ঘাস আর পাথর ছাড়া প্রায় কিছুই ছিল না জায়গাটিতে। সেখানেই ১২ হাজার টন কমলার খোসা ও পাল্প ফেলে রেখেছিল একটি জুস কারখানা। ১৬ বছর পর গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখলেন, ঘন গাছপালা ও লতায় ঢেকে গেছে জমি—এতটাই যে রাস্তার পাশের প্রায় ৭ ফুট লম্বা উজ্জ্বল হলুদ সাইনবোর্ডটিও গাছের আড়ালে চলে গেছে। ঘটনাটি মধ্য আমেরিকার কোস্টারিকার একটি জাতীয় উদ্যানের।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি কোস্টারিকার উত্তর সীমান্তে কমলার জুস কারখানা চালু করে ডেল অরো নামের একটি প্রতিষ্ঠান। গুয়ানাকাস্তে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কর্মরত পরিবেশবিদ ড্যানিয়েল জানজেন ও উইনি হলভাক্স তাদের প্রস্তাব দেন: প্রতিষ্ঠানটি সংরক্ষিত বনের জন্য কিছু বনভূমি দান করলে জাতীয় উদ্যানের ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে কমলার খোসা ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য ফেলার সুযোগ পাবে, যা ধীরে ধীরে পচে মাটিতে মিশে যাবে। ১৯৯৭ সালের চুক্তির পর প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন খোসা ও পাল্প ট্রাকে করে অনুর্বর জমিতে ফেলা হয়।
বছর না ঘুরতেই আইনি জটিলতা শুরু হয়। ডেল অরোর প্রতিদ্বন্দ্বী টিকোফ্রুট অভিযোগ করে, জাতীয় উদ্যানে বিপুল বর্জ্য ফেলে জায়গাটি নষ্ট করা হয়েছে; মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় এবং আদালত টিকোফ্রুটের পক্ষে রায় দেন। এরপর প্রায় ১৫ বছর জায়গাটির কথা কেউ মনে রাখেনি। ২০১৩ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টিমোথি ট্রয়ের জানজেনের সঙ্গে গবেষণার বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পুরোনো জায়গাটির খোঁজ পান।
গবেষকেরা কমলার খোসা ফেলা জমি এবং রাস্তার অপর পাশের একই রকম জমির তুলনা করেন—গাছের সংখ্যা, আকার ও প্রজাতি মাপেন, মাটির নমুনা পরীক্ষা করেন। ফলাফল স্পষ্ট: খোসা ফেলা তিন হেক্টরে গাছের বায়োমাস বেড়েছে ১৭৬ শতাংশ; মাটি বেশি পুষ্টিসমৃদ্ধ, গাছের প্রজাতি বেশি, বনের ছাউনিও বেশি ঘন। যে বর্জ্য একসময় ফেলনা ছিল, তা-ই অনুর্বর জমিকে আবার সবুজ করে তুলেছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয় ‘রেস্টোরেশন ইকোলজি’ সাময়িকীতে। অন্যতম লেখক টিমোথি ট্রয়েরের মতে, কৃষি ও খাদ্যশিল্পের বর্জ্য ব্যবহার করে বন পুনরুদ্ধারের এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই; খাদ্য তৈরির যে অংশটুকু আমাদের কাছে অপ্রয়োজনীয়, প্রকৃতির কাছে তা কখনো কখনো মূল্যবান সম্পদ। প্রিন্সটনের পরিবেশবিদ ডেভিড উইলকোভের ভাষায়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পরিবেশকর্মীরা একসঙ্গে কাজ করলে শিল্পের তৈরি পরিবেশগত সমস্যার কিছুটা সমাধান সম্ভব।
বাংলাদেশের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিশিল্পের জৈব বর্জ্য কীভাবে মাটির উর্বরতা ফেরাতে কাজে লাগানো যায়—কোস্টারিকার এই পরীক্ষা সেই প্রশ্নের একটি বাস্তব উত্তর।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)