শহরের কোনো পুরোনো বাড়ির ছাদে উঠলে প্রায়ই দেখা যায় সারি সারি মাটির টব। তার মধ্যে একটি টবে হঠাৎ ফুটে আছে লাল বা সাদা একটি গোলাপ, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে বাড়ির কেউ সকালের চা হাতে সেদিকে তাকিয়ে আছেন। বাড়ির ছাদে বা আশপাশে অনেকেই শখ করে ফুল চাষ করেন, আর সেই শখের তালিকায় সবার ওপরে থাকে গোলাপ। কিন্তু অনেকের অভিজ্ঞতা একই রকম: নার্সারি থেকে আনা চারায় প্রথম কয়েকটি ফুল ফোটে, তারপর গাছ ধীরে ধীরে রোগা হয়ে যায়, ফুল ছোট হয়, একসময় মরে যায়। টবে গোলাপ চাষে সফল হতে কয়েকটি নিয়ম জানা থাকা দরকার, আর সেই নিয়মগুলো খুব কঠিনও নয়।
ছাদের বাগানে গোলাপ কেন
শহরে মাটির জমি কম, কিন্তু ছাদ, বারান্দা আর জানালার কার্নিশে জায়গা আছে। টবে গাছ লাগানোর সুবিধা হলো, গাছকে দরকার মতো সরানো যায়, মাটি নিজের মতো তৈরি করা যায়, আর অল্প জায়গায় অনেক গাছ রাখা যায়। গোলাপ এমন একটি ফুল, যা ঠিক যত্ন পেলে বছরের বড় একটা সময় জুড়ে ফুল দেয়। রং, গন্ধ আর আকারের বৈচিত্র্যের কারণে গোলাপ ছাদবাগানিদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
তবে টবের গাছের একটি বড় সীমাবদ্ধতাও আছে। মাঠের গাছ শিকড় ছড়িয়ে দূর থেকে পানি ও খাবার টেনে নিতে পারে, টবের গাছ তা পারে না। টবের সীমিত মাটিতে যা আছে, গাছকে তা দিয়েই চলতে হয়। তাই টবের গোলাপের জন্য মাটি, সার, পানি আর রোদের হিসাব মাঠের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই লেখায় চারা বাছাই থেকে শুরু করে ছাঁটাই, সার, সেচ আর পোকা দমন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ আলাদা করে তুলে ধরা হলো।
চারা বাছাই: নতুন নয়, এক বছরের পুরোনো
সফল গোলাপ চাষের প্রথম ধাপ ঠিক চারা বেছে নেওয়া। কৃষিবিদদের পরামর্শ হলো, একেবারে নতুন চারা না লাগিয়ে এক বছরের পুরোনো চারা লাগানো। এক বছরের চারার শিকড় ও কাণ্ড শক্ত হয়ে যায়, নতুন টবে বসিয়ে দিলে দ্রুত মানিয়ে নেয়, আর রোগ বা আবহাওয়ার ধাক্কা সহ্য করতে পারে। নার্সারি থেকে কেনার সময় দেখে নেওয়া উচিত, চারার পাতা সবুজ ও দাগহীন কিনা, কাণ্ডে কালো শুকনো দাগ আছে কিনা, আর গোড়ার মাটি শক্ত করে বাঁধা কিনা।
নার্সারিতে যেসব গোলাপের চারা বিক্রি হয়, তার বেশির ভাগ জোড় কলমের চারা। জোড় কলম মানে দুটি আলাদা গাছ জুড়ে একটি গাছ তৈরি করা। নিচের অংশ, যাকে আদিজোড় বা রুটস্টক বলে, সাধারণত একটি শক্তপোক্ত বুনো জাতের গোলাপ, যার শিকড় মজবুত। ওপরের অংশ হলো কাঙ্ক্ষিত জাতের গোলাপের ডাল, যেটিতে সুন্দর বড় ফুল হয়। দুটি অংশ যেখানে জোড়া লাগানো হয়, সেখানে কাণ্ডে একটি গিঁটের মতো ফোলা অংশ দেখা যায়। এই জোড়ের জায়গাটি পরে রোপণ ও পরিচর্যার সময় বারবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
