ধানের পাতার মতো দেখতে, কাছে গেলে লেবুর সুবাস—লেমন গ্রাস বা লেবু ঘাস একসময় থাই স্যুপের উপকরণ হিসেবেই পরিচিত ছিল। এখন এটি ভেষজ চা, পানীয়, প্রসাধনী ও সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। নওগাঁর সাপাহার উপজেলার বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্কে এই ঘাসের বাণিজ্যিক চাষ করছেন উদ্যোক্তা সোহেল রানা।
উপজেলার গোডাউনপাড়ার সোহেল রানা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতকোত্তর করে ঢাকায় একটি জাতীয় দৈনিকে কিছুদিন কাজ করেন; পরে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে নওগাঁয় ফিরে আমবাগান করেন। ২০১৫ সালে ঢাকার একটি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে কয়েকটি চারা এনে পরীক্ষামূলকভাবে লেমন গ্রাস লাগান। ইউটিউব দেখে ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ নিয়ে চাষের পরিসর বাড়ান।
এখন তিনি তাজা পাতা ও ডাঁটা বিক্রি করেন, আধুনিক স্মার্ট ড্রায়ারে শুকিয়ে ভেষজ চায়ের উপযোগী শুকনো পাতা বাজারজাত করেন, আর অন্য কৃষক ও উদ্যোক্তারা তাঁর কাছ থেকে চারা নিচ্ছেন। সোহেল রানার দেওয়া তথ্যে, ২৫০ গ্রাম তাজা লেমন গ্রাস বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০০ থেকে ১৩০ টাকায়, ১০০ গ্রাম শুকনো পাতা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় এবং প্রতিটি চারা ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। ভবিষ্যতে এসেনশিয়াল অয়েল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ‘লেমন গ্রাস একটি সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের ভেষজ ফসল। একবার রোপণ করলে কয়েক বছর উৎপাদন পাওয়া যায়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও কম হতে পারে।’ তাঁর মতে, পরিকল্পিত চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলে এটি নতুন অর্থকরী ফসল হয়ে উঠতে পারে; রপ্তানিরও সুযোগ আছে।
চা, হারবাল ড্রিংক, এসেনশিয়াল অয়েল, সাবান, সুগন্ধি, ডিটারজেন্ট, প্রসাধনী, হেয়ার টনিক ও অ্যারোমাথেরাপির পণ্যে লেমন গ্রাসের ব্যবহার আছে। থাইল্যান্ড, জাপান, চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর ব্যবহার দীর্ঘদিনের; বাংলাদেশেও প্রাকৃতিক উপাদানের পণ্যে আগ্রহ বাড়ায় বাজার তৈরি হচ্ছে। তবে কৃষি কর্মকর্তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মানসম্মত চারা, শুকানোর আধুনিক ব্যবস্থা, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত না হলে শুধু চাষে সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে না।
লেমন গ্রাসে সিট্রালসহ কিছু সুগন্ধি যৌগ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক উপাদান থাকায় এর চা জনপ্রিয় হচ্ছে। নওগাঁ সরকারি মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবুজার গাফ্ফার বলেন, এটি উপকারী ভেষজ উদ্ভিদ হলেও কোনো রোগের ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়; দীর্ঘমেয়াদি রোগী, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নিয়মিত ওষুধ সেবনকারীদের নিয়মিত পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে বড় চ্যালেঞ্জ পানি ও উৎপাদন খরচ। কম খরচে চাষযোগ্য ও বহুমুখী ব্যবহারের ফসল হিসেবে লেমন গ্রাস তাই এই অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা; একটি ফসল ঘিরে তাজা পাতা, শুকনো পাতা, চারা ও এসেনশিয়াল অয়েল—একাধিক পণ্যের বাজার তৈরি হতে পারে।
সমকালে কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে।
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)