গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ বাংলাদেশের প্রায় সব বিভাগে টানা বৃষ্টি ও বজ্রপাত হচ্ছে। আবহাওয়া ঠান্ডা থাকলেও বজ্রপাতে এখন পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার জন্য কালবৈশাখী ঝড়ের সতর্কবার্তা দিয়েছে: রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যেতে পারে।
এ বছরের এপ্রিল অস্বাভাবিক স্বস্তিদায়ক ছিল। আবহাওয়াবিদ মুহাম্মাদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, এপ্রিলের গড় তাপমাত্রা সাধারণত ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি হলেও কখনও ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে; এবার কেবল ২২শে এপ্রিল রাজশাহীতে একবার ৪০ ডিগ্রি ছুঁয়েছে। ২০২৪ সালে ৭৬ বছরের মধ্যে টানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহ চলেছিল; এবার তা নেই, কারণ বজ্রঝড় বেশি হয়েছে। তার ভাষায়, "উচ্চ তাপমাত্রার ক্রুয়েলেস্ট এপ্রিল মাস এবার অনেকটাই সহনশীল।"
মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসকে প্রাক-বর্ষা মৌসুম বলা হয়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বছরের ৩৮ শতাংশ বজ্রঝড় এই মৌসুমে হয় এবং স্থানীয়ভাবে একে কালবৈশাখী বলা হয়; জুন থেকে সেপ্টেম্বরের বজ্রঝড়, যা প্রায় ৫১ শতাংশ, কালবৈশাখী নয়। স্বাভাবিকভাবে মার্চে গড়ে পাঁচ-ছয়টি, এপ্রিলে নয়টি ও মে মাসে ১৩টি কালবৈশাখী হয়; এবার এপ্রিলেই দশটির বেশি বজ্রঝড় তৈরি হয়ে গেছে, বিশেষ করে সিলেটে। স্থানীয় ও বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার মিথস্ক্রিয়ায় ব্যত্যয় ঘটায় বজ্রমেঘ বেশি তৈরি হয়েছে বলে মি. মল্লিকের ব্যাখ্যা। বুধবার থেকে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে বজ্রমেঘ বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
মঙ্গলবার সকালে অধিদপ্তর ৯৬ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তাও দিয়েছে: আট বিভাগের কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার ভারী এবং ৮৮ মিলিমিটার বা তার বেশি অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে, সঙ্গে অস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি। উত্তর বঙ্গোপসাগরে থাকা মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
দোসরা মে পর্যন্ত পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশালে মাঝারি থেকে অতি ভারী বৃষ্টি এবং সব বিভাগেই দমকা হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা বলা হয়েছে। এরপর বৃষ্টি কমে তাপমাত্রা বাড়বে। মি. মল্লিকের পূর্বাভাস, মে মাসের প্রথম সপ্তাহের পর এবং জুনেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে; বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি ও বাতাসের গতি কম থাকলে গরমের অনুভূতি মাঝে মাঝেই তীব্র হবে।
মে মাস ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। তার হিসাবে এ মাসে এক থেকে দুটি লঘুচাপ তৈরি হতে পারে, যার একটি নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে; তবে আগামী দশ দিনে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা নেই। কালবৈশাখী কোথায়, কতক্ষণ হবে তা আগে জানানোর বৈজ্ঞানিক উপায় এখনও নেই, কারণ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই ঝড় তৈরি হয়।
বোরো কাটা ও মাড়াইয়ের ভরা মৌসুমে এই পূর্বাভাস কৃষকের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক: ঝড়ো হাওয়া ও অতি ভারী বৃষ্টি পাকা ধান ও খলার ফসলের জন্য ঝুঁকি, আর প্রাক-বর্ষার বজ্রপাত মাঠে থাকা কৃষিশ্রমিকের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী দুর্যোগ।
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)