বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, পানির সংকট, মাটির অবক্ষয়, রোগবালাই, বাজারের অনিশ্চয়তা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ, সব মিলিয়ে প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থার সামনে এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করেছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডেটা, রোবটিকস, ড্রোন, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, ক্লাউড কম্পিউটিং ও অটোমেশন কৃষিকে শুধু আধুনিক করার সুযোগই দিচ্ছে না; কৃষির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকেই বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটি এখন আর 'কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহার করব কি না' এটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কত দ্রুত, কতটা কার্যকরভাবে এবং কতটা কৃষকবান্ধব উপায়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তিকে কৃষিতে বাস্তবায়ন করা যাবে।
তরুণ প্রজন্মকে কৃষিতে ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু জমি ও উৎপাদনের ওপর নয়। কৃষিতে নতুন প্রজন্মকে কতটা সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে তার ওপরও। বর্তমানে অনেক তরুণ কৃষিকে ঐতিহ্যগত ও শারীরিক শ্রমনির্ভর পেশা হিসেবে দেখে আগ্রহ হারাচ্ছে। গ্রাম থেকে শহরমুখী হওয়ার অন্যতম কারণও কর্মসংস্থানের বৈচিত্র্য ও আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগের অভাব। অন্যদিকে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর। তারা স্মার্টফোন, অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডেটা, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিচিত। এই প্রযুক্তি-আগ্রহকে কৃষির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কৃষি আর শুধু 'চাষাবাদ' থাকবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে একটি ডিজিটাল, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা খাত। এ কারণেই কৃষিকে ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের দিকে নিয়ে যাওয়া এখন যুবসমাজকে কৃষিতে আকৃষ্ট ও ধরে রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। একজন তরুণ কৃষক যদি মোবাইল ফোনে নিজের জমির আবহাওয়া, মাটির অবস্থা, রোগবালাইয়ের পূর্বাভাস, সেচের প্রয়োজন, সার ব্যবস্থাপনা, বাজারদর এবং সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য জানতে পারেন, তাহলে কৃষির প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যাবে।
এআই, আইওটি ও বিগ ডেটা, আগামীর কৃষির ধারক ও বাহক
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে কৃষিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে এআই, আইওটি ও বিগ ডেটার সমন্বিত ব্যবহারে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও তথ্যভিত্তিক করতে পারে। ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফসলের রোগ ও পোকা শনাক্ত করা, আবহাওয়া ও মাঠের তথ্য বিশ্লেষণ করে আগাম সতর্কতা দেওয়া, সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন নির্ধারণ, উৎপাদনের পূর্বাভাস এবং বাজার বিশ্লেষণ, এসব ক্ষেত্রে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আইওটি মাঠকে পরিণত করতে পারে একটি 'স্মার্ট ফার্মে'। মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, পিএইচ, ইসি, লবণাক্ততা এবং এনপিকের মতো তথ্য সেন্সরের মাধ্যমে সংগ্রহ করা সম্ভব। এসব তথ্য নিয়মিত পাওয়া গেলে কৃষক অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বাস্তব ডেটার ভিত্তিতে সেচ, সার ও অন্যান্য কৃষি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
অন্যদিকে বিগ ডেটা কৃষির বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলোকে এক জায়গায় এনে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করবে। আবহাওয়া, মাটি, জাত, রোগবালাই, উৎপাদন, বাজার, কৃষকের আচরণ এবং জলবায়ু, এসব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করা গেলে অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা আরও কার্যকর হবে। অর্থাৎ এআই সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে, আইওটি মাঠ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে এবং বিগ ডেটা সেই তথ্যকে বৃহত্তর সিদ্ধান্তে রূপান্তর করবে। এই তিন প্রযুক্তির সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের স্মার্ট কৃষির অন্যতম ভিত্তি।
কৃষি শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন দিগন্ত
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, কৃষি ইনস্টিটিউট, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের মধ্যে এআই, আইওটি ও বিগ ডেটা নিয়ে আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি শুধু প্রচলিত কৃষিবিজ্ঞান না শিখে এআই মডেল, ডেটা অ্যানালাইসিস, জিআইস, রিমোট সেন্সিং, আইওটি সেন্সর, ড্রোন টেকনোলজি, রোবোটিক্স এবং ডিজিটাল এগ্রিকালচারের সঙ্গে পরিচিত হয়। তাহলে তারা আগামী দিনের কৃষির নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগারকে মাঠের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। গবেষণার ফল যদি কৃষকের জমিতে পরীক্ষিত ও ব্যবহারযোগ্য না হয়, তবে সেই গবেষণার অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব সীমিত থেকে যায়। তাই প্রয়োজন 'ল্যাব টু ল্যান্ড' এবং 'ল্যান্ড টু ল্যাব' দুইমুখী ব্যবস্থা। মাঠের সমস্যা গবেষণাগারে যাবে এবং গবেষণাগারের সমাধান দ্রুত মাঠে ফিরে আসবে।
ইনোভেশন মার্কেট, এখনই সময়
কৃষিতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসছে, উদ্ভাবন হবে, কিন্তু তার বাজার কোথায়? শুধু প্রকল্প, গবেষণা বা প্রদর্শনীতে প্রযুক্তি সীমাবদ্ধ থাকলে কৃষির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী এগ্রিকালচারাল ইনোভেশন মার্কেট। বাংলাদেশে এমন একটি বাজার তৈরি করা দরকার; যেখানে কৃষি-প্রযুক্তি উদ্ভাবক, স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, কৃষি উদ্যোক্তা, কৃষক, ব্যাংক, বিনিয়োগকারী এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন। একজন তরুণ যদি একটি আইওটি সয়েল সেন্সর তৈরি করেন, একজন শিক্ষার্থী যদি এআই-বেজড ডিজিজ ডিটেকশন সিস্টেম তৈরি করেন কিংবা কোনো স্টার্টআপ যদি কৃষকের জন্য ডিজিটাল অ্যাডভাইজরি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। তাহলে সেটিকে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আটকে না রেখে মাঠে ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। এখানেই প্রয়োজন ইনোভেশন স্যান্ডবক্স, পাইলট ফার্ম, টেকনোলজি ভ্যালিডেশন সেন্টার এবং ইনোভেশন ফান্ড। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায়ও কৃষি উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। দেশীয় উদ্ভাবনী প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পরীক্ষিত ও কার্যকর প্রমাণিত হলে সরকারি প্রকল্পে তা ব্যবহারের পথ সহজ করা দরকার।
সরকার ও সংশ্লিষ্টদের করণীয়





মন্তব্য
(০)