গত কয়েক দিনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিতে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরপ্রধান জেলা নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ জমি পানিতে তলিয়ে গেছে — ঠিক যখন বোরো ধান কাটার সময়। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বুধবার দুপুরের সতর্কবার্তায় জানায়, নেত্রকোনায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৩ মিলিমিটার অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে; দুই জেলায় বন্যা চলছে ও অবনতি হতে পারে, আর হবিগঞ্জ, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার সতর্কতা জারি হয়েছে। এই অঞ্চলে আগামী তিন দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
কৃষকরা এবার দুই দিক থেকে সংকটে: একদিকে বৃষ্টিতে পাকা ধান কাটা যাচ্ছে না, অন্যদিকে মেঘলা আকাশে কাটা ধান শুকানোরও উপায় নেই। মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রীর কৃষক সবুজ সরদার জানান, সাধারণত বৈশাখের আগেই তারা বোরো কেটে ফেলেন, কিন্তু এবার চৈত্র মাসজুড়ে বৃষ্টিতে ৩২ কাঠা জমির ধান কাটতে পারেননি, আর এখন তা পানির নিচে। বৃষ্টির জন্য শ্রমিকও মিলছে না, গাড়িও আসতে পারছে না বলে জানান তিনি। খালিয়াজুড়ির কৃষক ওসমান শেখ ১২১ বিঘায় বোরো করেছিলেন; এখনো ৮৫ বিঘার ধান কাটা বাকি, আর পানির নিচের ধান কাটতে শ্রমিক লাগানোর খরচ কুলিয়ে উঠতে পারেননি।
খালিয়াজুড়ি উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেনের হিসাবে উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টরে বোরো আবাদ হয়েছে, যার ৫১ শতাংশ বা ১০ হাজার ৪৬২ হেক্টর গতকাল পর্যন্ত হারভেস্টার দিয়ে কাটা হয়েছে; কিন্তু ভারী বৃষ্টিতে কাটা এখন স্থগিত — মেশিন চলছে না, শ্রমিকও কাটতে পারছেন না। গত দুই-তিন দিনে বেড়িবাঁধের ভেতরের প্রায় দুই হাজার ৭৮০ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে এবং আরও তিন হাজার ৮৫১ হেক্টরের ধান ক্ষতির মুখে। কেবল এই উপজেলাতেই মোট আবাদি জমির ১৯ শতাংশ ঝুঁকিতে, সম্ভাব্য আর্থিক মূল্য ১০৪ কোটি টাকা।
তলিয়ে যাওয়া ধান আর ফিরবে না বলেই মনে করছেন তিনি: "যেসব জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে, সেই পানি কমার সম্ভাবনা নেই। কারণ নদীর পানিও বাড়ছে এবং বাঁধের ভেতরে বৃষ্টির পানি সেটাও যাওয়ার রাস্তা নেই। আলটিমেটলি পাঁচ-সাত দিন এটা পানির নিচে থাকলে ডিকম্পোজ বা নষ্ট হয়ে যাবে।" পানির নিচ থেকে ধান কেটে আনার শ্রমিক খরচ বিক্রির দামে পোষাবে না বলেও তার মত।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, টানা বৃষ্টিতে জেলার প্রায় চার হাজার ৭১২ হেক্টর জমি ক্ষতির মুখে; হাওরের ৬৫ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেলেও পুরো জেলার হিসাবে বোরো কাটা হয়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। ১৪ মার্চ থেকে বৃষ্টি, দুই দফা শিলাবৃষ্টি, ২৮ মার্চের অতিবৃষ্টি ও এখনকার টানা বর্ষণ — সব মিলিয়ে জেলার আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। সুনামগঞ্জে চিত্র তুলনামূলক ভালো: জেলা কৃষি অফিসের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুকের হিসাবে হাওর ও উজান মিলিয়ে ৪৬ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে, আবাদি জমির মাত্র দুই শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত, আর চার-পাঁচ দিন রোদ পেলে বাকি ধান কাটা শেষ হবে — তবে ভারত থেকে ফ্ল্যাশ ফ্লাড এলে বিপদ বাড়বে।
হাওরে সাধারণত অন্য এলাকার এক মাস আগে বোরো রোপণ ও কাটা হয়: ২০ নভেম্বরের আগে-পরে বীজ বপন, ২৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বর চারা রোপণ, আর ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে কাটা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার জানান, তিন দিন আগেই আবহাওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তিন জেলার প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে আগামী তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের নদীর পানি আগামী তিন দিন বাড়তে পারে এবং সুরমা-কুশিয়ারার পানি বেড়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওরসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস কেন্দ্র সতর্ক করেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)