বাংলাদেশে কোরবানির ঈদে জবাই হওয়া গরুর সংখ্যা কয়েক বছর ধরে কমছে, আর ছোট খামারিরা বলছেন গরু পালনের খরচ তুলে দাম পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। ২০২৬ সালের ২২ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ২০১৯ সালে দেশে ৫৬ লাখ ৫৯ হাজার গরু কোরবানি হলেও ২০২৫ সালে সংখ্যাটি নেমে এসেছে ৪৬ লাখ ৫০ হাজারে; কোভিড মহামারির কয়েক বছর পরও তা মহামারি-পূর্ব পর্যায়ের চেয়ে প্রায় ১০ লাখ কম। আসন্ন ঈদুল আজহা, যা ওই বছর ২৮ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, তাকে সামনে রেখেই এই হিসাব আবার আলোচনায় আসে। খামারিরা বলছেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দাম না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক প্রান্তিক খামারি এখন গরু পালন কমিয়ে দিচ্ছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বছরওয়ারি হিসাব
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৭ সালে দেশে ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার গরু কোরবানি হয়েছিল। পরের দুই বছরে সংখ্যাটি দ্রুত বাড়ে; ২০১৮ সালে তা দাঁড়ায় ৫৩ লাখ ৯১ হাজারে এবং ২০১৯ সালে পৌঁছে যায় ৫৬ লাখ ৫৯ হাজারে, যা ছিল ওই সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এরপরই আসে কোভিড মহামারি। ২০২০ সালে কোরবানি হওয়া গরুর সংখ্যা নেমে আসে ৫০ লাখে এবং ২০২১ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ৪০ লাখে; অর্থাৎ অধিদপ্তরের হিসাবেই দুই বছরে পতন প্রায় ১৬ লাখ। অর্থনীতির সংকোচন, মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং মহামারিকালের বিধিনিষেধ ওই দুই বছরের কোরবানির বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
মহামারি-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে থাকলে সংখ্যাটি আবার বাড়তে শুরু করে, তবে পুরোনো উচ্চতায় আর ফেরেনি। অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২২ সালে ৪৫ লাখ ৬৫ হাজার, ২০২৩ সালে ৪৫ লাখ ৮১ হাজার এবং ২০২৪ সালে ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার গরু কোরবানি হয়। কিন্তু ২০২৫ সালে সংখ্যাটি আবার কমে দাঁড়ায় ৪৬ লাখ ৫০ হাজারে, যা ২০১৯ সালের সর্বোচ্চ ধাপের চেয়ে প্রায় ১০ লাখ কম। এই ধারাবাহিক ওঠানামার দিকে তাকিয়েই খামারি ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোরবানিতে গরুর চাহিদা এখন তার আগের শিখর থেকে নিচে নেমে একটি নতুন, নিচু ধাপে স্থিত হয়েছে। সংখ্যাগুলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিজস্ব হিসাব থেকে নেওয়া, যারা প্রতি বছর কোরবানির আগে ও পরে দেশজুড়ে প্রস্তুত ও জবাই হওয়া পশুর তথ্য সংগ্রহ করে।
খরচ উঠছে না, বলছেন প্রান্তিক খামারিরা
ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের কৃষক শেখ ফরিদ গত বছর চারটি গরু পালন করে সবকটি বিক্রি করলেও তার ভাষায় যথাযথ দাম পাননি। এবার তিনি ব্যাংকঋণে একটি মাত্র গরু কিনেছেন। তিন মণ ওজনের ওই গরুটির পেছনে সব মিলিয়ে তার খরচ পড়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা, অথচ ক্রেতারা দাম বলছেন এক লাখ টাকা। যে গোয়ালে সাতটি গরু রাখার জায়গা, সেখানে এখন একটি গরু; এবার দাম না পেলে খামারটি আর রাখবেন না বলে জানান তিনি। তার মতো অনেক ছোট খামারির অভিজ্ঞতাই ইঙ্গিত দেয়, কেন দেশে কোরবানির গরুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের খামারি কুদ্দুস মোল্লার অভিযোগ, দাম বাড়ে শহরে-বন্দরে, গ্রামে খামারি তা পান না, কারণ গরু শেষ পর্যন্ত বেপারিদের কাছেই বিক্রি করতে হয়। তার বক্তব্য, মাঝখানের এই ব্যবসায়ীরাই দাম নির্ধারণ করেন, ফলে খামারির হাতে দর-কষাকষির সুযোগ কম থাকে। এবার তাই তিনি নিজেই গরু হাটে তোলার পরিকল্পনা করছেন এবং মনে মনে ঠিক করেছেন, প্রত্যাশিত দাম না পেলে গরু বিক্রি করবেন না। প্রান্তিক খামারিরা বলছেন, বছরের পর বছর এভাবে দাম না পেলে গরু পালনে তাদের আগ্রহ কমে যাওয়া স্বাভাবিক।
কমে যাওয়ার কারণ: মূল্যস্ফীতি ও ছাগলের দিকে ঝোঁক
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল কোরবানির গরু কমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দেখছেন: কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বাড়ায় গরুর দাম বেড়ে যাওয়া, এবং খরচ বাঁচাতে গরুর বদলে ছাগল-ভেড়া কোরবানির প্রবণতা বৃদ্ধি। তার কথায়, “মূল্যস্ফীতি নয় শতাংশের উপরেও চলে যাচ্ছে। ফলে বিশেষত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অনেকেই গরু কিনতে এক লাখ বা তার বেশি টাকা খরচ না করে আট হাজার বা দশ হাজার টাকায় ছাগল কিনছেন।” তার মতে, আর্থিক দুর্বলতাই এখন কোরবানির গরু কমে যাওয়ার মূল কারণ।
বাজারের এই পরিবর্তনের প্রতিফলন খামার পর্যায়েও দেখা যাচ্ছে। কেরানিগঞ্জের প্রায় দুইশ গরুর একটি খামারের ম্যানেজার মো. কবির জানান, এবারও ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি। তিনি বলেন, খাদ্য, শ্রমিক ও বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের বছরের তুলনায় এবার প্রতিটি গরুতে দাম পড়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেশি, আর বড় গরুর ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি আরও বেশি। অর্থাৎ এক দিকে দাম বাড়ছে, অন্য দিকে ক্রেতারা ঝুঁকছেন ছোট পশু কিংবা ছাগলের দিকে, যা প্রান্তিক খামারির লাভের পরিসর আরও সংকুচিত করছে।

সরবরাহে ঘাটতি নেই, বলছে অধিদপ্তর
কোরবানির গরু কমলেও সরবরাহের দিক থেকে ঘাটতির কোনো শঙ্কা নেই বলে জানায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। তাদের হিসাবে এবার কোরবানির জন্য সারাদেশে খামারিরা প্রায় ৫৭ লাখ গরু ও মহিষ প্রস্তুত করেছেন, যা গত বছরের ৪৬ লাখ গরু কোরবানির চেয়ে প্রায় ১১ লাখ বেশি। অর্থাৎ চাহিদা কমলেও দেশের ভেতরে প্রস্তুত পশুর সংখ্যা উল্টো বেড়েছে, যা সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে একটি স্পষ্ট ফারাক তৈরি করেছে।
মে মাসের শুরুতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু আছে এক কোটি ২৩ লাখ, আর কোরবানি হতে পারে প্রায় এক কোটি এক লাখ; ফলে সোয়া ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। মন্ত্রীর ভাষ্যমতে, দেশের চাহিদা মেটাতে এবার কোনো পশু আমদানির প্রয়োজন নেই। সরকারি এই হিসাব গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায়ই দেশকে কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করে, যদিও খামারিরা বলছেন, উদ্বৃত্ত সরবরাহ তাদের জন্য স্বস্তির বদলে দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।
অবিক্রীত পশুর লোকসান নিয়ে বিতর্ক
