সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা৩৩°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫০%বাতাস ৮ কিমি/ঘ

টানেল প্রযুক্তিতে সবজির ফলন আর দাম, দুই-ই হতে পারে দ্বিগুণ

রবি মৌসুমে বাজারে সবজির ভিড়ে কৃষক ন্যায্য দাম পান না, অথচ পলিথিনের টানেলে আগাম বা অমৌসুমি সবজি ফলিয়ে দ্বিগুণের বেশি দাম পাওয়া যায়। টানেল চাষ কী, কোন সবজি হয়, নিচু ও উঁচু টানেলের মাপ, জমি তৈরি, সার আর কৃষকের লাভের হিসাব।

টানেল প্রযুক্তিতে সবজির ফলন আর দাম, দুই-ই হতে পারে দ্বিগুণ
এগ্রোটেক

আষাঢ়ের এক সকালে পাইকারি বাজারে গেলে দেখা যায় সবজির ডালা প্রায় ফাঁকা, আর যা আছে তার দাম আকাশছোঁয়া। অথচ মাঘ মাসে সেই একই বাজারে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো আর শিমের স্তূপ জমে থাকে, দাম পড়ে যায় এত নিচে যে অনেক কৃষক খেত থেকে সবজি তোলার খরচও তুলতে পারেন না। একই মাটি, একই কৃষক, একই সবজি; পার্থক্য শুধু সময়ের। এই সময়ের ফাঁকটুকু ধরার একটি পুরোনো কিন্তু কার্যকর কৌশলের নাম টানেল প্রযুক্তি, যাকে অনেকে ছাউনি পদ্ধতিও বলেন।

নানা ধরনের সবজি উৎপাদনের জন্য আমাদের মাটি খুবই উপযোগী। শীত আর গ্রীষ্ম, দুই মৌসুমেই চাষ করা যায় এমন সবজির তালিকাটাও বেশ লম্বা। কিন্তু নানা কারণে দেশের চাষযোগ্য জমি দিন দিন কমে আসছে। ঘরবাড়ি, রাস্তা, কলকারখানা আর বাজার গড়ে উঠছে একসময়ের খেতের ওপর। গ্রামের অনেক পরিবারে সবজি চাষের জন্য বরাদ্দ থাকে রান্নাঘর বা গোয়ালঘরের পেছনের এক চিলতে জমি। অথচ পরিবারের পুষ্টির চাহিদার কথা ভাবলে সবজির জায়গা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। সত্যি বলতে, অল্প জমি কাজে লাগিয়ে পুষ্টির চাহিদা মেটানোর একটাই পথ খোলা আছে: সারা বছর ধরে নিবিড়ভাবে সবজির চাষ।

মৌসুমের ফাঁদে কৃষক


আমাদের দেশে বেশির ভাগ সবজি উৎপাদন হয় রবি মৌসুমে, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মার্চ মাসে। এই সময়ের ঠান্ডা, শুকনো আর রোদেলা আবহাওয়া বেশির ভাগ সবজির জন্য আদর্শ। খরিফ মৌসুমে, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় সবজির চাষ অনেক কম হয়। ফলে এ সময় বাজারে সবজির দাম চড়া থাকে। বিশেষ করে মে থেকে জুলাই মাসে একদিকে প্রচুর বৃষ্টি, অন্যদিকে কোথাও কোথাও খরা, এই দুইয়ের চাপে উৎপাদন কমে যায় আর বাজারদর বেড়ে যায়।

উল্টো ছবি দেখা যায় ভরা মৌসুমে। তখন বাজারে সরবরাহ এত বেশি থাকে যে চাষি ভাইয়েরা ন্যায্য দাম পান না। এক জেলার কৃষক যখন ফুলকপি তুলছেন, তখন আশপাশের দশ জেলার কৃষকও একই কাজ করছেন। ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতা বেশি হলে দাম নামবেই। তাই হিসাবটা দাঁড়ায় এমন: মৌসুম শুরুর আগেই যদি আগাম সবজি উৎপাদন করে বাজারে তোলা যায়, তাহলে দ্বিগুণেরও বেশি দাম পাওয়া সম্ভব। আবার মৌসুম শেষ হওয়ার পরেও যদি কিছু সবজি ধরে রাখা যায়, সেখানেও একই সুবিধা।

