জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হওয়ার আগেই দেশের বাজারে উঠতে শুরু করেছে সাতক্ষীরার আম। জেলা প্রশাসনের 'ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার' অনুযায়ী মঙ্গলবার ৫ মে থেকে গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ সংগ্রহ শুরু হয়েছে; এরপর আসবে হিমসাগর ও ল্যাংড়া, আর জুনের শুরুতে আম্রপালি। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম পাড়া শুরু হবে ১৫ মে থেকে — অর্থাৎ উত্তরবঙ্গের খ্যাত অঞ্চল থেকে এক সপ্তাহেরও বেশি আগে বাজার ধরছে দক্ষিণ-পশ্চিমের এই উপকূলীয় জেলা।
কলারোয়ার আমচাষি খান নাজমুস সাদাত জানান, এবার ঝড় কম হয়েছে, পোকার সমস্যা কিছুটা ভোগালেও ফলন ভালো; মৌসুমের শুরুতে জাতভেদে মণপ্রতি ১,৯০০ থেকে ২,৪০০ টাকায় আম বিক্রি হয়েছে, তিনি নিজে ১৫ ক্যারেট গোবিন্দভোগ দিয়েছেন ১,৯০০ টাকা মণ দরে। স্থানীয় আম ব্যবসায়ী মোহম্মদ শাহারুল ইসলাম রাজের হিসাবে কয়েক দিনের মধ্যেই সাতক্ষীরার আম দেশের সব প্রান্তে পৌঁছে যাবে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৭০ হাজার মেট্রিক টন এবং রপ্তানির লক্ষ্য অন্তত ১০০ টন। অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে জেলার চার হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১২ হাজার ৩০০ চাষি আম আবাদ করেছেন। এক দশক আগেও সুন্দরবন আর চিংড়ি ঘেরের জেলা হিসেবে পরিচিত সাতক্ষীরা এখন দেশের আম অর্থনীতির নতুন উৎস হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন কৃষি গবেষকরা।
আগে পাকার কারণ ব্যাখ্যা করে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, "প্রতি ডিগ্রি অক্ষাংশ বৃদ্ধির জন্য আমের সংগ্রহকাল তিন দিন পিছিয়ে যায়।" সাতক্ষীরার অবস্থান ২২.৬০ ডিগ্রি অক্ষাংশে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৪.৫৬ ডিগ্রিতে — সেই হিসাবে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংগ্রহ অন্তত ছয়-সাত দিন পরে শুরু হয়, পঞ্চগড়ে আরও পরে। তাপমাত্রাও ভূমিকা রাখে: মুকুল আসার পর ফুটতে ২৫ থেকে ৩০ দিন লাগে, কিন্তু উপকূলের বেশি তাপমাত্রায় মুকুল আগেই ফোটে এবং আম আগে পরিপক্ব হয়। বিশ্বজুড়েই আম উৎপাদনে এই নিয়ম একই বলে জানান তিনি।
কৃষিবিদ সাইফুল ইসলামের মতে মাটির লবণাক্ততাও একটি কারণ — সাতক্ষীরায় লবণের কারণে কেবল আম নয়, ধানের জীবনকালও কিছুটা কম, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ফসল পরিপক্ব হয়। স্বাদে তফাত আছে কি না, এই প্রশ্নে ড. শরফ উদ্দিন বলছেন, একই জাতের আমে সাতক্ষীরা ও রাজশাহী অঞ্চলে 'ঊনিশ-বিশ' ছাড়া বড় পার্থক্য নেই; তবে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ সময় খরা বেশি থাকায় শুষ্ক আবহাওয়ায় আমের আকার কিছুটা বড় হয়। এখনকার বৃষ্টি পরিপক্বতায় সহায়ক হলেও আরও আট-দশ দিন চললে তা ক্ষতিকর হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
সাইফুল ইসলাম যোগ করেন, সাতক্ষীরার হিমসাগর আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরসাপাত একই আম হলেও তাপমাত্রা ও লবণের কারণে সাতক্ষীরার আমে ড্রাই ম্যাটার একটু বেশি থাকায় মিষ্টতা কিছুটা বেশি। কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ও বিষমুক্ত চাষাবাদের ফলে এখানকার আম ইউরোপের চেইন শপেও জায়গা করে নিয়েছে। লবণাক্ত পানিতে চাষাবাদের অনিশ্চয়তায় জেলার অনেক কৃষক এখন আমের দিকে ঝুঁকছেন — আগাম বাজার আর রপ্তানির সুযোগ মিলিয়ে উপকূলের জন্য এটি এক নতুন নগদ ফসল।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)