তালগাছ গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন এবং পরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। তালগাছ বাংলাদেশের সব এলাকায় অযত্ন-অবহেলায় জন্মে। এ গাছ পানি ছাড়াই দীর্ঘদিন বাঁচতে পারে। আবার গাছের গোড়ায় পানি দাঁড়ালেও সহজে মারা যায় না। তালগাছ রাস্তার ধারে, বাড়ির আশেপাশে, জমির আইলে, পুকুরপাড়, রেললাইন ইত্যাদি পরিত্যক্ত স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে জন্মাতে দেখা যায়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করে এ দেশে তাল চাষ হয় না। তালগাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদাভাবে জন্মায়। ফুল না আসা পর্যন্ত স্ত্রী ও পুরুষ গাছ চেনা যায় না। তালগাছের পুরুষ গাছ থেকেই সাধারণত রস সংগ্রহ করা হয়। তবে কোনো কোনো এলাকায় স্ত্রী গাছ থেকেও রস সংগ্রহ করা হয়।
রস সংগ্রহ ও গুড় উৎপাদন
তালগাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য কমপক্ষে ১০-১২ বছর বয়সের সুস্থ গাছ নির্বাচন করা উচিত। যেসব গাছ দেখতে সুস্থ-সবল; সেসব গাছ নির্বাচন করলে বেশি রস আহরণ করা সম্ভব।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
ধারালো দা, মাটির পাত্র বা হাঁড়ি, লোহার বা স্টিলের কড়াই, চুলা, জ্বালানি, হাতা, ছাঁকনী, একটি বাঁশ গিড়াসহ ও দড়ি।
রস সংগ্রহ পদ্ধতি
পুরুষ ও স্ত্রী উভয় গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা যায়। মার্চের শেষ সপ্তাহে (চৈত্রের ২য় সপ্তাহে) পুরুষ তালের পুষ্পমঞ্জরি বড় হয়। নরম পুষ্পমঞ্জরিকে প্রথম ৩ দিন প্রতিদিন আধা ঘণ্টা হাত দিয়ে ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত এক হাতে ধরে অপর হাতের তালুর চাপের মাধ্যমে ওপর থেকে নিচে হালকাভাবে সকালে ও বিকেলে প্রায় ৪৫-৫০ বার হালকাভাবে টানতে হবে। জোরে আঘাত করা যাবে না। পুষ্পমঞ্জরি একটু শক্ত হলে পুষ্পমঞ্জরির দুই পাশে ২টি কঞ্চি বা বাঁশের বাতা দিয়ে ওপর থেকে নিচে ২-৩ দিন সকাল ও বিকেলে ২০-২৫ বার টানতে হবে। এরপর পুষ্পমঞ্জরির শেষ প্রান্তে ধারালো দা দিয়ে সোজা করে কাটতে হবে।
কাটা অংশ দিয়ে মিষ্টি রস পড়তে থাকে। রস সংগ্রহের জন্য মঞ্জরিদণ্ডের কাটা অংশের নিচে হাঁড়ি বেঁধে দিতে হবে। রস ভালো রাখতে হলে প্রতিদিন ৩ বার রস সংগ্রহ করা উচিত। সকাল ৬টা, দুপুর ১২টা ও বিকেল ৬টা। রস সংগ্রহের সময় পুষ্পমঞ্জরি ও হাঁড়ি পাটের চট বা মোটা সুতি কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। একটি পুরুষ তালগাছে ৬-৭টি হাঁড়ি লাগানো যেতে পারে। প্রতিটি হাঁড়িতে ৪-৫ পুস্পমঞ্জরি রেখে বাকিগুলো কেটে ফেলতে হবে। মার্চ থেকে মধ্য জুলাই (আষাঢ় মাস) পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা যায়। পূর্ণবয়স্ক একটি পুরুষ তালগাছ থেকে প্রতিদিন ২৫-৩০ লিটার পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা যায়।
স্ত্রী তালগাছ
মে মাসে ফলের মঞ্জরিদণ্ড বের হলে ধারালো দা দিয়ে কাটতে হয়। এই কাটা অংশ দিয়ে ফোটায় ফোটায় মিষ্টি রস পড়তে থাকে। রস সংগ্রহের জন্য মঞ্জরিদণ্ডের কাটা অংশের নিচে মাটির হাঁড়ি লাগানো হয়।
তালের গুড় উৎপাদন কৌশল
স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তালের গুড় উৎপাদনের জন্য রস সংগ্রহের পর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে রস ছেকে চুলার ওপর বসানো লোহার বা স্টিলের কড়াইতে ঢালা হয়। চুলার ওপর কড়াই বসানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কড়াই ও চুলার মধ্যে কোনো ফাঁক না থাকে। আরও খেয়াল রাখতে হবে যেন চিমনি থেকে ফ্লু গ্যাসের সাথে বের হয়ে যাওয়া ছাই কড়াইয়ের রসের সঙ্গে মিশতে না পারে। রস জ্বাল দেওয়ার প্রথম অবস্থায় রসের উপরিভাগে যে গাদ বা ফেনা ভেসে ওঠে, তা যত দ্রুত সম্ভব ছাঁকনি বা হাতা দিয়ে উঠিয়ে ফেলে দিতে হবে।
গাদ বা ফেনা ওঠাতে দেরি হলে তা রসের সাথে মিশে জটিল অপরিশোধনযোগ্য অবস্থায় চলে যাবে। ফলে গুণগতমান সম্পন্ন গুড় উৎপাদন করা সম্ভব নয়। রস ঘনীভূত হয়ে সিরাপের মতো হলে কড়াইয়ের ফুটন্ত ঘনীভূত রস বা সিরাপ হাতলের সাহায্যে লাগাতারভাবে নাড়াতে হবে এবং খুব দ্রুত চুলার তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। এই অবস্থায় কড়াইয়ের চারধারে কিছু গাদ সৃষ্টি হয়, যা লাগাতারভাবে তুলে ফেলতে হবে। চুলা থেকে গুড় নামানোর সময় নিশ্চিত করতে চাইলে হাতলের সাহায্যে সামান্য গুড় অর্থাৎ এক চিমটি পরিমাণ গুড় ২০০ মিলি ঠান্ডা পানিতে ছেড়ে দিতে হবে। গুড় পানিতে দ্রুত জমাটবদ্ধ হলে বুঝতে হবে চুলা থেকে গুড় নামানোর উপযোগী হয়েছে এবং দ্রুত চুলা থেকে কড়াই নামিয়ে ফেলতে হবে।
তালের চারা উৎপাদন, রস সংগ্রহ, রস বিক্রি, গুড় তৈরি, গুড় পরিবহন, গুড় বাজারজাতকরণ এবং গুড় ব্যবহারের ফলে গ্রামীণ বিরাট জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের দুর্যোগ প্রতিরোধ, খরাপ্রবণ বরেন্দ্র এলাকার পরিবেশ উন্নয়নসহ দেশের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।





মন্তব্য
(০)