দেশের উত্তরাঞ্চলসহ নানা এলাকায় কৃষকেরা এই কারণেই আগাম শীতকালীন সবজির দিকে ঝুঁকছেন। সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতি বছরই খবর আসে, রংপুর, দিনাজপুর বা রাজশাহীর কৃষকেরা আগাম সবজি তুলে ভালো দাম পাচ্ছেন, আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু খোলা মাঠে আগাম চাষের বড় ঝুঁকি হলো বর্ষার শেষ দিকের ভারী বৃষ্টি। একটা টানা বর্ষণেই চারা পচে যেতে পারে, ফুল ঝরে যেতে পারে। ঠিক এখানেই টানেলের কাজ।

টানেল চাষ আসলে কী


যে কৌশল অবলম্বন করে সারা বছর সবজি চাষ করা যায়, কিংবা শীতকালীন সবজি আগাম উৎপাদন করা যায়, তারই নাম টানেল প্রযুক্তি। নামটা এসেছে কাঠামোর চেহারা থেকে। বাঁশ বা লোহার বাঁকানো খুঁটির ওপর পলিথিন বিছিয়ে দিলে পুরো কাঠামোটা দেখতে হয় লম্বা একটা সুড়ঙ্গের মতো, অনেকটা নৌকার ছইয়ের মতো। এই ছাউনির নিচে গাছ বৃষ্টি, কুয়াশা, ঠান্ডা বাতাস আর অতিরিক্ত রোদ থেকে কিছুটা সুরক্ষা পায়।

প্রকৃত মৌসুম ছেড়ে অন্য মৌসুমে সবজি চাষের জন্য এই কৌশলের জুড়ি মেলা ভার। তবে একটা সীমাবদ্ধতার কথা শুরুতেই জেনে রাখা ভালো। টানেলের সাহায্যে শীতকালীন সবজিকে ভরা গ্রীষ্মে চাষ করা কঠিন। কারণ শীতের সবজির জন্য যে ঠান্ডা তাপমাত্রা দরকার, গরমের মধ্যে কৃত্রিমভাবে সেই পরিবেশ তৈরি করা বেশ ব্যয়বহুল। ঘর ঠান্ডা রাখতে যন্ত্র, বিদ্যুৎ আর বাড়তি খরচ লাগে, যা সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে।

উল্টো কাজটা অনেক কম খরচে করা যায়। কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে গ্রীষ্মকালীন সবজিকে শীতকালে চাষ করা তুলনামূলকভাবে অনেক সুবিধাজনক। কারণটা বোঝা কঠিন নয়। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ছাউনি ভেদ করে সূর্যের আলো ভেতরে ঢোকে, মাটি আর গাছ সেই আলো শুষে গরম হয়, কিন্তু সেই তাপ পুরোপুরি বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে না। ফলে শীতের দিনেও ছাউনির ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে বেশি থাকে। শীতের রাতে গাড়ির কাচ তোলা থাকলে ভেতরটা যেমন উষ্ণ থাকে, ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম। এই বাড়তি উষ্ণতাই শীতকালে গ্রীষ্মের সবজি চাষের জন্য যথেষ্ট।

একই ছাউনি বর্ষাকালে কাজ করে ছাতার মতো। ভারী বৃষ্টির ফোঁটা সরাসরি পাতায় আর মাটিতে পড়ে না, মাটি ধুয়ে যায় না, কচি চারা থেঁতলে যায় না। বৃষ্টির ছিটায় মাটি থেকে পাতায় রোগজীবাণু ছড়ানোর সুযোগও কমে। ফলে বর্ষার শেষ দিকে বীজতলা বা আগাম শীতের সবজি টানেলের নিচে অনেক নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে।

