মাইসেটোমা, যাকে মাদুরা ফুটও বলা হয়, একটি অবহেলিত ক্রান্তীয় রোগ, যা সবচেয়ে বেশি হয় কৃষিশ্রমিক ও পশুপালকদের। মাটি ও কাঁটাওয়ালা গাছে থাকা ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক কাঁটা ফোটা বা কাটা জায়গা দিয়ে চামড়ার নিচে ঢোকে, আর সংক্রমণ ধীরে ধীরে মাংস ও হাড় নষ্ট করে। ভারতে ১৮৪২ সাল থেকে এ রোগের নথি আছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০১৬ সালে একে অবহেলিত ক্রান্তীয় রোগ ঘোষণা করে; তবু দেশটিতে এর কোনো জাতীয় নজরদারি নেই বলে জানিয়েছে সাইডেভ.নেট।
রাজস্থানের খেতাসার গ্রামের ৬৫ বছরের কৃষক বাবুরাম বিশনোই কয়েক দশক ধরে খালি পায়ে বাজরা ও গমের জমি চাষ করেছেন। ডান পায়ে ছোট দানার মতো যা শুরু হয়েছিল, তা গভীর ফোলা ও পুঁজে পরিণত হয়, প্রতি বর্ষায় যা আরও খারাপ হতো। গ্রামের এক ওষুধ বিক্রেতা তাঁকে সাধারণ কিছু বড়ি দেন; কয়েক মাস কাজ চালিয়ে যাওয়ার পর যোধপুরের এমডিএম হাসপাতালে তাঁর ছত্রাকজনিত মাইসেটোমা (ইউমাইসেটোমা) ধরা পড়ে, ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।
রোগটির দুই রূপ। ছত্রাকজনিত রূপের চিকিৎসা কঠিন, কারণ ছত্রাকের ঘন দানার ভেতরে ওষুধ ভালোভাবে পৌঁছায় না; ব্যাকটেরিয়াজনিত রূপ (অ্যাক্টিনোমাইসেটোমা) আগে ধরা পড়লে দীর্ঘ মেয়াদে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকে সাধারণত সেরে যায়। রোগ সৃষ্টিকারী ৮০টির বেশি জীবাণুর মধ্যে ৬৯টিই ছত্রাক, আর ৭৭ শতাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত হয় পা। শেষ পর্যায়ে বারবার সংক্রমণ, অঙ্গহানি, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
কোন রূপ কোথায় হবে, তাতে জলবায়ুর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে। পশ্চিম রাজস্থান বা সুদানের মতো শুষ্ক এলাকায় ছত্রাকজনিত রোগ বেশি, আর্দ্র এলাকায় ব্যাকটেরিয়াজনিত। ইন্দিরা গান্ধী খালের সেচে থর মরুভূমির কিছু অংশ সবুজ হওয়ার পর স্থানীয় গবেষকেরা দেখেন, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগীর অনুপাত ২০০১ সালের ৪:১ থেকে ২০০৫ সালে ২:১-এর নিচে নেমেছে; তবে হাসপাতালের রোগীভিত্তিক এই ফলকে চূড়ান্ত বলেননি আন্তর্জাতিক মানব ও প্রাণী ছত্রাকবিদ্যা সমিতির সাবেক সভাপতি অরুণালোক চক্রবর্তী। যোধপুরের এস এন মেডিকেল কলেজের যোগী রাজ যোশী জানান, তাঁদের কলেজে মাসে দুই-তিনজন রোগী আসেন, আর অনুপাত ২০১০ সালের আগের ৩:১ থেকে এখন প্রায় ৩:২; কারণ নিশ্চিত হতে মাঠপর্যায়ের জরিপ দরকার।
গবাদিপশু ও মাটিও এর অংশ। খুরের লাথি বা শিংয়ের আঁচড় মাটির জীবাণুর পথ খুলে দিতে পারে; সুদানের গ্রামে ডিএনএ পরীক্ষায় প্রতিটি রোগীর বাড়িতে, বিশেষ করে মাটি, গোবর ও মাটির দেয়ালে, মাদুরেলা মাইসেটোমাটিস ছত্রাক পাওয়া গেছে। গরু, ঘোড়া, কুকুর ও বিড়ালেও এ সংক্রমণের খবর আসছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদিত ভারতের জাতীয় ওয়ান হেলথ মিশনে ১৬টির বেশি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যুক্ত, তবে এর কর্মসূচি জলাতঙ্ক ও লেপটোস্পাইরোসিসের মতো রোগে কেন্দ্রীভূত; মাইসেটোমা এর বাইরে। ১৮৭৬ থেকে ২০১৯ সালের রোগীর তথ্য পর্যালোচনায় ভারতে ১,১১৬ জনের হিসাব মেলে, সুদান ও মেক্সিকোর পরে, তবে প্রকৃত সংখ্যা অজানা। খার্তুমে ডব্লিউএইচওর সহযোগী মাইসেটোমা গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান আহমেদ ফাহাল চিকিৎসক, মহামারিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলাদা নজরদারি ব্যবস্থা চান; আর ড্রাগস ফর নেগলেক্টেড ডিজিজেস ইনিশিয়েটিভের (ডিএনডিআই) বর্না নিয়াওকে-আনোকে চান, ভারত রোগটিকে বাধ্যতামূলকভাবে জানানোর তালিকায় আনুক।
কৃষক পরিবারের জন্য ঝুঁকিটা হলো খালি পায়ে কাজ, কাঁটা ফোটা আর মাঠের ছোট আঘাত অবহেলা করা; আগেভাগে রোগ ধরা পড়লেই ব্যাকটেরিয়াজনিত রূপ সারানো যায়।
প্রতিবেদন: সাইডেভ.নেটের গ্লোবাল ডেস্ক, এমএসএফ-ডিএনডিআইয়ের অবহেলিত ক্রান্তীয় রোগ অনুদানের সহায়তায়।
সূত্র: SciDev.Net



মন্তব্য
(০)