চাহিদার চেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত থাকলে অবিক্রীত গরুর ক্ষতি খামারি কীভাবে পোষাবেন, এই প্রশ্নে অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) মো. শরীফুল হকের যুক্তি, বছরে যত গরু জবাই হয় তার অর্ধেক কোরবানিতে আর বাকি অর্ধেক সারা বছর বিয়ে ও নানা অনুষ্ঠানে; তাই ঈদে বিক্রি না হলেও বছরের অন্য সময়ে এসব পশু বিক্রি হয়ে যায় বলে লোকসানের সুযোগ নেই। কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে কোরবানি দেশের গরু-বাজারের একটি বড় উপলক্ষ হলেও একমাত্র উপলক্ষ নয়।
খামারিরা অবশ্য এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন। তারা বলছেন, কোরবানিকে লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট ওজনে মোটাতাজা করা একটি গরু পরে মাংসের দামে বিক্রি করলে সারা বছরের খাদ্য খরচ আর পরিশ্রম ‘উসুল হয় না’। তাদের বক্তব্য, ঈদের কয়েক দিনের বাজারই এই পশুর জন্য সবচেয়ে ভালো দাম পাওয়ার সময়, আর সেই সময়ে বিক্রি না হলে লোকসান অনিবার্য। খামার খাতের জন্য এই প্রতিবেদনের বার্তা স্পষ্ট: ক্রেতাদের চাহিদা ছোট গরুর দিকে সরছে, আর দাম নির্ধারণে বেপারি-নির্ভরতা কমানোই প্রান্তিক খামারির টিকে থাকার শর্ত হয়ে উঠছে।
কোরবানি কী, কীভাবে পশু নির্বাচিত হয়
ঈদুল আজহা মুসলিমদের দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসবের একটি এবং এটি হিজরি বর্ষের জিলহজ মাসের ১০ তারিখে পড়ে। উৎসবের তিন দিন সামর্থ্যবান পরিবারগুলো অনুমোদিত পশু কোরবানি করে এবং মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করে; প্রচলিত রীতিতে মাংসের এক ভাগ পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-প্রতিবেশীর জন্য এবং এক ভাগ দরিদ্রদের জন্য রাখা হয়। বাংলাদেশে কোরবানির পশু মূলত গরু, সঙ্গে ছাগল, মহিষ ও ভেড়া। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী একটি ছাগল বা ভেড়া এক ভাগ হিসেবে গণ্য হয়, আর একটি গরু, মহিষ বা উট সর্বোচ্চ সাতজনে ভাগ করে কোরবানি করা যায়, যেখানে প্রত্যেকে সমান অংশ পান। খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই ভাগে কোরবানির প্রবণতাই এখন বাড়ছে বলে অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন।
কোরবানির পশুকে কিছু পুরোনো শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রচলিত রীতিতে একটি গরু বা মহিষের বয়স হতে হয় অন্তত দুই বছর এবং একটি ছাগল বা ভেড়ার অন্তত এক বছর; পশুটিকে সুস্থ হতে হয় এবং খোঁড়া, অন্ধ বা অতিরিক্ত শীর্ণতার মতো বড় কোনো ত্রুটিমুক্ত হতে হয়। মূলত এ কারণেই খামারিরা ঠিক এই উৎসবকে লক্ষ্য করে গরু পালেন ও মোটাতাজা করেন, যাতে হাটের ওই কয়েক দিনের জন্য একটি সুস্থ ও ভালোভাবে বেড়ে ওঠা পশু প্রস্তুত থাকে। নির্দিষ্ট একটি ওজনে এই সময়ের জন্য তৈরি করা পশু পরে সহজে ধরে রাখা বা অন্যত্র বিক্রি করা কঠিন; আর সে কারণেই সঠিক সময়ে সঠিক দামে বিক্রি না হওয়ার ধাক্কাটা প্রান্তিক খামারির জন্য এত বড় হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ অর্থনীতি
কোরবানির এই বাজারের পেছনে রয়েছে এমন একটি খাত, যা ধীরে ধীরে গ্রামীণ বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৩-২৪’ অনুযায়ী, দেশে গরুর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ, ছাগল প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ, ভেড়া প্রায় ৩৯ লাখ এবং মহিষ প্রায় ১৫ লাখ। ওই অর্থবছরে মাংস উৎপাদন দাঁড়ায় ৯২ দশমিক ২৫ লাখ টন, যা আগের বছরের ৮৭ দশমিক ১০ লাখ টনের চেয়ে বেশি; আর দুধ উৎপাদন হয় ১৫০ দশমিক ৪৪ লাখ টন। অধিদপ্তরের হিসাবে ওই অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপির ১৬ শতাংশের বেশি জোগান দিয়েছে, আর খাতটির প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।