কোন কোন সবজি টানেলে ভালো হয়


টানেল প্রযুক্তি বা ছাউনি পদ্ধতিতে যেসব সবজি অল্প ঝামেলায় চাষ করা যায়, সেগুলোর মধ্যে আছে শসাজাতীয় সবজি, টমেটো, পালংশাক, বাঁধাকপি বা পাতাকপি, ফুলকপি আর শিম। শসাজাতীয় সবজি বলতে বোঝায় শসা, খিরা, লাউ, কুমড়া, করলা, ঝিঙার মতো লতানো সবজি, যাদের বেশির ভাগই গরম পছন্দ করে। শীতের ঠান্ডায় খোলা মাঠে এগুলো ঠিকমতো বাড়ে না, কিন্তু উষ্ণ টানেলের ভেতরে বাড়তে পারে।

টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি আর শিম মূলত শীতের সবজি। টানেলে এগুলোর বীজতলা বা চারা বর্ষার শেষ দিকে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে আগেভাগে তৈরি করা যায়, ফলে ফসল বাজারে ওঠে মৌসুমের অনেক আগে। পালংশাকের মতো দ্রুত বাড়ে এমন শাক টানেলে অল্প সময়ে একটার পর একটা ফসল দিতে পারে।

এই কৌশলে একজন চাষি আগাম সবজি ফলিয়ে প্রকৃত মৌসুমের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন। দেশের অনেক অঞ্চলের চাষি ভাইয়েরা এর মধ্যে এই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছেন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনো অনেক কম। বেশির ভাগ কৃষক হয় পদ্ধতিটির কথা জানেন না, নয়তো শুরুর খরচ আর কাঠামো তৈরির ঝামেলার কথা ভেবে পিছিয়ে থাকেন।

দুই ধরনের টানেল


কাঠামোর আকার অনুযায়ী টানেল মূলত দুই রকম: নিচু টানেল আর উঁচু টানেল। নিচু টানেল ছোট জমি আর কম পুঁজির কৃষকের জন্য, উঁচু টানেল বড় পরিসরে বাণিজ্যিক চাষের জন্য। দুটোর মূল ধারণা এক, পার্থক্য মাপ, উপকরণ আর খরচে।

দুই টানেলেরই মাপ দেওয়া আছে ফুটে, কিন্তু হুবহু সেই মাপ মানতে না পারলে ভয়ের কিছু নেই। জমির আকার অনুযায়ী দৈর্ঘ্য কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তবে মাঝখান আর পাশের উচ্চতার অনুপাত, নালার গভীরতা আর চওড়া ঠিক রাখা জরুরি, কারণ এগুলোর ওপরই নির্ভর করে পানি কীভাবে সরবে আর ভেতরে বাতাস কীভাবে চলবে।

নিচু টানেল কীভাবে বানাবেন


এ ধরনের টানেল তৈরির প্রধান উপকরণ বাঁশ। গ্রামে বাঁশ হাতের কাছেই পাওয়া যায়, দামও তুলনামূলক কম, তাই ছোট কৃষকের জন্য নিচু টানেলই শুরু করার ভালো উপায়। টানেলের দৈর্ঘ্য হবে ৯৮.৪ ফুট, অর্থাৎ ৩০ মিটার, আর চওড়া হবে ১৪.৭৬ ফুট, অর্থাৎ সাড়ে ৪ মিটার। ভেতরের মাঝ বরাবর উচ্চতা হবে ৭ ফুট এবং দুই পাশের উচ্চতা ৫ ফুট। মাঝখানটা উঁচু আর পাশ নিচু রাখার কারণ হলো বৃষ্টির পানি যেন ছাউনির ওপর জমে না থেকে দুই পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যায়।

সেচ আর পানি নিষ্কাশনের জন্য দুই বেড বা দুই টানেলের মাঝখানে ৬ ইঞ্চি গভীর আর ২ ফুট চওড়া নালা রাখতে হয়। এই নালা দিয়ে শুকনো মৌসুমে সেচের পানি যায়, আর বর্ষায় বাড়তি পানি বেরিয়ে যায়। সবজির শিকড় পানি জমে থাকা সহ্য করতে পারে না, তাই নালা না রাখলে টানেলের সব সুবিধা মাটিতে মিশে যেতে পারে।

