দীর্ঘদিন ব্যাংকিং খাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়ন নিয়ে কাজ করার পর ২০২০ সালে সরাসরি কৃষিশিল্পে নামেন সৈয়দ আমিনুল কবির। তাঁর প্রশ্ন ছিল, কৃষিপ্রধান দেশে কৃষিপণ্যে কেন মূল্য সংযোজন হবে না আর প্রান্তিক কৃষক কেন ন্যায্যমূল্য পাবেন না। সেই ভাবনা থেকে মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীতে গড়ে ওঠে ‘স্টার অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ’, যেখানে তৈরি হচ্ছে আদা, রসুন ও পেঁয়াজের গুঁড়া।
দেশের মানুষ রান্নায় কাঁচা বা বাটা মসলায় অভ্যস্ত হলেও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে নির্দিষ্ট স্পেসিফিকেশনের গুঁড়া মসলার বড় চাহিদা তৈরি হয়েছে—মাংসের মসলা, বিরিয়ানি মসলা, চানাচুর, চিপসে যার ব্যবহার। ২০২১ সালের শেষ দিকে বড় পরিসরে উৎপাদনে যায় প্রতিষ্ঠানটি। আদা-রসুন-পেঁয়াজ বাতাসের আর্দ্রতা দ্রুত শুষে নেয় বলে শুকানো, পেষাই ও সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপে মান ধরে রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ; ধীরে ধীরে নিজস্ব প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণে ক্রেতার চাহিদামতো পণ্য তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে তারা।
উৎপাদনের ভিত্তি প্রান্তিক কৃষক। চুক্তিভিত্তিক চাষের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী আদা ও রসুন ফলানো ও সংগ্রহের কৌশল শেখানো হচ্ছে, যাতে কোন কৃষকের জমি থেকে কাঁচামাল এল তা শনাক্ত করা যায়—যাকে বলে ‘ট্রেসিবিলিটি’। তবে প্রক্রিয়াজাত খাবারের ফ্লেভারের জন্য দরকারি সাদা পেঁয়াজ দেশে চাষ হয় না বলে ভারত থেকে আমদানি করতে হয়; ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে নারকেলের কোপরা এনে ভার্জিন ও আরবিডি কোকোনাট অয়েলও তৈরি করছে তারা।
মাইক্রোবায়োলজিক্যাল মান, আর্দ্রতা, প্যাকেজিং ও পরিচ্ছন্নতায় কড়াকড়ি বজায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি দেশের শীর্ষ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী ও এফএমসিজি ব্র্যান্ডগুলোর বিটুবি সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে; ক্রেতাদের গোপনীয়তার কারণে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেন না আমিনুল কবির। জাপানি বহুজাতিক খাদ্য প্রস্তুতকারক আজিনোমোটোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের আলোচনা ও কারিগরি প্রস্তুতি এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে; ফুডসেফটি, ট্রেসিবিলিটি ও ডকুমেন্টেশনে তাদের কঠোর মানদণ্ড পূরণের মধ্য দিয়ে কারখানাটি বিশ্বমানের হয়ে উঠছে।
অবকাঠামো অবশ্য পিছু টানছে। বিসিক শিল্পনগরীর জরাজীর্ণ সড়কের কারণে বিদেশি ক্রেতারা কারখানা দেখে সন্তুষ্ট হলেও রপ্তানি আদেশ দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। গ্যাস-সংযোগ না থাকায় বাড়তি খরচে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়, আর ঘন ঘন বিদ্যুৎ-বিভ্রাট উৎপাদন ব্যাহত করে। সে সংকট কাটাতে কারখানায় নিজস্ব উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানো হয়েছে, যাতে বিদ্যুতের বড় অংশ নিজেরাই উৎপাদন করা যায়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব ও লাইসেন্স নবায়নে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতাও কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে।
আইএসও ২২০০০:২০১৮ ও হালাল সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ায় থাকা প্রতিষ্ঠানটি আগামী পাঁচ বছরে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে ঢোকার রোডম্যাপ তৈরি করেছে। লক্ষ্য একটাই—দেশের কৃষকের আদা ও রসুন কাঁচা বিক্রি না করে দেশেই উচ্চ মূল্য সংযোজিত গুঁড়া মসলায় রূপান্তর করা, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে এবং প্রান্তিক কৃষকের জন্য স্থায়ী ও নিশ্চিত বিক্রয়কেন্দ্র তৈরি হয়।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)