'পৌষের শীত মোষের গায়, মাঘের শীতে বাঘ পালায়' প্রবাদের দেশে এবারের পৌষের মাঝামাঝিতেই শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত। ডিসেম্বরের শেষে টানা কয়েক দিন সূর্যের দেখা মেলেনি, বিশেষ করে ২৯শে ডিসেম্বর চারদিক ছিল ঘন কুয়াশায় ঢাকা; নাকে-মুখে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো অনুভূতিকে কেউ কেউ তুষারপাত ভেবেছেন। কিন্তু আবহাওয়ার ইতিহাস বলছে, এই অঞ্চল এর আগে আরও হাড়কাঁপানো শীত দেখেছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৪৮টি স্টেশনের রেকর্ড ১৯৪৭ সাল থেকে সংরক্ষিত। সেই হিসাবে দেশের তাপমাত্রা একাধিকবার তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমেছে। ১৯৬৪ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি, আর ১৯৬৮ সালের চৌঠা ফেব্রুয়ারি সেখানেই ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি রেকর্ড হয়। ঠিক ৫০ বছর পর, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়, যা এখনও পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। সেই বছরই রংপুরের সৈয়দপুরে ২ দশমিক ৯, নীলফামারীর ডিমলায় ৩, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৩ দশমিক ১ ও দিনাজপুরে ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি ছিল। এর আগে ২০১৩ সালে রংপুর, দিনাজপুর ও সৈয়দপুরে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৫, ৩ দশমিক ২ ও ৩ ডিগ্রি, এবং ২০০৩ সালে রাজশাহীতে ৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি রেকর্ড হয়েছিল।
উত্তরাঞ্চলেই শীত বেশি, কারণ সেটিই শৈত্যপ্রবাহের প্রবেশদ্বার। আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদের ব্যাখ্যায় হিমালয়ের বাধায় উত্তর দিক থেকে সরাসরি বাতাস ঢুকতে পারে না; দিল্লি, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, কাশ্মীর ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ঠান্ডা বাতাস রাজশাহী, যশোর ও কুষ্টিয়া বেল্ট ধরে বাংলাদেশে ঢোকে, আর এই পথে উত্তরাঞ্চল প্রথমে পড়ে। সেখানে ঘন কুয়াশা সূর্যের আলো আটকায়, আর বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ থেকে রাতে তাপ দ্রুত বেরিয়ে যায়।
যে বছরগুলোতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, তার পেছনে টানা কুয়াশা, শক্তিশালী শৈত্যপ্রবাহ, রাতের পরিষ্কার আকাশ বা উপরের জেট উইন্ড নিচে নেমে আসার মতো কারণ থাকতে পারে। মি. রশিদ অবশ্য সতর্ক করেন, তখন স্টেশন কম ছিল এবং অনেক জায়গায় ম্যানুয়াল থার্মোমিটার, তাই পুরোনো রেকর্ডকে একেবারে নির্ভুল ধরা যাবে না। হিমালয়ের পাদদেশে উচ্চচাপ বলয় তৈরি হলে হিমেল বাতাস এসে শীত বাড়ায়, আর জেট স্ট্রিম নিচে নামলে ঠান্ডার অনুভূতি বেড়ে যায়।
শীতের তীব্র অনুভূতির মূল কারণ ভারী কুয়াশা, যা দীর্ঘ সময় থাকলে মাটি গরম হতে পারে না। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, "কুয়াশা কেটে গেলে ঠাণ্ডার অনুভূতি কমে। আর কুয়াশা কাটার প্রধান উপায় হলো বৃষ্টি হওয়া এবং বাতাসের গতিবেগ বাড়া। বাতাসের গতি ঘণ্টায় আট থেকে ১৫ কিলোমিটারের বেশি হলে কুয়াশা কেটে যায়।" তার জন্য বঙ্গোপসাগরে উচ্চচাপ বলয় ও পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশ সক্রিয় থাকা দরকার। মি. রশিদের পর্যবেক্ষণ, ২৯শে ডিসেম্বর দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি, যা তিনি ২০ বছরে দেখেননি, এবং এটি এখন প্রতি বছর ঘটছে।
এই ১০টি সর্বনিম্ন রেকর্ড কোনো নির্দিষ্ট বিরতিতে হয়নি, কখনও চার বছর, কখনও ৩৫ বছরের ব্যবধানে; তাই একে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন বলা যায় না বলে মি. রশিদের মত। তবে তাদের বিশ্লেষণে শীতকাল ছোট হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৮৯৫ থেকে ২০০০ সালের উপাত্ত নিয়ে কেনেথ কংকেলের গবেষণায় দেখা গেছে, তুষারপাত ১০০ বছর আগের তুলনায় প্রায় এক মাস পরে শুরু হচ্ছে; ১৯৭১-৮০-এর তুলনায় ২০০৭-১৬ সালে এক সপ্তাহ পিছিয়েছে, আর ১৯১৬-এর তুলনায় ২০১৬-র শীতকাল এক মাসের বেশি ছোট। ২০০০ সালের পর বাংলাদেশে ঘন কুয়াশা বাড়ার পেছনে দূষণকে দায়ী করেন মি. রশিদ: ধোঁয়া-ধুলার স্মগ ও কুয়াশা মিলে নিচু স্তরে 'মিস্ট' তৈরি হয়, যা গায়ে পড়লে বৃষ্টি বা তুষারের মতো লাগে।
শীতের দৈর্ঘ্য ও কুয়াশার ধরন বদলে যাওয়া বোরো বীজতলা, আলু ও শীতকালীন সবজির চাষিদের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক; টানা কুয়াশা ও কম রোদ ফসলের রোগবালাই বাড়ায়, আর ছোট শীতকাল রবি মৌসুমের হিসাব বদলে দেয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)