বাংলাদেশে গত এক দশকে বজ্রপাতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৩,৬৫৮। ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হলেও প্রাণহানি থামেনি; সর্বশেষ ২৬শে এপ্রিল দেশের কয়েকটি জেলায় এক দিনে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের বড় অংশই মাঠে কাজ করা কৃষক ও জেলে।
বছরভিত্তিক হিসাবে ২০১৫ সালে মৃত্যু ছিল ২২৬, ২০১৬ সালে ৩৯১, ২০১৭ সালে ৩৮৮, ২০১৮ সালে ৩৫৯, ২০১৯ সালে ৪০১ এবং ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪২৭। এরপর প্রবণতা নিম্নমুখী: ২০২১ সালে ৩৬৩, ২০২২ সালে ৩৩৭, ২০২৩ সালে ৩২২, ২০২৪ সালে ২৭১ এবং ২০২৫ সালে ১৭৩। আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২৮ থেকে ৩০ জন মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১৯-২০ সাল থেকে বজ্রপাতের দুই থেকে চার ঘণ্টা আগে দেওয়া আগাম সতর্কতা, সচেতনতা কার্যক্রম ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ মৃত্যু কমাতে ভূমিকা রেখেছে বলে তার মত, তবে ২০১৫-এর আগের পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় দীর্ঘমেয়াদি তুলনা করা যায় না।
ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সিলেট অঞ্চল, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলা; জেলার জামালগঞ্জ উপজেলাকেই আবহাওয়া অফিস সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে এক দশকে প্রাণহানিও সবচেয়ে বেশি। এর বাইরে নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও বরিশালের খেপুপাড়ায় তুলনামূলক বেশি বজ্রপাত হয়। ২০১৫ সালে ৪৫ জেলায় বজ্রপাত হলেও ২০২৪ সালে তা ৬৪ জেলায় ছড়িয়েছে, অর্থাৎ বিস্তৃতি কমেনি।
সিলেটে বজ্রপাত বেশি হওয়ার তিনটি কারণ ব্যাখ্যা করেন মি. মল্লিক। প্রথমত, অঞ্চলটির বড় বড় হাওর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প তৈরি হয়; দ্বিতীয়ত, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস সিলেটের উত্তর-পূর্বের পাহাড়ে বাধা পেয়ে দ্রুত উপরে উঠে কিউমুলোনিম্বাস বা বজ্রমেঘ তৈরি করে; তৃতীয়ত, উত্তর-পশ্চিমের শুষ্ক গরম বাতাস ও সাগরের আর্দ্র বাতাসের সংঘর্ষ। ভারতের উত্তর-পূর্ব পাহাড়ি অঞ্চল ও হিমালয়ের পাদদেশে তৈরি বজ্রমেঘ পশ্চিমবঙ্গ হয়ে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও যশোরে ঢুকে স্থানীয় জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে আরও শক্তিশালী হয়।
বাংলাদেশের বজ্রঝড়ের ৩৮ শতাংশ হয় মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে, আর ৫১ শতাংশ জুন থেকে সেপ্টেম্বরের বর্ষাকালে। কিন্তু মি. মল্লিকের ভাষায়, "তাণ্ডব, ক্ষয়ক্ষতি, প্রাণহানি বেশি হয় বৈশাখ মাসের বজ্রসহ ঝড়ে।" মার্চ-মে'র এই ঝড়ই স্থানীয়ভাবে কালবৈশাখী; পশ্চিমাঞ্চলে সাধারণত শেষ বিকেল ও সন্ধ্যায়, পূর্বাঞ্চলে সন্ধ্যার পরে আসে। আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদের মতে, এই ঝড় পাঁচ-ছয় ঘণ্টা আগে তৈরি হতে শুরু করে এবং দুই-তিন ঘণ্টা আগে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়। বজ্রমেঘ ভূপৃষ্ঠের তিন কিলোমিটার উপর থেকে ১০-১২ কিলোমিটার পর্যন্ত থাকে, তীব্র হলে ১৮-২০ কিলোমিটার; বজ্রপাতের সময় ঊর্ধ্বাকাশে তাপমাত্রা ওঠে ২৭ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছয় হাজার ডিগ্রি।
মৃত্যুর প্রধান কারণ খোলা জায়গায় থাকা। কৃষক, জেলে ও মাঠের শ্রমিকেরা ঝড়ের সময়ও বাইরে থাকেন, আর অনেক এলাকায় নিরাপদ আশ্রয় নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী বজ্রপাতের সময় ঘরের ভেতরই সবচেয়ে নিরাপদ; খোলা মাঠ, জলাশয় বা উঁচু গাছের নিচ বিপজ্জনক। ধানখেত বা খোলা মাঠে থাকলে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে, কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসতে হবে; বাইরে যেতে হলে রাবারের জুতা পরতে হবে; ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে যাওয়া উচিত নয়, নদী বা সাগরে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ভয় নেই, তাই দ্রুত সরিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)