আম পাকে বৈশাখে—এই ধারণা বদলে দিয়েছে কাটিমন। ভাদ্র শেষের পথে, তবু ঢাকার ফুটপাত থেকে অভিজাত এলাকার ফলের দোকানে পাকা কাটিমন মিলছে; আশ্বিনেও থাকবে। আকার ও মানভেদে কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ২৮০ টাকায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে এখন প্রায় এক লাখ টন কাটিমন উৎপাদিত হয়, যা মোট আম উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ, আর উৎপাদন প্রতিবছর প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে।
দেশে বছরে প্রায় ২৬ লাখ টন আম হয়। আম্রপালি ৩৫ শতাংশ (সাড়ে ছয় থেকে সাত লাখ টন), হিমসাগর ১৫, বারি ১০, হাঁড়িভাঙা ৭, গোবিন্দভোগ ও কাটিমন ৫ শতাংশ করে, ল্যাংড়া সাড়ে ৪ এবং গোপালভোগ ২ শতাংশ। অধিদপ্তরের পরামর্শক (হর্টিকালচার) কৃষিবিজ্ঞানী মো. মেহেদী মাসুদ, যাঁকে দেশে কাটিমনের বাণিজ্যিক চাষের প্রচলনকারী বলা হয়, মনে করছেন এই হিসাব শিগগির বদলে যাবে।
বারোমাসি আমের খোঁজ মেহেদী মাসুদ শুরু করেন ২০০২ সালে গাম্বিয়ায় এফএও-র একটি প্রকল্পে কাজ করার সময়, যেখানে বছরে প্রায় ১০ মাস আম হয়। দেশে ‘বরিশালী বারোমাসি’, কুমিল্লার ‘নীলুদ্দিন’ কিংবা বারি-১১—কোনোটিই বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি। ভিয়েতনামের এক সুপারশপে থাইল্যান্ডের কাটিমন দেখার পর ২০১৪ সালে দুই হাজার চারা আনা হয়; ২০১৬ সালে ৬৪ জেলার হর্টিকালচার সেন্টারে ১০টি করে মাতৃগাছ লাগানো হয় এবং ৫০ হাজার চাষিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রায় সাত হাজার প্রদর্শনী বাগান গড়ে ওঠে। ২০২৩ সাল থেকে কাটিমন বাজারে উঠতে শুরু করে।
অধিদপ্তরের হিসাবে এখন প্রায় সাত হাজার একরে কাটিমনের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে—সবচেয়ে বেশি নওগাঁয় ৭০০ থেকে ৮০০ একর, এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫০০ একরের বেশি। কলমের চারা ভালো পরিচর্যায় ছয় মাসেই মুকুল দেয়, তবে দুই বছর বয়স পর্যন্ত মুকুল ভেঙে দিতে হয়। দুই বছর বয়সী গাছে বছরে দুবার প্রায় ২০ কেজি করে ৪০ কেজি আম ধরে। বিঘায় ১০০ গাছে প্রায় চার হাজার কেজি ফলন; পাইকারি কেজি ১২০ টাকা ধরলেও খরচ বাদে বিঘাপ্রতি আয় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা—এই মুহূর্তে অন্য কোনো ফলে এত আয় নেই।
ফেব্রুয়ারি-মার্চের স্বাভাবিক মুকুল ভেঙে দিলে এপ্রিল-মে-র মুকুলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে, জুন-জুলাইয়ের মুকুলে অক্টোবর-নভেম্বরে এবং অক্টোবরের শেষের মুকুলে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ফলন মেলে। পাকা কাটিমন সোনালি হলুদ, গড় ওজন ৩৯৬ গ্রাম, মিষ্টতা ২০ ব্রিকস (আম্রপালির ২৬), আঁটি পাতলা, জলীয় অংশ কম বলে রাসায়নিক ছাড়াই অন্তত ১০ দিন ভালো থাকে—তাই রপ্তানির জন্য উপযোগী। ‘হানি ম্যাঙ্গো’ নামেও পরিচিত।
ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়কের ফল বিক্রেতা দেলোয়ার ব্যাপারী জানান, তাঁর দোকানে দিনে প্রায় ৪০ কেজি কাটিমন বিক্রি হয়; সেরা মানের তিনটিতে এক কেজি, দাম ২৫০–২৮০ টাকা, ছোট আম ১৮০–২০০ টাকা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোহনপুরের উৎপাদক ও ব্যবসায়ী শাহিন আলম প্রতিদিন প্রায় এক ট্রাক কাটিমন ঢাকার পাইকারি বাজার ও দেশের নানা প্রান্তে পাঠান; ফেসবুক-ইউটিউবেও সরাসরি বিক্রি হচ্ছে।
বিদেশি জাতটি শেষ পর্যন্ত আগ্রাসী হয়ে উঠবে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। মেহেদী মাসুদের বক্তব্য, নিজস্ব প্রজাতির সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, তবে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকলে কাটিমনের মতো জাত আসবেই; এর ইতিবাচক গুণ নিজস্ব জাতের সঙ্গে সংকরায়ণ করে নতুন ভালো জাত উদ্ভাবন করাই পথ।
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)