যুক্তরাজ্য থেকে পোকা এনে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় খামার গড়ে তুলেছিলেন প্রবাসী যুবক খলিলুর রহমান। জাগো নিউজ ২৪ ২০১৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জানায়, উপজেলার খাজাঞ্চী ইউনিয়নের তেঘরী গ্রামে নিজের বাড়ির পাশে ‘হাজি বায়োসাইকেল কোম্পানি’ নামে তিনি ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাইয়ের (প্রতিবেদনে ‘প্যারেট পোকা’) এই খামার করেন। এ ধরনের পোকার খামার সিলেট বিভাগে সেটিই প্রথম বলে জানা গিয়েছিল।
মশারির খাঁচায় উচ্ছিষ্ট খাবারে পোকা চাষ
সেদিন রোববার সকালে খামারে গিয়ে প্রতিবেদক দেখেন, একটি টিনশেড ঘরের ভেতরে পাঁচটি বড় মশারি দিয়ে পাঁচটি খাঁচা তৈরি করা হয়েছে, আর তার ভেতরে রাখা হয়েছে পোকা। পোকার খাবার হিসেবে দেওয়া হচ্ছিল ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট ও পচা খাবার। খলিলুর জানান, খামারে তিন ধরনের পোকা চাষ হচ্ছিল: বিটল (গুবরে পোকা), ক্রিকেট (ঝিঁঝি পোকা) ও ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই।
তিনি বলেন, মাতৃভূমিতে কিছু করার ইচ্ছা থেকে তিনি প্রথমে জন্মস্থান বিশ্বনাথে কোয়েল পাখি ও লেয়ার মুরগির খামার করেন। কিন্তু এসব পাখির খাবারের দাম বেশি হওয়ায় কম খরচে খাবার জোগানোর উপায় খুঁজতে গিয়ে পোকার খামারের সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশে একটি ‘বায়োকনভার্সন ইনোভেটিভ’ কেন্দ্র শুরুর লক্ষ্যে তিনি যুক্তরাজ্যের একটি খামার থেকে ২৫০ টাকায় ১৫০ গ্রাম পোকা কিনে দেশে আনেন এবং সেই বছরের ২৬ জুন থেকে চাষ শুরু করেন। প্রতিবেদনের সময় তাঁর খামারে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার পোকা ছিল বলে তিনি জানান।

কোয়েল ও মুরগির খাবার, খামারির হিসাব
খলিলুরের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পোকায় ৪০ শতাংশ প্রোটিন ও ২০ শতাংশ চর্বি থাকে। একটি স্ত্রী পোকা ৫০০ থেকে ৬০০টি ডিম দেয়, ডিম ফুটে লার্ভা বের হয় এবং ২১ দিনে পূর্ণ হলে তা পাখি ও মুরগিকে খাওয়ানো হয়। তিনি জানান, ডিম দেওয়ার পর পোকা মারা যায় এবং সেই মরা পোকাও কোয়েল ও মুরগির প্রিয় খাবার।
তাঁর হিসাবে, চাষের জন্য প্রতি কেজি পোকা ১২ হাজার টাকায় এবং পাখি ও মুরগির খাবার হিসেবে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব, তাই খামারটি লাভজনক। খামারটি বাণিজ্যিকভাবে আরও বড় করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। ব্যতিক্রমী এই খামার দেখতে উপজেলার নানা জায়গা থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সের মানুষ ভিড় করছিলেন, আর মানুষের এই আগ্রহ তাঁকে খামারে আরও মনোযোগী করছে বলে তিনি জানান। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বিশ্বনাথনিউজ২৪-ও একই সময়ে খামারটির খবর দেয় এবং একে বিশ্বনাথে এ ধরনের প্রথম খামার বলে উল্লেখ করে।

ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই কী
ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাইয়ের বৈজ্ঞানিক নাম হারমেশিয়া ইলুসেন্স (Hermetia illucens)। এর আদি নিবাস আমেরিকার নিওট্রপিক্যাল অঞ্চল, তবে এখন প্রায় সব মহাদেশেই এটি ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরের মাছির তুলনায় এর মুখের অংশ অনেক ছোট; পূর্ণবয়স্ক মাছি সাধারণত কিছুই খায় না, লার্ভা অবস্থায় জমানো চর্বির ওপর বেঁচে থাকে। লার্ভা বা পূর্ণবয়স্ক মাছি, কোনোটিকেই কৃষির ক্ষতিকর পোকা বা রোগের বাহক ধরা হয় না।
এর লার্ভা পচা ফল-সবজি, খাদ্যের উচ্ছিষ্ট, মাছের নাড়িভুঁড়ি ও পশুর গোবরের মতো জৈব বর্জ্য খেয়ে বড় হয়। একটি স্ত্রী মাছি একবারে প্রায় ২০০ থেকে ৬০০টি ডিম পাড়ে, আর খাবারের ধরন অনুযায়ী লার্ভা অবস্থা ১৮ থেকে ৩৬ দিন স্থায়ী হয়। খামারে তোলা প্রি-পিউপা ও পিউপা মুরগি, মাছ ও শূকরের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পশুখাদ্য বিষয়ক তথ্যভান্ডার ফিডিপিডিয়ার হিসাবে, শুকনো ওজনে এই লার্ভায় প্রায় ৪০ থেকে ৪৪ শতাংশ অপরিশোধিত প্রোটিন থাকে। চর্বির পরিমাণ নির্ভর করে লার্ভা কী খেয়ে বড় হয়েছে তার ওপর: মুরগির বিষ্ঠায় পালিত লার্ভায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ, আর তেলসমৃদ্ধ খাদ্য-উচ্ছিষ্টে পালিত লার্ভায় ৪২ থেকে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত। লার্ভায় ক্যালসিয়ামও বেশি থাকে। ফিডিপিডিয়া জানায়, ব্রয়লার মুরগির খাদ্যে এর লার্ভা থেকে তৈরি উপকরণ কাজে লাগতে পারে।

ছবি: ShaunRomero / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিশ্বনাথনিউজ২৪, ফিডিপিডিয়া (ইনরায়ে, সিরাদ, এএফজেড ও এফএও), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)