কাঠামো দাঁড় করানোর পর স্বচ্ছ, কালো বা নীল রঙের পলিথিন দিয়ে টানেলটি নৌকার ছইয়ের মতো করে ঢেকে দিতে হয়। পলিথিন যেন বাতাসে উড়ে না যায়, সে জন্য কিনারা মাটিতে ভালোভাবে চাপা দিয়ে বা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। রোদ বেশি হলে বা ভেতরে খুব গরম ও ভ্যাপসা হয়ে গেলে দিনের বেলা পাশের পলিথিন কিছুটা তুলে বাতাস চলাচলের সুযোগ দেওয়া ভালো। অতিরিক্ত আর্দ্রতায় ছত্রাকজনিত রোগ বাড়ে, আর অতিরিক্ত তাপে ফুল ঝরে যেতে পারে।

উঁচু টানেলের মাপ ও নিয়ম


এ ধরনের টানেল তৈরির প্রধান উপকরণ স্টিলের ফ্রেম, তবে বাঁশ দিয়েও বানানো যায়। আকারে এটি নিচু টানেলের চেয়ে অনেক বড়। দৈর্ঘ্য হবে ১৩০ ফুট আর চওড়া ৩২ ফুট। ভেতরের মাঝ বরাবর উচ্চতা ১২ ফুট এবং পাশের উচ্চতা ১০ ফুট। এত উঁচু হওয়ায় মানুষ ভেতরে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে কাজ করতে পারেন, মাচা বা খুঁটি দিয়ে টমেটো, শসা বা করলার মতো লতানো গাছ ওপরের দিকে তুলে দেওয়া যায়।

সেচ ও পানি নিষ্কাশনের জন্য দুই বেড বা টানেলের মাঝখানে ৬ ইঞ্চি গভীর আর ৩ ফুট চওড়া নালা রাখতে হয়। চারা থেকে চারা বা বীজ থেকে বীজের দূরত্ব রাখতে হয় দেড় ফুট। এরপর একইভাবে স্বচ্ছ, কালো বা নীল রঙের পলিথিন দিয়ে টানেলটি নৌকার ছইয়ের মতো ঢেকে দিতে হয়।

স্টিলের কাঠামোর শুরুর খরচ বেশি, কিন্তু তা টেকে বহু বছর। বাঁশের কাঠামো কম খরচে হয়, তবে রোদ-বৃষ্টিতে কয়েক মৌসুম পর বদলাতে হয়। পলিথিনও রোদে ধীরে ধীরে ভঙ্গুর হয়ে যায়, তাই মৌসুম শেষে খুলে গুছিয়ে রাখলে বা রোদ সহনশীল মানের পলিথিন কিনলে তা বেশি দিন কাজে আসে। কোন কাঠামো বেছে নেবেন, তা নির্ভর করে জমির পরিমাণ, পুঁজি আর কোন সবজি কতদিন ধরে চাষ করবেন তার ওপর।

জমি তৈরি আর সারের হিসাব


এই পদ্ধতিতে সবজি চাষের জন্য যে জমি বাছাই করা হয়, তা অবশ্যই উর্বর হতে হবে। মাটির পিএইচ থাকতে হবে ৫ থেকে ৭ এর মধ্যে। পিএইচ হলো মাটি কতটা অম্ল বা ক্ষারীয় তার মাপকাঠি। ৭ মানে নিরপেক্ষ, তার নিচে অম্লীয়। বেশির ভাগ সবজি হালকা অম্লীয় থেকে নিরপেক্ষ মাটিতে সবচেয়ে ভালো জন্মায়, আর এই সীমার মধ্যে থাকলে গাছ মাটি থেকে পুষ্টি ঠিকমতো নিতে পারে। উপজেলা কৃষি অফিস বা মাটি সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা করিয়ে নিলে অনুমানের ওপর চলতে হয় না।