টব ও মাটি তৈরি
টবের আকার গাছের আকারের সঙ্গে মিলিয়ে বাছতে হয়। কৃষি বিষয়ক সরকারি নির্দেশনায় ছোট জাতের গোলাপের জন্য ২০ সেন্টিমিটার আর বড় জাতের জন্য ৩০ সেন্টিমিটার বা তার চেয়ে বড় টবের কথা বলা হয়েছে। টব ছোট হলে শিকড় জায়গা পায় না, মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়, আর গাছ ঘন ঘন পানির অভাবে ভোগে। মাটির টব বাতাস চলাচলের জন্য ভালো, তবে প্লাস্টিক বা সিমেন্টের টবেও গোলাপ হয়, যদি পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকে।
টবের তলায় অবশ্যই ছিদ্র থাকতে হবে। গোলাপ ভেজা মাটি পছন্দ করে, কিন্তু জমে থাকা পানি সহ্য করতে পারে না; শিকড় পচে যায়। ছিদ্রের ওপর কয়েক টুকরা ভাঙা ইট বা খোলামকুচি বিছিয়ে দিলে মাটি ছিদ্র বন্ধ করে দিতে পারে না, পানি অনায়াসে বের হয়ে যায়। এরপর দোআঁশ মাটির সঙ্গে ভালো করে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট মিশিয়ে টব ভরতে হবে। মাটি এমন হওয়া দরকার, যা হাতে মুঠো করে ছেড়ে দিলে ঝুরঝুরে হয়ে ভেঙে পড়ে, কাদার মতো দলা পাকিয়ে থাকে না।
রোপণের নিয়ম
চারা লাগানোর সময় সবচেয়ে বড় কথা হলো চারাটিকে সোজা করে গর্তের মধ্যে বসানো। কাত হয়ে থাকা চারা পরে বাঁকা হয়ে বাড়ে, আর বাতাসে অল্পতেই হেলে পড়ে। চারার শিকড় ভালো করে মাটি দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে দিতে হবে, যাতে শিকড়ের কোনো অংশ বাতাসে উন্মুক্ত না থাকে। মাটি দেওয়ার পর হাত দিয়ে হালকা চেপে দিলে শিকড়ের চারপাশে ফাঁকা জায়গা থাকে না।
জোড় কলমের চারার ক্ষেত্রে একটি নিয়ম কঠোরভাবে মানতে হয়: জোড়ের জায়গাটি মাটি থেকে অন্তত ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার ওপরে রাখতে হবে। জোড় মাটির নিচে চলে গেলে সেখানে পচন ধরতে পারে, আবার ওপরের জাতের ডাল থেকে আলাদা শিকড় বেরিয়ে কলমের সুবিধা নষ্ট হয়ে যায়। চারা লাগানোর পরে প্রথম দিকে গোড়ায় ঘন ঘন পানি দিতে হবে, যাতে নতুন টবের মাটির সঙ্গে শিকড় দ্রুত জুড়ে যায়।
রোদ: দিনে অন্তত ছয় ঘণ্টা
গোলাপ রোদের ফুল। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী গোলাপের দিনে অন্তত ছয় ঘণ্টা সরাসরি রোদ দরকার। ছায়ায় রাখা গোলাপ লম্বা ও দুর্বল হয়ে বাড়ে, ফুল কম আসে, রোগও বেশি হয়। ছাদের যে কোণে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোদ পড়ে, সেটাই গোলাপের টবের জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা।
