দেশীয় মাছ পাবদা, বৈজ্ঞানিক নাম Ompok pabda, এখন অনেক চাষি পুকুরে চাষ করছেন। একসময় দেশের নদী, খাল ও বিলে মাছটি প্রচুর পাওয়া যেত। ২০২৫ সালের মে মাসে দ্য এগ্রো নিউজের নিজস্ব প্রতিনিধি পাবদার সঙ্গে শিং এবং কাতলা, রুই, মৃগেল, সিলভার কার্প ও গ্রাস কার্পের মিশ্র চাষের একটি ব্যবস্থাপনা তুলে ধরেন। পুকুর নির্বাচন, চুন ও গোবর প্রয়োগ, পোনা মজুদ, খাদ্য ও আহরণের সেই নিয়মের সঙ্গে এখানে মাছটির পরিচিতি ও গবেষণার তথ্য যোগ করা হলো।
পাবদা মাছের পরিচিতি ও বর্তমান অবস্থা
পাবদা ক্যাটফিশ জাতীয় একটি দেশীয় মাছ, বাংলাদেশে যা মধু পাবদা নামেও পরিচিত। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে মাছটি পাওয়া যায় এবং এটি সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। বিল, পুকুর, নদী, খাল ও বর্ষায় প্লাবিত জমি এর স্বাভাবিক আবাস। পাবদা সর্বভুক; শৈবাল, প্রোটোজোয়া, ক্রাস্টেশিয়ান ও ছোট মাছ খায়। মে থেকে জুলাই এর প্রজনন মৌসুম।
আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালে দেশের ২৫৩টি মিঠা পানির মাছের অবস্থা মূল্যায়ন করে ৩০টিকে বিপন্ন ঘোষণা করে; পাবদা সেই তালিকায় রয়েছে। আবাসস্থল হারানো ও সচেতনতার অভাবকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বৈশ্বিক তালিকায় মাছটি প্রায় বিপদগ্রস্ত। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) পাবদার প্রজনন ও পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি এবং পাবদা ও গুলশার পোনা উৎপাদন ও চাষ ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করেছে। যশোরের হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননে পোনা উৎপাদন হয় এবং ময়মনসিংহ ও যশোরে পাবদার চাষ হয়।
পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতি
বছরে অন্তত ৭ থেকে ৮ মাস পানি থাকে এমন পুকুর পাবদা চাষের জন্য বেছে নেওয়া ভালো। সারা বছর পানি থাকে এবং আগে থেকে অন্য মাছ চাষ হচ্ছে এমন পুরোনো পুকুর আরও উপযোগী। নতুন পুকুরের পাড় মেরামত করে জলজ আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। এরপর প্রতি শতাংশে ১ কেজি চুন এবং চুন দেওয়ার ২ থেকে ৩ দিন পর প্রতি শতাংশে ৫ কেজি গোবর প্রয়োগ করলে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়। পোনা ছাড়ার আগে রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত মাছ সরিয়ে ফেলতে হবে।

পোনা মজুদের হিসাব
পুকুরের পানির গড় গভীরতা ৪ থেকে ৫ ফুট হলে এবং পানির রং হালকা সবুজাভ হলে পোনা ছাড়ার সময় হয়। মিশ্র চাষে প্রতি শতাংশে নিচের হারে সুস্থ পোনা মজুদ করতে হবে:
- ২ থেকে ৩ ইঞ্চি আকারের পাবদা: ৫০টি
- ২ থেকে ৩ ইঞ্চি আকারের শিং: ১০০টি
- ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি আকারের কাতলা: ৫টি
- ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি আকারের রুই: ১০টি
- ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি আকারের মৃগেল: ১০টি
- ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি আকারের সিলভার কার্প: ২টি
- ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি আকারের গ্রাস কার্প: ২টি
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাংলাদেশে মিশ্র চাষের নির্দেশিকা অনুযায়ী, কার্প জাতীয় মাছগুলো পুকুরের আলাদা স্তরে আলাদা খাবার খায়। সিলভার কার্প ও কাতলা ওপরের স্তরে যথাক্রমে উদ্ভিদকণা ও প্রাণিকণা খায়, রুই মাঝের স্তরে প্লাংকটন ও জৈব কণা খায়, গ্রাস কার্প জলজ উদ্ভিদ খায় এবং মৃগেল তলদেশের জৈব পদার্থ খায়। এভাবে পুকুরের সব স্তরের খাবার কাজে লাগে।

খাদ্য, পরিচর্যা ও আহরণ
মাছের দেহের ওজনের শতকরা ৩ থেকে ৮ ভাগ হারে নিয়মিত সম্পূরক খাদ্য দিতে হবে। অনুর্বর পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য বাড়াতে ১৫ দিন পরপর প্রতি শতাংশে ২ থেকে ৫ কেজি পচা গোবর দেওয়া যায়। পানির রং গাঢ় সবুজ হয়ে গেলে গোবর দেওয়া বন্ধ করে পানির পিএইচ পরীক্ষা করতে হবে।
পাবদা পুকুরের তুলনামূলক ছোট মাছ খেয়ে ফেলে। তাই অন্য প্রজাতির পোনা যেন পাবদার চেয়ে বড় আকারের হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। অবাঞ্ছিত ছোট মাছ খেয়ে পাবদা একদিকে পুকুরকে চাষের উপযোগী রাখে, অন্যদিকে নিজেও দ্রুত বাড়ে।

পাবদার ওজন ৬০ থেকে ৭০ গ্রাম হলে বিক্রির জন্য ধরা যায়। পোনা ছাড়ার ৭ থেকে ৮ মাস পর সব মাছ আহরণ করা যেতে পারে। তবে ১ বছরের বেশি সময় পর আহরণ করলে মাছের ওজন দ্বিগুণেরও বেশি হতে দেখা গেছে।
ছবি: JIBON / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিনিধি), বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিডিফিশ (আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ লাল তালিকা), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)