টানেল তৈরির পর জমি কোদাল দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে ভালোভাবে কুপিয়ে ঝুরঝুরে করতে হয়। তারপর প্রতিটি টানেলে প্রয়োগ করতে হয় পর্যাপ্ত জৈব সার এবং নিচের পরিমাণে অন্যান্য সার:

  • খৈল: ২.৫ কেজি
  • ইউরিয়া: ৮০০ গ্রাম
  • টিএসপি: ৫০০ গ্রাম
  • এমওপি বা পটাশ: ৭০০ গ্রাম

এখানে প্রতিটি সারের আলাদা কাজ আছে। খৈল হলো সরিষা বা অন্য তেলবীজ ভাঙানোর পর যে অংশ থাকে, ধীরে ধীরে পচে তা মাটিতে জৈব পদার্থ আর পুষ্টি যোগায়। ইউরিয়া থেকে আসে নাইট্রোজেন, যা পাতা আর ডালপালা বাড়ায়। টিএসপি দেয় ফসফরাস, যা শিকড় মজবুত করে আর ফুল-ফল ধরতে সাহায্য করে। এমওপি বা পটাশ দেয় পটাশিয়াম, যা গাছকে রোগ ও খরা সহনশীল করে এবং ফলের মান ভালো রাখে।

ইউরিয়া আর পটাশ সারের অর্ধেক দিতে হবে জমি তৈরির সময়, আর বাকি অর্ধেক চারা গজানোর দুই সপ্তাহ পরে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। উপরি প্রয়োগ মানে গাছ দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর গাছের আশপাশে মাটির ওপর সার ছিটিয়ে দেওয়া বা হালকা মিশিয়ে দেওয়া। একবারে সব সার দিলে তার একটা অংশ পানিতে ধুয়ে নষ্ট হয়, আবার চারা অবস্থায় বেশি সার গাছের ক্ষতিও করতে পারে। দুই দফায় দিলে গাছ যখন সবচেয়ে বেশি খাবার চায়, তখনই তা পায়।

সার মেশানো শেষ হলে চারা বা বীজ রোপণের আগে বেড তৈরি করে নিতে হয়। বেড হলো নালার দুই পাশে একটু উঁচু করে বানানো লম্বা মাটির সারি, যাতে গাছের গোড়ায় পানি না জমে।

পালংশাকের এক মাসের হিসাব


টানেল চাষ কত দ্রুত ফল দিতে পারে, তার একটি পরিষ্কার উদাহরণ পালংশাক। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুতে প্রতিটি টানেলে ২০০ গ্রাম পালংশাকের বীজ বুনলে এক মাস পর, অর্থাৎ আষাঢ় মাসে, ফসল তোলা যায়। জ্যৈষ্ঠ মানে মোটামুটি মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুনের মাঝামাঝি, আর আষাঢ় জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি। অর্থাৎ ঠিক সেই সময়ে পালংশাক বাজারে উঠছে, যখন ভারী বৃষ্টিতে খোলা মাঠের শাকসবজি নষ্ট হয় আর বাজারে সরবরাহ সবচেয়ে কম থাকে।

পালংশাক সাধারণত শীতের শাক। খোলা মাঠে বর্ষার শুরুতে এর চাষ ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ টানা বৃষ্টিতে কচি পাতা পচে যায়। টানেলের ছাউনি সেই বৃষ্টি আটকে দেয়, আর দুই পাশের নালা বাড়তি পানি সরিয়ে নেয়। এক মাসের মধ্যে একটা ফসল তুলে একই টানেলে আবার নতুন করে বীজ বোনা যায়, কিংবা পরের মৌসুমের জন্য অন্য সবজির চারা তৈরি করা যায়।

