বোরো মৌসুমের সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার পরও সরকার চালকল মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দুই লাখ টন চাল কিনছে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে এক লাখ ১৫ হাজার টনের বরাদ্দপত্র দিতে তালিকা হয়েছে। প্রায় ৮৫০ চালকল মালিক বাড়তি চাল বিক্রির আবেদন করেছেন, যার দেড় শতাধিকের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের আধা-সরকারি (ডিও) পত্র যুক্ত। বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্রয়ে লাভ থাকছে চালকলের ঘরে; কৃষক আগেই কম দামে ধান বেচেছেন, আর বাজারে সরবরাহ না বাড়ায় ভোক্তাও স্বস্তি পাচ্ছেন না।
চলতি বোরোতে সরকার পাঁচ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও এক লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্য ধরেছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন ধান, ১২ লাখ ৩৯ হাজার ৪০০ টন সেদ্ধ চাল ও ১ লাখ ৭ হাজার ৬৪৭ টন আতপ চাল—সবই লক্ষ্যমাত্রার বেশি। ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২৩ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৭ টন, যেখানে কার্যকর সংরক্ষণক্ষমতা প্রায় ২২ লাখ ৯৫ হাজার টন; অর্থাৎ সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৪৪ হাজার টন বেশি মজুত থাকা অবস্থাতেই নতুন ক্রয়ের আয়োজন।
এবার সেদ্ধ চালের সংগ্রহমূল্য ছিল কেজিপ্রতি ৪৯ টাকা, ধানের ৩৬ টাকা—২০২৪ সালের ৪৫ ও ৩২ টাকার চেয়ে বেশি। কিন্তু বাজারে ধানের দাম কম থাকায় চালকল মালিকরা কৃষকের কাছ থেকে সস্তায় ধান কিনে মজুত করেন; সরকারকে নির্ধারিত চাল দেওয়ার পরও ধান উদ্বৃত্ত থেকে যায়, যা এখন চাল করে আবার সরকারকেই বিক্রি হচ্ছে। বাজার-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে এতে কেজিপ্রতি তিন থেকে সাত টাকা মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, সংগ্রহনীতির গড়নই এমন যে কৃষকের চেয়ে চালকল মালিক বেশি সুবিধা পান—আর্দ্রতাসহ নানা অজুহাতে গুদামে কৃষকের ধান নেওয়া হয় না, ফলে কৃষক কম দামে চালকলে ধান বেচতে বাধ্য হন। তাঁর মতে, সরকার ধান কেনে সামান্য, চাল কেনে অনেক বেশি; কৃষককে সুবিধা দিতে হলে তার কাছ থেকেই বেশি ধান কিনতে হবে।
উৎপাদন বাড়ায় দামের চাপ পড়েছে আউশেও। নওগাঁর মহাদেবপুরে আউশ ধান এখন মণপ্রতি ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, গত বছর একই সময়ে যা ছিল এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ বছর আউশ উৎপাদনের লক্ষ্য ধরেছে প্রায় ৪০ লাখ টন এবং তা পূরণের আশা করছে।
সরকারি সংগ্রহে কৃষকের অংশগ্রহণও সীমিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে কৃষক পরিবার এক কোটি ৬৮ লাখ ৮১ হাজার ৭৫৭টি, অথচ গুদামে ধান বিক্রির জন্য নিবন্ধিত কৃষক ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৩ জন; নিবন্ধিত চালকল ছয় হাজার ৩০১টি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, আর্দ্রতা, পরিবহন, সংগ্রহকেন্দ্রের দূরত্ব ও অর্থপ্রাপ্তির জটিলতায় কৃষক সরকারি দাম পাওয়ার সুযোগ থাকলেও স্থানীয় বাজারেই ধান বেচেন; ডিজিটাল নিবন্ধন সহজ করা দরকার।
খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, আগে কখনো ধান সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ হতো না, এবারই প্রথম হয়েছে; সুযোগ থাকায় অতিরিক্ত দুই লাখ টন চাল সংগ্রহ চলছে, যাতে আমদানি কমে ও বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচে। তবে চুক্তিবদ্ধ কিছু মিলের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—খাদ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, দৈনিক ছয় টন সক্ষমতার মিলও এখন পাঁচ হাজার টনের বরাদ্দ চাইছে। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে এক যুগের বেশি বন্ধ থাকা চান্দাইকোনার আনোয়ারা সেমি অটো চালকল থেকে এ বছর ১১৯ টন চাল কেনার চুক্তি হয়েছে; একই উপজেলার আরও তিনটি মিল নিয়েও একই অভিযোগ।
সমকালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অবলম্বনে। সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)