সকালের রোদের একটি বাড়তি উপকার আছে। রাতের শিশির বা পানি দেওয়ার পর পাতা ভেজা থাকলে ছত্রাকজনিত রোগ, বিশেষ করে ব্ল্যাক স্পট বা কালো দাগ রোগ, দ্রুত আক্রমণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগের জীবাণু অঙ্কুরিত হতে পাতা কয়েক ঘণ্টা একটানা ভেজা থাকা দরকার। সকালের রোদ তাড়াতাড়ি পাতা শুকিয়ে দেয় বলে সেই সুযোগ আর থাকে না। তবে গ্রীষ্মের দুপুরে ছাদের প্রচণ্ড তাপে টবের মাটি অতিরিক্ত গরম হতে পারে, তাই তখন টবের চারপাশে ছায়ার ব্যবস্থা বা মাটির ওপর খড় বিছিয়ে দেওয়া ভালো।
পানি দেওয়ার হিসাব
নতুন লাগানো চারার প্রথম কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত পানি লাগে। কিন্তু টবের মাটিতে চারা ভালোভাবে বসে গেলে এবং নতুন ডালপালা ছাড়তে শুরু করলে পানির নিয়ম বদলায়। কৃষি বিষয়ক পরামর্শ হলো, তখন খরা মৌসুমে প্রতি ১০ দিন পর পর একবার সেচের মতো করে পানি দিতে হবে, অর্থাৎ অল্প অল্প করে প্রতিদিন নয়, একবারে এমনভাবে দিতে হবে যাতে টবের পুরো মাটি ভিজে যায় এবং অতিরিক্ত পানি তলার ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসে।
প্রতিবার পানি দেওয়ার পরে গাছের গোড়ার মাটি ঝুরঝুরে করে দিতে হবে। শুকানোর পর মাটির ওপরে যে শক্ত স্তর পড়ে, তা ভেঙে দিলে শিকড়ে বাতাস ঢোকে এবং পরের বার পানি ভালোভাবে ভেতরে যায়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে টবের মাটি দ্রুত শুকায়, তাই তখন আঙুল দিয়ে মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে আগেই পানি দিতে হবে। আবার বর্ষায় পানি কম দিতে হয়, আর খেয়াল রাখতে হয় টবে যেন পানি জমে না থাকে। পানি দেওয়ার সময় পাতায় না ঢেলে গোড়ায় দেওয়া ভালো, এতে পাতার রোগ কম হয়।
ছাঁটাই: আশ্বিনে কাঁচি হাতে
গোলাপের ফুল আসে নতুন ডালে। পুরোনো ডালে ফুল ভালো হয় না, তাই গোলাপের যত্নে ছাঁটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। নতুন শাখা যাতে ভালোভাবে ছড়াতে পারে, সেজন্য পুরোনো ডাল, আঘাত পাওয়া ডাল আর রোগে আক্রান্ত ডাল কেটে বাদ দিতে হবে। বড় গোলাপ পেতে হলে গাছ নিয়মিত ছাঁটাই করতে হয়। ছাঁটাই না করলে গাছ ঝোপের মতো ঘন হয়ে যায়, ভেতরে আলো বাতাস ঢোকে না, ফুল ছোট হয়।
ছাঁটাইয়ের জন্য আশ্বিন মাসকে উপযুক্ত সময় ধরা হয়। বাংলা পঞ্জিকায় আশ্বিন মোটামুটি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এ সময় বর্ষা শেষ হয়ে আসে, আর সামনের শীতকালই গোলাপের ফুল ফোটার সেরা মৌসুম। আশ্বিনে ছাঁটাই করলে শীতের শুরুতে নতুন ডালে নতুন কুঁড়ি আসে। ছাঁটাইয়ের জন্য ধারালো কাঁচি বা ছুরি ব্যবহার করতে হয়, যাতে ডাল থেঁতলে না যায়।
