বাংলাদেশে তীব্র তাপপ্রবাহের সময় বলতে এপ্রিল-মে বোঝানো হলেও এখন তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে; সেপ্টেম্বরেও দুপুরের রোদে লু হাওয়ার আভাস মেলে, আর অক্টোবর-নভেম্বরে আগের মতো ঠান্ডা পড়ে না। এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, এই ভূখণ্ডে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কবে, কোথায় ছিল এবং তাপমাত্রা বেশি হওয়া মানেই কি গরম বেশি লাগা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বর্তমানে ৪৮টি স্টেশন রয়েছে এবং ১৯৪৭ সাল থেকে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড আছে। সেই রেকর্ডে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৯৭২ সালের ১৮ই মে রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দ্বিতীয় সর্বোচ্চও রাজশাহীতে, ১৯৮০ সালের এপ্রিলে ৪৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি। তৃতীয় ৪৪ ডিগ্রি, ১৯৮৯ সালের এপ্রিলে বগুড়ায়, আর ১৯৭০ সালের মে মাসে ঈশ্বরদীতেও একই তাপমাত্রা। এরপর ১৯৫৮ সালের মে মাসে বগুড়ায় ৪৩ দশমিক ৯, এবং ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি একাধিকবার: ১৯৬৩ সালে যশোরে, ১৯৮৫ সালে রাজশাহীতে ও ২০২৪ সালে যশোরে, সবই এপ্রিলে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে চুয়াডাঙ্গায় ৪৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সাম্প্রতিক দশকগুলোর সর্বোচ্চ।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিকের ব্যাখ্যায় তীব্র তাপ থেকে বাঁচার উপায় দমকা বাতাস ও ঝড়ো হাওয়া; যে বছর কালবৈশাখী কম হয়েছে, সে বছরই তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে, অথবা দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে লু হাওয়া ঢুকেছে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, সমতলের একটি স্টেশন ১৮-২০ কিলোমিটার ও পাহাড়ি স্টেশন ৮-১০ কিলোমিটার এলাকা কাভার করে; গাছপালা কম, ইটভাটা ও কারখানা বেশি এমন জায়গায় স্টেশন না থাকলেও তাপমাত্রা আরও বেশি হতে পারে।
রেকর্ড বারবার রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, বগুড়া ও ঈশ্বরদীতেই হওয়ার কারণ ভৌগোলিক। চুয়াডাঙ্গায় ১৯৯৫ সালের পহেলা মে ৪৩ দশমিক ৫ এবং ২৫শে এপ্রিল ৪৩ ডিগ্রি, ১৯৮৯ সালের চৌঠা মে ৪৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি রেকর্ড হয়েছিল। আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হকের ব্যাখ্যায় তিনটি কারণ: চুয়াডাঙ্গা, যশোর, মেহেরপুর ও খুলনা অঞ্চল এবং পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ সমভূমি দিয়ে পরিবহন পদ্ধতিতে তাপ সরাসরি প্রবাহিত হয়; দক্ষিণ-পশ্চিম দিয়ে বঙ্গোপসাগরের জলীয় বাষ্প এই অঞ্চলে ঢোকে; আর সূর্যের উত্তরায়নে ২১শে মার্চ থেকে ২১শে জুন পর্যন্ত ২৩ ডিগ্রি অক্ষরেখার আশপাশে, যেখানে বাংলাদেশ ২২ থেকে ২৬ ডিগ্রির মধ্যে, সূর্যের সর্বোচ্চ কিরণ পড়ে।
তাপমাত্রা বেশি হওয়া আর গরম বেশি লাগা এক কথা নয়। মি. মল্লিকের মতে গরমের অনুভূতিতে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর বাতাসের বেগ ও জলীয় বাষ্প। ২০২৪ সালে ৭৬ বছরের রেকর্ড ভেঙে পহেলা এপ্রিল থেকে পাঁচই মে টানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহ চললেও চুয়াডাঙ্গা বা রাজশাহীতে অস্বস্তি তত ছিল না, কারণ জলীয় বাষ্প কম ছিল ও বাতাস ছিল; অন্যদিকে পটুয়াখালী, বরিশাল, বরগুনা ও কক্সবাজারে তাপমাত্রা কম হলেও সাগরের জলীয় বাষ্পে গরমের অনুভূতি প্রচণ্ড। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ১০ ডিগ্রির নিচে নামলে গরম বেশি, পাঁচ ডিগ্রি হলে নাভিশ্বাস, আর পাঁচের নিচে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি। মেঘমুক্ত আকাশে ৮-১০ ঘণ্টা রোদ পড়লেও গরম বাড়ে, যা থেকে 'মেঘ কাটা রোদে গরম বেশি' প্রবাদ।
ময়মনসিংহ ও সিলেটে গরম সহনীয় থাকে হাওর ও পাহাড়ের কারণে: সাগরের জলীয় বাষ্প পাহাড়ে বাধা পেয়ে মেঘ তৈরি করে ও বৃষ্টি নামায়, আর পাহাড়ের বাঁকে গরম ও ঠান্ডা বাতাস মিশে তাপমাত্রা কমায়। চট্টগ্রাম ও সিলেটে নিয়মিত বৃষ্টি ও বনায়নও ভূমিকা রাখে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞায় ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি মৃদু, ৩৮ থেকে ৪০ মাঝারি এবং ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি তীব্র তাপপ্রবাহ; ৩৫ ডিগ্রির ওপরে শরীরের নিজেকে ঠান্ডা করার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, যা মাঠে কাজ করা কৃষিশ্রমিকের জন্য সরাসরি ঝুঁকি। চলতি বছর তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে বলে আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস, তবে এপ্রিল স্বাভাবিক থাকবে। মি. মল্লিকের ভাষায়, "২০২২ থেকে ২০২৭ সাল বিশ্বব্যাপীই উষ্ণ থাকবে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়," তবে কালবৈশাখী বেশি হওয়ায় এ বছরের তীব্রতা ২০২৪-কে ছাড়াবে না। এপ্রিল থেকে জুনে ছয় থেকে আটটি তাপপ্রবাহ হতে পারে, যার তিন-চারটি তীব্র।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)