রমজান এলেই বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের ইফতার টেবিলে পেঁয়াজু, বেগুনি ও ছোলা-মুড়ির পাশে জায়গা করে নেয় গাঢ় লাল এক শরবত, রূহ আফজা। ১৯০৬ সালে দিল্লিতে যাত্রা শুরু করা এই পানীয়ের বয়স এখন ১২০ বছর; ভারতবর্ষ ভাগ থেকে একাধিক যুদ্ধের সাক্ষী এই ব্র্যান্ড। উর্দু 'রূহ' মানে আত্মা, 'আফজা' মানে যা সতেজ করে; নামের অর্থ তাই 'আত্মাকে সতেজ করে এমন পানীয়'। গত বছর রমজানে বাংলাদেশে ফেসবুকে ট্রেন্ড হয়েছিল, 'ছোটবেলায় মনে করতাম রূহ আফজা শরবত খেলে সওয়াব হয়।'
হেরিটেজ টাইমস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী রূহ আফজা তৈরি করেন ইউনানি চিকিৎসক হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ, পুরনো দিল্লির লাল কুয়ান বাজারে যার ক্লিনিকের নাম ছিল হামদর্দ দাওয়াখানা, যে শব্দের অর্থ দুঃখ-কষ্টের সঙ্গী। সাংবাদিক সানাম মেহেরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এক গরমের দিনে ক্লিনিক থেকে ছড়িয়ে পড়া গোলাপের সুবাসে আকৃষ্ট ভিড়ে সন্ধ্যার আগেই প্রথম ব্যাচ শেষ হয়ে যায়। গরমে অসুস্থ রোগীদের সতেজ করতে তৈরি অ্যালকোহলমুক্ত এই ওষুধি শরবতের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ১৯০৭ সালের দিকে, পরে গাজিয়াবাদের কারখানায় বড় পরিসরে। নামটি নেওয়া পণ্ডিত দয়া শঙ্কর নাসিমের কাব্যগ্রন্থ 'মসনবি গুলজার-ই-নাসিম'-এর রাজকন্যা রূহ আফজার চরিত্র থেকে।
১৯২০ সালের মধ্যে হাতে প্যাক করা বোতলে হাতে সাঁটা লেবেল লাগানো হতো; কাঁচের বোতল ও ঐতিহ্যবাহী লেবেলের নকশা করেন দিল্লির শিল্পী মির্জা নূর আহমদ। ১৯২২ সালে হাকিমের মৃত্যুর পর হামদর্দের দায়িত্ব নেন তার ১৪ বছর বয়সী বড় ছেলে আবদুল হামিদ। ১৯৪৭-এর দেশভাগে আবদুল হামিদ দিল্লিতে থেকে যান, ছোট ছেলে হাকিম মহম্মদ সৈয়দ পাকিস্তানে চলে যান; তৈরি হয় হামদর্দ ইন্ডিয়া ও হামদর্দ পাকিস্তান। ১৯৫৩ ও ১৯৫৬ সালে সম্প্রসারণের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বিক্রয়কেন্দ্র খোলা হয়, আর ১৯৭১-এর পর হামদর্দ পাকিস্তান বাংলাদেশে হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ) বাংলাদেশ নামে কাজ শুরু করে, যেখানে যোগ দিয়ে ইউসূফ হারুণ ভুইঁয়া রূহ আফজার উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেন। মূল রেসিপি আজও গোপন ও প্রায় অপরিবর্তিত।
পানীয়টির প্রতি আবেগের প্রমাণ মেলে বারবার। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় আফগান শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ হিসেবে পাঠানো রূহ আফজার বোতল প্রতিদিন এত লাগছে দেখে কর্মকর্তারা বিস্মিত হন; তদন্তে জানা যায়, আফগানরা পানি বা দুধ না মিশিয়ে সরাসরি পান করছিলেন। ২০১৯ সালে কিছু ভেষজ উপাদান সহজলভ্য না হওয়ায় ভারতের বাজারে রূহ আফজা দুর্লভ হয়ে পড়লে টুইটারে হতাশা ছড়ায়, আর পাকিস্তানি ব্যবহারকারীরা উপহার পাঠানোর প্রস্তাব দেন।
বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। ২০২২ সালে দিল্লি হাই কোর্ট নকল বিক্রির অভিযোগের প্রেক্ষিতে অ্যামাজন ইন্ডিয়াকে পাকিস্তানে তৈরি রূহ আফজা ভারতের তালিকা থেকে সরাতে নির্দেশ দেয়। বাংলাদেশে ২০১৮ সালে অননুমোদিত উপাদানে খাদ্য তৈরি ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের দায়ে ঢাকার একটি বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত রূহ আফজাকে চার লাখ টাকা জরিমানা করে, যেখানে হামদর্দ দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চায়; তবে ২০২২ সালে আপিলে ওই রায় ও জরিমানা বাতিল হয়।
সবাই যে এই লাল শরবতের ভক্ত, তা নয়; চিনির মাত্রা, রঙ ও প্রিজারভেটিভ নিয়ে সমালোচনা আছে, আর অনেকে ঘরোয়া শরবতকেই স্বাস্থ্যকর মনে করেন। কেউ দুধে, কেউ পানিতে মেশান, সেই বিতর্কও চলে সামাজিক মাধ্যমে। তবু ভেষজ ও গোলাপনির্ভর একটি পণ্য কীভাবে তিন দেশের খাদ্যবাজারে এক শতাব্দী টিকে থাকল, তা উপমহাদেশের খাদ্যশিল্পের ইতিহাসে এক বিরল উদাহরণ।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)