কাটার জায়গা বাছাইয়েও একটু কৌশল আছে। ডালের গায়ে পাতার গোড়ায় যে ছোট চোখ বা কুঁড়ি থাকে, সেখান থেকেই নতুন ডাল বের হয়। বাইরের দিকে মুখ করা একটি চোখের সামান্য ওপরে তেরছা করে কাটলে নতুন ডাল বাইরের দিকে ছড়ায়, গাছের মাঝখান ফাঁকা থাকে, আলো বাতাস ঢোকে। তেরছা কাটলে কাটা মুখে পানিও জমে না। গাছের মাঝখানে একে অপরকে ঘষা খায় এমন ডাল থাকলে তার একটি কেটে ফেলা ভালো।
ছাঁটাই করা ডালের কাটা মুখে ছত্রাকনাশক ঘন করে গুলে লাগিয়ে দিতে হবে। কাটা জায়গা খোলা থাকলে সেখান দিয়ে ছত্রাক ঢুকে ডাল ওপর থেকে নিচের দিকে কালো হয়ে শুকিয়ে যেতে পারে, যাকে ডাইব্যাক বা আগামরা রোগ বলা হয়। কাটা মুখে প্রলেপ দিলে এই ঝুঁকি অনেকখানি কমে।
সারের হিসাব: ছাঁটাইয়ের আগে খাবার
ছাঁটাইয়ের পর গাছ নতুন ডাল ছাড়ার জন্য প্রচুর খাবার চায়। তাই সার দিতে হয় ছাঁটাইয়ের ১০ থেকে ১২ দিন আগে, যাতে ছাঁটাইয়ের সময় সার মাটিতে মিশে গাছের কাছে পৌঁছানোর মতো অবস্থায় থাকে। প্রতি গাছে ২ থেকে ৩ কেজি পচা শুকনো গোবরের সঙ্গে ৫০ গ্রাম টিএসপি ও ৫০ গ্রাম পটাশ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। টিএসপি হলো ফসফরাসযুক্ত সার, যা শিকড় ও ফুলের জন্য দরকারি। পটাশ গাছের কাণ্ড শক্ত করে এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। গোবর মাটিকে নরম রাখে এবং ধীরে ধীরে নানা পুষ্টি জোগায়।
সার দেওয়ার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। টবের ওপর থেকে ১০ সেন্টিমিটার মাটি সরিয়ে নিচের মাটি কিছুটা আলগা করে সারগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। এ সময় খেয়াল রাখতে হবে, যাতে শিকড়ের কোনো ক্ষতি না হয়; খুরপি দিয়ে জোরে খোঁড়াখুঁড়ি করলে সরু শিকড় ছিঁড়ে যায়। হাঁস মুরগি বা কবুতরের বিষ্ঠাও সার হিসেবে গোলাপ গাছে দেওয়া যায়। তবে এগুলো খুব কড়া সার, তাই ভালো করে পচিয়ে এবং অল্প পরিমাণে দেওয়াই নিরাপদ।
গ্রীষ্মের শুরুতেও টবের গোলাপের একটু বাড়তি যত্ন লাগে। মার্চ থেকে এপ্রিল মাসে গাছের গোড়ায় পচা গোবর ও কম্পোস্টের মালচ দেওয়া যায়। মালচ মানে মাটির ওপর বিছিয়ে দেওয়া আবরণ। এটি রোদ থেকে শিকড় বাঁচায়, মাটির রস ধরে রাখে, আর ধীরে ধীরে পচে সারের কাজও করে।
সরকারি কৃষি নির্দেশনায় গ্রীষ্মের জন্য আরেকটি কাজের কথা বলা আছে। মার্চের শেষে বা এপ্রিলের প্রথম দিকে টবের ওপরের ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার মাটি তুলে ফেলে সেই জায়গা পচা গোবর ও নতুন ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে ভরে দিতে হয়। তারপর খড় বা শুকনো পাতা দিয়ে মাটি ঢেকে দিলে গ্রীষ্মের কড়া রোদ থেকে শিকড় রক্ষা পায়। টবের মাটি বছরের পর বছর একই থাকলে তার পুষ্টি ফুরিয়ে যায়, তাই এভাবে ওপরের মাটি বদলানো টবের গাছের জন্য বিশেষ দরকারি।
ছাদে টব রাখার কিছু সতর্কতা