এক টানেলে সারা বছরের পরিকল্পনা


টানেলের আসল সুবিধা পাওয়া যায় যখন একে একটি মৌসুমের জন্য নয়, পুরো বছরের জন্য ভাবা হয়। বর্ষার শেষ দিকে, অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিনে, খোলা মাঠে যখন বৃষ্টির ভয়ে কৃষক বীজতলা করতে দ্বিধায় থাকেন, তখন টানেলের নিচে টমেটো, ফুলকপি বা বাঁধাকপির চারা তৈরি করা যায়। সেই চারা মাঠে লাগালে ফসল ওঠে প্রতিবেশীর চেয়ে কয়েক সপ্তাহ আগে, যখন বাজারে শীতের সবজি সবে আসতে শুরু করেছে।

শীতের মাঝামাঝি, পৌষ-মাঘে, একই টানেলে শসা, লাউ বা করলার মতো গরম পছন্দ করা সবজি লাগানো যায়। বাইরের ঠান্ডায় এগুলো প্রায় থেমে থাকে, কিন্তু ছাউনির উষ্ণতায় বাড়তে থাকে। ফলে ফাল্গুন-চৈত্রে যখন মাঠের গ্রীষ্মকালীন সবজি সবে লাগানো হচ্ছে, টানেলের কৃষক তখন ফসল তুলছেন। এরপর জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের বৃষ্টিতে পালংশাকের মতো শাক, যার কথা আগেই বলা হয়েছে।

এভাবে ভাবলে একটি টানেল বছরে তিন থেকে চারবার ভিন্ন ভিন্ন কাজে লাগে, আর প্রতিবারই ফসল বাজারে যায় এমন সময়ে যখন সরবরাহ কম। কোন মাসে কোন সবজি, তা এলাকাভেদে কিছুটা বদলায়; তাই স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ আর নিজের বাজারের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে ক্যালেন্ডার ঠিক করাই ভালো।

কৃষকের লাভ কোথায়


টানেল চাষের মূল আকর্ষণ দামে। একই জমি, একই শ্রম, কিন্তু ফসল বাজারে যাচ্ছে এমন সময়ে যখন ক্রেতা বেশি আর বিক্রেতা কম। ফলে একই পরিমাণ সবজি বিক্রি করে কৃষক ভরা মৌসুমের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি দাম পেতে পারেন। পাশাপাশি বৃষ্টি, কুয়াশা আর শিলার মতো আবহাওয়ার ঝুঁকি কমায় ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও কমে। অল্প জমিতে বছরে একাধিক ফসল তোলা যায় বলে জমির ব্যবহারও বাড়ে।

টানেল পদ্ধতিতে অমৌসুমে সবজি চাষ করে পৃথিবীর অনেক দেশ, বিশেষ করে ভারত, নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে প্রচুর সবজি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ আর এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। আমাদের দেশের চাষিদের যদি সবজি চাষের এই কৌশল সম্পর্কে সচেতন করা যায়, আর পাশাপাশি সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে বাংলাদেশও নিজের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে সবজি রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে।

সহযোগিতা বলতে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। প্রথমত, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, যাতে কৃষক ঠিক মাপে কাঠামো বানাতে আর ভেতরের তাপ ও আর্দ্রতা সামলাতে পারেন। দ্বিতীয়ত, শুরুর পুঁজি, কারণ পলিথিন, বাঁশ বা স্টিলের কাঠামোর খরচ প্রথম বছরেই গুনতে হয়। তৃতীয়ত, বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ, যাতে আগাম সবজি ঠিক সময়ে শহরের বাজারে বা রপ্তানিকারকের কাছে পৌঁছায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিস এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারাই কৃষকের সবচেয়ে কাছের পরামর্শদাতা; টানেল চাষ শুরুর আগে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

শুরু করার আগে যা মাথায় রাখা দরকার


টানেল চাষে নামার আগে কয়েকটি বিষয় ভেবে নেওয়া ভালো। প্রথম বছর ছোট পরিসরে, একটি বা দুটি নিচু টানেল দিয়ে শুরু করলে শেখার খরচ কম পড়ে। কোন সবজি আপনার এলাকার বাজারে কোন মাসে সবচেয়ে বেশি দামে বিকোয়, তা আগে থেকে খোঁজ নিলে বপনের সময় ঠিক করা যায়। জমিটি যেন উঁচু হয় এবং বর্ষায় পানি না ওঠে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। টানেলের ভেতরের তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা প্রতিদিন দেখে প্রয়োজনে পাশের পলিথিন তুলে বা নামিয়ে বাতাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

