১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব বাঁশ দিবস। ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর দিনটি পালন করে ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্গানাইজেশন (ডব্লিউবিও)। ২০২৬ সালের বার্তায় সংস্থাটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও টেকসই উন্নয়নের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বাঁশকে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ব্যাম্বু বিয়ন্ড বর্ডারস’—গ্রাম থেকে শহর, কৃষিজমি থেকে কারখানা, আধুনিক স্থাপত্য পর্যন্ত বাঁশকে সম্পদ হিসেবে দেখার ডাক।
দিবসটির সূচনা ২০০৯ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অষ্টম ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু কংগ্রেসে, যার আয়োজনে সহায়তা করেছিল দেশটির রয়্যাল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট। কংগ্রেসের প্রথম আসর বসেছিল ১৯৮৪ সালে পুয়ের্তো রিকোতে; ১৯৯২ সালে জাপানের মিনামাতায় তৃতীয় আসরে ইন্টারন্যাশনাল ব্যাম্বু অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়, ২০০৪ সালে নয়াদিল্লির ষষ্ঠ আসরে সেটিই ডব্লিউবিওতে রূপ নেয় এবং ২০০৫ সালে আইনগত সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এটি জাতিসংঘ ঘোষিত দিবস নয়; বাঁশ রোপণ, কর্মশালা, প্রদর্শনী ও গবেষণার আয়োজনে বিভিন্ন দেশে দিনটি পালিত হয়।
গবেষণা বলছে, বাঁশের শিকড় মাটির নিচে ঘন জালের কাঠামো তৈরি করে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘মেরিটস অব ব্যাম্বু ইউটিলাইজেশন ইন আর্থ প্রিজারভেশন, ওয়াটার অ্যান্ড ওয়েস্টওয়াটার ট্রিটমেন্ট’ শিরোনামের গবেষণায় বলা হয়েছে, এই জাল মাটির ক্ষয় ও গুণমানের পতন ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে এবং পানি প্রবাহের সময় ক্ষতিকর উপাদান আটকে দিতে পারে—তবে প্রজাতি, পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার ধরন অনুযায়ী প্রভাব ভিন্ন হয়।
কার্বন সংরক্ষণের জন্য বেশি করে বাঁশ লাগানোর পরামর্শ নিয়ে অবশ্য সতর্কতা আছে। ২০২৫ সালে এনভায়রনমেন্টাল রিভিউজ সাময়িকীতে প্রকাশিত সুমন দত্ত ও সহলেখকদের পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বাঁশ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন নিয়ে জমা রাখে, কিন্তু কেটে পুড়িয়ে ফেললে সেই কার্বন আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে যেতে পারে। তাই বাঁশ জলবায়ুর জন্য কতটা উপকারী, তা নির্ভর করে কীভাবে উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর; গবেষকেরা এ নিয়ে আরও গবেষণার তাগিদ দিয়েছেন।
ডব্লিউবিও বলছে, নির্মাণ, আসবাব, প্রকৌশলজাত পণ্য, বস্ত্র, কাগজ, খাদ্য, জ্বালানি ও জৈবভিত্তিক প্রযুক্তিতে বাঁশের সম্ভাবনা আছে, তবে টেকসই নির্মাণের জন্য শুকানো, সংরক্ষণ, সংযোগ, অগ্নিনিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণ জরুরি। প্রতিটি বাঁশের পণ্যের পেছনে কৃষক, কারুশিল্পী, প্রকৌশলী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শ্রম থাকে বলে ন্যায্য সুবিধার প্রশ্নও তুলেছে সংস্থাটি। ভিয়েতনামে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রকল্পে বাঁশচাষি নারীরা সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় ভাগাভাগি, বিক্রি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন; বাঁশ সেখানে আয়ের উৎস হওয়ার পাশাপাশি ভূমি পুনরুদ্ধারেও ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশে ঘরবাড়ি, বেড়া, সাঁকো, কৃষি সরঞ্জাম, মাছ ধরার চাঁই, ঝুড়ি-কুলা-ডালায় বাঁশের ব্যবহার বহু পুরোনো। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ২০০৫–২০১৫ সালে বাঁশের কম্পোজিট দিয়ে আসবাব তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে এবং ২০১৫–২০২০ সালে এর নকশা উন্নয়ন ও প্রসারে জোর দেয়; চট্টগ্রামের ষোলশহরে সংস্থাটির ক্যাম্পাসে ৩৬ প্রজাতির বাঁশ সংরক্ষিত আছে। কম্পোজিট বোর্ড ও আসবাবে কাঠের বিকল্পের সম্ভাবনা দেখেছে বিএফআরআইয়ের গবেষণা।
আশঙ্কাও আছে। ২০১৮ সালের হিউম্যানিটারিয়ান ব্যাম্বু প্রজেক্টের প্রতিবেদনে দেশে বাঁশের সরবরাহ কমার কারণ হিসেবে জমি পরিষ্কার, স্থানীয় বাজারে দাম পড়ে যাওয়া ও ব্যাপকভাবে ফুল ধরা রোগের কথা বলা হয়েছে, অথচ নির্মাণসহ নানা খাতে বাঁশের চাহিদা এখনো ভালো। এই দুই বিপরীত বাস্তবতার মধ্যে বাঁশচাষি ও কারুশিল্পীর জন্য পথ একটাই—বাজারের চাহিদার পাশাপাশি টেকসই উৎপাদন ও প্রজাতি সংরক্ষণ।
সূত্র: প্রথম আলো




মন্তব্য
(০)