বাংলাদেশে কোরবানির ঈদে গরুর সংখ্যা বছর বছর কমছে, আর ছোট খামারিরা বলছেন খরচ তুলে দাম পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে ২০১৯ সালে কোরবানি হওয়া গরুর সংখ্যা ছিল ৫৬ লাখ ৫৯ হাজার; ২০২৫ সালে সংখ্যাটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার — কোভিডের কয়েক বছর পরও মহামারি-পূর্ব পর্যায়ের চেয়ে ১০ লাখ কম।
অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার গরু কোরবানি হয়েছিল, ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয় ৫৩ লাখ ৯১ হাজার এবং ২০১৯ সালে ৫৬ লাখ ৫৯ হাজার। এরপর ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় সংখ্যাটি নেমে আসে ৫০ লাখে, ২০২১ সালে ৪০ লাখে — দুই বছরে প্রায় ১৬ লাখের পতন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকলে ২০২২ সালে ৪৫ লাখ ৬৫ হাজার, ২০২৩ সালে ৪৫ লাখ ৮১ হাজার এবং ২০২৪ সালে ৪৭ লাখ ৬৬ হাজারে ওঠে; কিন্তু ২০২৫ সালে আবার কমে ৪৬ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়ায়।
ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের কৃষক শেখ ফরিদ গত বছর চারটি গরু পালন করে সবকটি বিক্রি করলেও তার ভাষায় যথাযথ দাম পাননি; এবার ব্যাংকঋণে একটি মাত্র গরু কিনেছেন। তিন মণ ওজনের গরুটির পেছনে সব মিলিয়ে খরচ পড়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা, অথচ ক্রেতারা দাম বলছেন এক লাখ। সাতটি গরু রাখার গোয়ালে এখন একটি — এবার দাম না পেলে খামার আর রাখবেন না বলে জানান তিনি। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল কমে যাওয়ার তিনটি কারণ দেখছেন: কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতায় ক্রয়ক্ষমতা কমা, উৎপাদন খরচ বাড়ায় গরুর দাম বৃদ্ধি, আর খরচ বাঁচাতে গরুর বদলে ছাগল-ভেড়া কোরবানির প্রবণতা।
অধ্যাপক মণ্ডলের কথায়, "মূল্যস্ফীতি নয় শতাংশের উপরেও চলে যাচ্ছে। ফলে বিশেষত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অনেকেই গরু কিনতে এক লাখ বা তার বেশি টাকা খরচ না করে আট হাজার বা দশ হাজার টাকায় ছাগল কিনছে।" কেরানিগঞ্জের প্রায় দুইশ গরুর একটি খামারের ম্যানেজার মো. কবির জানাচ্ছেন, এবারও ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি, আর খাদ্য, শ্রমিক ও বিদ্যুতের খরচে আগের বছরের তুলনায় গরুপ্রতি দাম ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেড়েছে; বড় গরুতে বৃদ্ধি আরও বেশি।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের খামারি কুদ্দুস মোল্লার অভিযোগ, দাম বাড়ে শহরে-বন্দরে, গ্রামে খামারি তা পান না, কারণ গরু বেপারিদের কাছেই বিক্রি করতে হয়। এবার তিনি নিজেই গরু হাটে তোলার পরিকল্পনা করছেন এবং দাম না পেলে বিক্রি করবেন না বলে ঠিক করেছেন।
সরবরাহের দিক থেকে ঘাটতির শঙ্কা নেই বলে জানাচ্ছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। তাদের হিসাবে এবার কোরবানির জন্য সারাদেশে খামারিরা প্রায় ৫৭ লাখ গরু ও মহিষ প্রস্তুত করেছেন — গত বছরের ৪৬ লাখ কোরবানির চেয়ে প্রায় ১১ লাখ বেশি। মে মাসের শুরুতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু আছে এক কোটি ২৩ লাখ, কোরবানি হতে পারে এক কোটি এক লাখ, ফলে সোয়া ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
অবিক্রিত গরুর ক্ষতি কীভাবে পোষাবে, এই প্রশ্নে অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) মো. শরীফুল হকের যুক্তি, বছরে যত গরু জবাই হয় তার অর্ধেক কোরবানিতে, বাকি অর্ধেক সারা বছর বিয়ে ও নানা অনুষ্ঠানে — তাই ঈদে বিক্রি না হলেও লোকসানের সুযোগ নেই। খামারিরা অবশ্য বলছেন, মাংসের দামে গরু বেচলে সারা বছরের খাদ্য খরচ আর পরিশ্রম 'উসুল হয় না'। খামার খাতের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট: চাহিদা ছোট গরুর দিকে সরছে, আর দাম নির্ধারণে বেপারি-নির্ভরতা কমানোই প্রান্তিক খামারির টিকে থাকার শর্ত।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)