রোগ আর পোকার দিকেও চোখ রাখা দরকার। ছাউনির নিচের উষ্ণ, আর্দ্র পরিবেশ গাছের জন্য যেমন আরামদায়ক, কিছু ছত্রাক আর পোকার জন্যও তেমনি। তাই আক্রান্ত পাতা দ্রুত সরিয়ে ফেলা, গাছের মাঝে যথেষ্ট ফাঁকা জায়গা রাখা এবং প্রয়োজনে কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করাই নিরাপদ।

আরেকটি অভ্যাস অনেক কাজে আসে: হিসাবের খাতা রাখা। কোন দিন কী বীজ বোনা হলো, কত টাকার সার, পলিথিন আর শ্রম লাগল, কোন দিন কত কেজি সবজি কত দামে বিক্রি হলো, এসব লিখে রাখলে প্রথম মৌসুম শেষেই পরিষ্কার বোঝা যায় টানেল আসলে কতটা লাভ দিল, আর পরের বার কোথায় খরচ কমানো যায়।

টানেল চাষ কোনো জাদুর কৌশল নয়। এটি আসলে প্রকৃতির সঙ্গে একটু সময় কিনে নেওয়ার উপায়। বাঁশ, পলিথিন আর কিছুটা বাড়তি যত্নের বিনিময়ে কৃষক তাঁর সবজিকে এমন সময়ে বাজারে নিয়ে যেতে পারেন, যখন ক্রেতা অপেক্ষা করছেন আর দাম চড়া। জমি যখন কমছে আর খাবারের চাহিদা বাড়ছে, তখন এক খণ্ড জমি থেকে বছরে বেশি ফসল আর বেশি আয় তুলে আনার এই কৌশল বাংলাদেশের কৃষির জন্য বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। এই পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করে কৃষকেরা আর্থিকভাবেও অনেক লাভবান হতে পারেন।

ছবি: পলিটানেলে সবজি চাষ, Peter Barr / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোটেক

সম্পর্কিত খবর

এগ্রোটেক

নিজে চলে খামারঘর ধোয়া-জীবাণুমুক্ত করবে রোবট, কানাডার শূকর খামারে আসছে

নেদারল্যান্ডসের এমএস শিপারসের স্মার্ট ক্লিনিং রোবট একবারে ফোম দেওয়া, উচ্চচাপে ধোয়া ও জীবাণুনাশ করে। থ্রিডি লিডার সেন্সরে পথ চিনে নেয় বলে আগে থেকে প্রোগ্রাম করতে হয় না।

Farms.com২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

কানাডায় খামার ও কৃষিপ্রযুক্তির বিনিয়োগে পুরো খরচ একবারে করছাড়

প্রোডাক্টিভিটি মেগা ডিডাকশন নামের নতুন কর সুবিধায় তাৎক্ষণিক খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে এমন সম্পদের ভাগ প্রায় ১৫ থেকে বেড়ে ৬৫ শতাংশের বেশি হচ্ছে, যার মধ্যে আছে গ্রিনহাউস, সফটওয়্যার, যানবাহন ও গবেষণা।

Farms.com২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

মেশিন লার্নিং দিয়ে সয়াবিনের সাদা ছত্রাক রোগ প্রতিরোধী জিন খুঁজছেন কানাডার বিজ্ঞানীরা

কানাডার কৃষি বিভাগ ও কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জিনোম, জিনের প্রকাশ ও প্রোটিনের মিথস্ক্রিয়ার তথ্য মেশিন লার্নিংয়ে বিশ্লেষণ করে স্ক্লেরোটিনিয়া প্রতিরোধের পেছনের অনেক ছোট প্রভাবের জিন খুঁজছেন, যাতে কম ছত্রাকনাশকে ফলন স্থিতিশীল থাকে।

এজি কানাডা২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)