সুন্দরবনের সীমানা থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকা ১৯৯৯ সালে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়, যেখানে শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনা আইনত নিষিদ্ধ। অথচ সাত-আট বছরে বনের কোলঘেঁষে খুলনার দাকোপের ঢাংমারী থেকে মোংলার চিলা, বৈদ্যমারী, চাঁদপাই ও সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত ২১টি রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে; জমি কিনে বা ইজারা নিয়ে নির্মাণ প্রক্রিয়ায় আছে আরও ১০টি। সমকালের অনুসন্ধান বলছে, মালিকদের কেউ পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেননি, জেলা প্রশাসনের নিবন্ধনও নেই কোনোটির।
বিলুপ্তপ্রায় গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিনের অভয়ারণ্য ঢাংমারী খাল ঘিরেই প্রায় ১০টি রিসোর্ট। প্রতিদিন অসংখ্য ট্রলার পর্যটক আনা-নেওয়া করে, রিসোর্টে এসি ও জেনারেটর চলে, ব্যবহৃত পানি ফেলা হয় বনের খালে। ‘ইকো’ নাম দিলেও বেশির ভাগ স্থাপনার ভেতরে কংক্রিট, ওপরে বাঁশ-কাঠ ও গোলপাতা; অনেকগুলো গাছ কেটে ও পুকুর ভরাট করে বানানো। রাতে গানের আসর ও বারবিকিউ চলে, জুন থেকে আগস্টের নিষেধাজ্ঞার সময়েও পর্যটক বনে ঢোকেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান সেন্টমার্টিনের চেয়েও স্পর্শকাতর; এভাবে চললে বন্যপ্রাণী এলাকা ছেড়ে যাবে। খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, অতিরিক্ত শব্দ, আলো ও বর্জ্য বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর, তবে রিসোর্টগুলো বনের সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানা জমিতে হওয়ায় বন বিভাগের তেমন করণীয় নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার সহকারী পরিচালক পারভেজ আহম্মেদ জানান, অনুমোদন ছাড়া ইসিএর ভেতরে রিসোর্ট চালানোয় ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট তাদের সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়। তথ্য অধিকার আইনে আবেদনের জবাবে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, খুলনায় নিবন্ধিত কোনো রিসোর্ট বা কটেজ নেই; সাতটি আবেদন তদন্তাধীন।
২০২৪ সালের এক বেজলাইন সমীক্ষায় যুক্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের শেষে বনের চারপাশে ২০টি কটেজের মাত্র দুটির মালিক স্থানীয়; সেন্টমার্টিন ও বান্দরবানের রিসোর্ট মালিকেরাই এখন সুন্দরবনে বিনিয়োগ করছেন। তবে বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও গ্রামের অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক দিকও আছে বলে তিনি মনে করেন।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, রিসোর্টের আগে ও পরে বনের ওপর প্রভাব নিরূপণ করে নীতিমালা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ দরকার, যাতে সেন্টমার্টিনের ভুল সুন্দরবনে না হয়। নৌযান পর্যটনে যেভাবে নীতিমালা করে পর্যটকের সংখ্যা ও এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, রিসোর্টের ক্ষেত্রেও তেমন নীতিমালার কথা বলছেন পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদনটি সমকালের সরেজমিন অনুসন্ধান।
ছবি: সমকাল
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)