এই খাতের পেছনে রয়েছে সরকারি কিছু বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ঢাকার কাছে সাভারে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যা গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও হাঁস-মুরগি নিয়ে গবেষণা করে এবং ১৯৮৪ সালের একটি অধ্যাদেশের আওতায় গড়ে ওঠে। ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি, যেখান থেকে এই খাতের প্রয়োজনীয় কৃষি অর্থনীতিবিদ ও পশুচিকিৎসক তৈরি হন; এই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক। কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, খাতটির পেছনের গবেষণা, জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কারণেই এক সময় সীমান্তের ওপার থেকে আসা গরুর জায়গা ধীরে ধীরে দেশের খামারগুলো নিতে পেরেছে।
এই উৎপাদন বৃদ্ধির কারণেই দেশ এখন কোরবানির পুরো চাহিদা নিজের খামার থেকেই মেটাতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানান। এক সময় প্রতিবেশী ভারত থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে আসা গরু ঈদের চাহিদার একটি অংশ পূরণ করত, কিন্তু সেই সরবরাহ কমে যাওয়ার পর সরকার ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেশে পশু পালনে উৎসাহ দেয়; ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর্মকর্তারা প্রতি বছর চাহিদার চেয়ে বাড়তি পশুর কথা জানাতে থাকেন। ২০২৬ সালের হিসাবও সেই ধারাই অনুসরণ করেছে, যেখানে এক কোটি এক লাখের মতো চাহিদার বিপরীতে এক কোটি ২৩ লাখের বেশি পশু প্রস্তুত ছিল। তবে এই উদ্বৃত্ত সরবরাহ খামারিদের জন্য দুই ধারের তলোয়ার; কারণ ক্রেতারা হাত গুটিয়ে নিলে সেই উদ্বৃত্তই অবিক্রীত পশুর স্তূপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর আরও জানায়, বাংলাদেশ এখন মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং প্রাণিসম্পদ দেশের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস, পাশাপাশি গ্রামীণ আয় ও কর্মসংস্থানেরও বড় ভিত্তি। লাখ লাখ ক্ষুদ্র খামারির কাছে কয়েকটি পশু পালা একদিকে সঞ্চয়, অন্যদিকে দুঃসময়ের ভরসা; আর এ কারণেই বছরের সবচেয়ে বড় বিক্রির এই উপলক্ষে দাম না পাওয়ার প্রভাব খামারের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত গ্রামীণ অর্থনীতিতে পড়ে। শেখ ফরিদ বা কুদ্দুস মোল্লার মতো ছোট খামারিরা তাই শুধু নিজেদের লোকসানের কথা বলছেন না, একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিচ্ছেন বৃহত্তর একটি খাতের ভারসাম্যের দিকেও।

পশুর হাট, বেপারি ও খামারির টিকে থাকা
বছরের কোরবানিযোগ্য পশুর বড় অংশই ছোট ও মাঝারি খামারে এবং গ্রামীণ পরিবারে পালিত হয়, প্রায়ই কয়েকটি করে, আর একটি মাত্র বিক্রির লক্ষ্যে মাসের পর মাস ধরে মোটাতাজা করা হয়। ঈদের আগের সপ্তাহগুলোতে এসব পশু তোলা হয় কোরবানির হাটে, অর্থাৎ শহর-নগরে বসা অস্থায়ী ও স্থায়ী পশুর হাটে, যার সবচেয়ে বড়গুলো ঢাকায়। মৌসুমি ব্যবসায়ী, যাদের বলা হয় বেপারি, গ্রাম ও উত্তরাঞ্চল থেকে পশু কিনে বড় শহরের হাটে আনেন এবং হাট চালু থাকা কয়েক দিনের মধ্যেই বিক্রির আশা করেন। কুদ্দুস মোল্লার মতো খামারিদের অভিযোগ এই বেপারি-নির্ভরতা নিয়েই, কারণ দর-কষাকষির বড় অংশ তাদের হাতেই থাকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অনলাইন বা ডিজিটাল পশুর হাটকেও উৎসাহ দিয়েছে, যেখানে ছবি ও ওজন দেখে পশু কেনাবেচা হয়; এতে খামারিরা সরাসরি ক্রেতার কাছে পশু বিক্রির সুযোগ পান। তবে বেচাকেনার মূল চাপ এখনো সরাসরি হাটেই। পুরো ব্যবসাটি যেহেতু অল্প কয়েক দিনের একটি সংক্ষিপ্ত সময়কে ঘিরে গড়ে ওঠে, তাই সময়মতো বিক্রিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; এই কয়েক দিনে বিক্রি না হলে পশুকে কম খরচে ধরে রাখা যায় না এবং তার ওজন ও দাম দুটোই পড়তে থাকে।
অস্থায়ী এই কোরবানির হাটগুলোও নিজেই একেকটি ব্যবসা। ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশন প্রতিটি হাট পরিচালনার অধিকার ইজারা দেয়, আর ক্রেতারা প্রতিটি পশুর জন্য ইজারাদারকে একটি নির্দিষ্ট হারে হাসিল বা বাজার মাশুল দেন। পশু শহরে আনার পরিবহন খরচ, হাট চলাকালীন কয়েক দিন সেগুলোকে খাওয়ানো-পানি দেওয়ার খরচ এবং হাসিল; সবকিছুই নির্ভর করে দ্রুত বিক্রির আশার ওপর। পশু অবিক্রীত থেকে গেলে পালন খরচের ওপর এসব বাড়তি খরচও শেষ পর্যন্ত বেপারি ও খামারিদের ঘাড়ে চাপে।
খামারে গরু মোটাতাজা করার খরচের বড় অংশই খাদ্য। দেশের গরু সাধারণত খড়, কাঁচা ঘাস ও সবুজ চারার পাশাপাশি চালের কুঁড়া, গমের ভুসি, ভুট্টা, খেসারি-মসুরের ভুসি ও তেলবীজের খৈল দিয়ে তৈরি দানাদার খাদ্য খায়, যার অনেক উপাদান আমদানি করতে হয়। বিশ্ববাজারে দানা ও খৈলের দাম বাড়ায় এবং টাকার মান কমায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গো-খাদ্যের খরচ বেড়েছে বলে খামারিরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন; খাদ্যের পাশাপাশি শ্রমিক ও বিদ্যুতের খরচও বেড়েছে। এক বছর ধরে এই বাড়তি খরচে গরু মোটাতাজা করার পর কোরবানির হাটে সঠিক দাম না পেলে প্রত্যাশিত লাভের বদলে খামারির ঘাড়ে চাপে লোকসান।
গ্রামীণ পরিবারগুলোর পাশাপাশি গত এক দশকে দেশে গড়ে উঠেছে প্রচুর বাণিজ্যিক গরু মোটাতাজাকরণ ও ডেইরি খামার, যার অনেকটি ঢাকার আশপাশে ও উত্তরাঞ্চলে। কেরানিগঞ্জের দুইশ গরুর খামারের মতো এসব বড় খামারই সবচেয়ে বড় লোকসানে পড়ে, যখন বেশি খরচে ভালোভাবে মোটাতাজা করা একটি পশু সঠিক দামে বিক্রি হয় না। এ কারণেই খামারি ও অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে পশুখাদ্য ও খামার পরিচালনার খরচের বৃদ্ধিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে আসছেন, যাতে ছোট ও মাঝারি খামারিরা কোরবানির পশু পালনে নিরুৎসাহিত না হন।
গ্রামের অনেক পরিবারের কাছে একটি কোরবানির পশু যেন চার পায়ে দাঁড়ানো সারাবছরের সঞ্চয়। একটি পরিবার একটি বাছুর বা অল্প বয়সী ষাঁড় কিনে মাসের পর মাস খড়, ঘাস ও কেনা দানাদার খাদ্য খাইয়ে বড় করে, আর ঈদের একটিমাত্র বিক্রিই হয় সেই সব খরচ ও পরিশ্রমের প্রতিদান। শেখ ফরিদ বা কুদ্দুস মোল্লার মতো খামারিদের কথায় তাই ফুটে ওঠে একটিই উদ্বেগ: বছরের পর বছর যদি সেই প্রতিদান না মেলে, তবে কোরবানির গরু পালনে প্রান্তিক খামারির আগ্রহ আরও কমবে, আর তাতে দীর্ঘমেয়াদে চাপে পড়বে সেই খাতটিই, যার হাত ধরে দেশ কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা; প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৩-২৪); মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়; বাংলাপিডিয়া।





মন্তব্য
(০)