ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের জবলপুর শহরের কেশরওয়ানি পরিবার বাড়ি বড় করার সময় বাগানের প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো একটি বিশাল অশ্বত্থ (পিপল) গাছ কেটে ফেলেনি, বরং গাছটিকে ঘিরেই বাড়ি তৈরি করেছে। বার্তা সংস্থা এএফপি ২০১৯ সালের জুনে জানায়, গাছটির মোটা কাণ্ড বাড়ির মাঝখান দিয়ে উঠে গেছে এবং সেটিই এখন বাড়িটির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
জবলপুর মধ্যপ্রদেশে নর্মদা নদীর তীরে অবস্থিত একটি শহর; এটি জবলপুর জেলা ও জবলপুর বিভাগের প্রশাসনিক সদর। ২০১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী শহরের মহানগর এলাকায় ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৪৮ জন মানুষের বাস ছিল।

বাবার ইচ্ছায় রক্ষা পায় গাছটি
পরিবারের সদস্য যোগেশ কেশরওয়ানি এএফপিকে জানান, ১৯৯৪ সালে তার বাবা এক প্রকৌশলী বন্ধুর সহায়তায় বাড়িটি তৈরি করেন। তিনি বলেন, “আমরা প্রকৃতিপ্রেমী, আর আমার বাবা গাছটি রেখে দেওয়ার ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন।” তার কথায়, “গাছটির বয়স প্রায় দেড়শ বছর। আমরা জানতাম, গাছটি কাটা সহজ, কিন্তু এমন একটি গাছ বড় করে তোলা কঠিন।”
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবারটি এই বার্তাও দিতে চেয়েছিল যে কোনো কিছু ধ্বংস না করেও প্রকৃতির মাঝে বসতি গড়া যায়।
জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসে ডালপালা
অনন্য চেহারার কারণে চারতলা বাড়িটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত একটি স্থাপনা হয়ে উঠেছে। পাতাভরা ডালপালা জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে, গাছের বিশালতার পাশে বাড়িটিকে ছোট দেখায়, আর পথচারীরা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। যোগেশ বলেন, “বাড়িটি যখন প্রথম তৈরি হয়, তখন প্রকৌশলের শিক্ষার্থীরা এর অনন্য নকশা বোঝার চেষ্টা করতে এখানে আসতেন।”
যোগেশের দাবি, গাছটি কখনো পরিবারের জন্য কোনো ব্যবহারিক সমস্যা তৈরি করেনি। তিনি বলেন, “গাছটি যে আছে, আমরা তা টেরই পাই না, কারণ এটি আমাদের পথে বাধা হয় না। এটি শুধু নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে।”
অশ্বত্থ গাছের ধর্মীয় গুরুত্ব
হিন্দিতে পিপল নামে পরিচিত এই ডুমুরজাতীয় গাছকে ভারতের অনেক মানুষ পবিত্র মনে করেন, আর এমন গাছ কাটাকে অশুভ বলে গণ্য করা হয়। যোগেশ এএফপিকে বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, একটি অশ্বত্থ গাছে ৩৫ কোটি দেবদেবীর বাস। গীতাতেও এই গাছের উল্লেখ আছে।” প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার স্ত্রী প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে বের না হয়েই গাছটির সামনে বসে প্রার্থনা করতে পারেন।
অশ্বত্থের বৈজ্ঞানিক নাম ফিকাস রিলিজিওসা (Ficus religiosa)। এটি মোরেসি বা ডুমুর পরিবারের গাছ, যার আদি আবাস বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও ইন্দোচীনের কিছু অংশ। গাছটি ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে, কাণ্ডের ব্যাস হতে পারে ৩ মিটার পর্যন্ত। পাতা হৃৎপিণ্ডের মতো, ১০ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার লম্বা, আগায় থাকে লেজের মতো সরু লম্বা অংশ। ফল ছোট ডুমুর, ব্যাস ১ থেকে ১ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার; কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে বেগুনি।

ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত চারটি ধর্মে, হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ ও জৈন ধর্মে, গাছটির ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধ বিহারের বোধগয়ায় এই প্রজাতির একটি গাছের নিচে ধ্যানরত অবস্থায় বোধি লাভ করেন; এ কারণে গাছটি বোধিবৃক্ষ নামেও পরিচিত।

ছবি: LRBurdak / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, এএফপি (ফ্রান্স ২৪ ও আরব নিউজে প্রকাশিত), উইওন, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)