরচ বাড়াতে পারে, সৌরবিদ্যুৎ সেখানে একটি সমাধান হতে পারে। আর প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, কৃষকের প্রশিক্ষণ ছাড়া তা মাঠে কাজে আসে না।

জাপানের শিক্ষা যন্ত্রের চেয়েও বড়


জাপানের কৃষি বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্র নয়, বরং ভিন্নভাবে চাষ করার মানসিকতা। দেশটি সমস্যা লুকায়নি; বয়স্ক কৃষক আর কমতে থাকা জমির হিসাব খোলাখুলি সামনে এনেছে, তারপর আইন, বিনিয়োগ আর গবেষণা দিয়ে সমাধান খুঁজেছে। বাংলাদেশের কৃষক নতুন জাত, নতুন যন্ত্র আর নতুন পদ্ধতি গ্রহণে বরাবরই আগ্রহ দেখিয়েছেন। সেই আগ্রহকে সঠিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ আর নীতিসহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে চাষাবাদ আরও লাভজনক, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক হয়ে উঠতে পারে।

কেইহান্নার সেই কারখানার তাকে যে লেটুস বেড়ে ওঠে, তা হয়তো বাংলাদেশের ধানখেতের বিকল্প হবে না। কিন্তু এটি মনে করিয়ে দেয়, খাবার ফলানোর পথ একটিই নয়। জমি কমছে, মানুষ শহরমুখী হচ্ছে, আবহাওয়া অনিশ্চিত হচ্ছে; এই বাস্তবতায় মাঠের অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রযুক্তির জ্ঞান মেলাতে পারাই আগামী দিনের কৃষির চাবিকাঠি।

ছবি: ভার্টিক্যাল ফার্মে হাইড্রোপনিক লেটুস, Bright Agrotech / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোটেক

সম্পর্কিত খবর

এগ্রোটেক

নিজে চলে খামারঘর ধোয়া-জীবাণুমুক্ত করবে রোবট, কানাডার শূকর খামারে আসছে

নেদারল্যান্ডসের এমএস শিপারসের স্মার্ট ক্লিনিং রোবট একবারে ফোম দেওয়া, উচ্চচাপে ধোয়া ও জীবাণুনাশ করে। থ্রিডি লিডার সেন্সরে পথ চিনে নেয় বলে আগে থেকে প্রোগ্রাম করতে হয় না।

Farms.com২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

কানাডায় খামার ও কৃষিপ্রযুক্তির বিনিয়োগে পুরো খরচ একবারে করছাড়

প্রোডাক্টিভিটি মেগা ডিডাকশন নামের নতুন কর সুবিধায় তাৎক্ষণিক খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে এমন সম্পদের ভাগ প্রায় ১৫ থেকে বেড়ে ৬৫ শতাংশের বেশি হচ্ছে, যার মধ্যে আছে গ্রিনহাউস, সফটওয়্যার, যানবাহন ও গবেষণা।

Farms.com২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

বাজেট চাপের মধ্যে কৃষি গবেষণা দ্রুত মাঠে পৌঁছাতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ব্রাসেলসে এগ্রি ২০৪০ সম্মেলনে ইউরোপীয় কর্মকর্তা ও কৃষকেরা বলেছেন, কৃষি গবেষণাকে আরও দ্রুত খামারে পৌঁছাতে হবে: কম আমলাতন্ত্র, বেশি অংশীদারত্ব আর নতুন পণ্যের চাহিদা তৈরি করে।

এজিফান্ডনিউজ২ অক্টোবর ২০২৬৩ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)