ছাদে টব রাখার সময় শুধু গাছের কথা ভাবলে চলে না, ছাদের কথাও ভাবতে হয়। টব সরাসরি ছাদের মেঝেতে বসালে তলার ছিদ্র দিয়ে পানি বের হতে বাধা পায়, আর টবের নিচে সবসময় ভেজা থাকায় ছাদের ক্ষতি হতে পারে। দুটি ইট বা একটি ছোট স্ট্যান্ডের ওপর টব বসালে পানি ঠিকমতো বের হয়ে যায়, আর টবের নিচে বাতাসও চলে। ছাদের পানি নামার পথ যেন পাতা ও মাটিতে বন্ধ না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার।
কয়েক বছর পর গোলাপের শিকড় টবের পুরো মাটি দখল করে ফেলে; তখন তলার ছিদ্র দিয়ে শিকড় বেরিয়ে আসতে দেখা যায়, পানি দিলে মাটি ভেজে না, গড়িয়ে পড়ে। এটি টব বদলানোর সংকেত। একটু বড় টবে নতুন মাটি ও সার দিয়ে গাছটি সরিয়ে দিলে আবার জোর পায়। টব বদলানোর কাজ ছাঁটাইয়ের সময়ের কাছাকাছি করাই ভালো, যখন গাছ এমনিতেই বিশ্রামে থাকে।
বড় এই সার দেওয়ার বাইরে সারা বছর অল্প অল্প খাবারও দরকার। সরকারি কৃষি ওয়েবসাইটের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, টবে বসানোর পর গাছ ধরে গেলে এক মাস পর থেকে ১৫ দিন বা এক মাস পর পর সার দিতে হয়। শীতকালে ছাঁটাইয়ের পর প্রতি টবে ৩ মুঠো গুঁড়া গোবর সার ও ১ মুঠো হাড়ের গুঁড়া দেওয়ার কথাও সেখানে আছে। হাড়ের গুঁড়া ধীরে ধীরে ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম ছাড়ে, যা ফুলের জন্য উপকারী। অল্প মাত্রায় নিয়মিত খাবার দিলে টবের সীমিত মাটিতেও গাছ ক্ষুধার্ত থাকে না।
মাটি খুঁড়ে শিকড় রোদে দেওয়া
গোলাপ চাষিদের মধ্যে একটি পুরোনো পদ্ধতি প্রচলিত আছে, যা মাটিতে লুকিয়ে থাকা ক্ষতিকর পোকা দমনে কাজে লাগে। গাছের গোড়া থেকে ২০ সেন্টিমিটার দূরে গোল করে মাটি খুঁড়ে শিকড়ের কিছু অংশ বের করে দিতে হয়। এভাবে খোঁড়া অবস্থায় মাটি ৮ থেকে ১০ দিন রেখে দেওয়া যায়। এতে মাটির ভেতরের ক্ষতিকর পোকা ও কীড়া রোদ ও বাতাসের সংস্পর্শে এসে ধ্বংস হয়। এরপর সার মেশানো নতুন মাটি দিয়ে জায়গাটি আবার ভরে দিতে হয়।
পোকা, রোগ আর জৈব সমাধান
টবের গোলাপে জাব পোকা, শুঁয়োপোকা ও নানা রকম ছোট পোকার আক্রমণ হয়। জাব পোকা খুব ছোট, সবুজ বা কালো রঙের পোকা, যা দল বেঁধে কচি ডগা ও কুঁড়িতে বসে রস চুষে খায়; কুঁড়ি কুঁকড়ে যায়, ফুল ঠিকমতো ফোটে না। শুঁয়োপোকা পাতা খেয়ে ঝাঁঝরা করে দেয়। টবে চাষ করার সময় পোকার আক্রমণ হলে স্থানীয়ভাবে তৈরি জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা যায়। বাড়ির ছাদে যেখানে পরিবারের সবাই যাতায়াত করেন, সেখানে কড়া রাসায়নিকের চেয়ে জৈব উপায়ই নিরাপদ।
রোগের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত কালো দাগ রোগ, যা একটি ছত্রাকের কারণে হয়। পাতায় গোল কালো দাগ পড়ে, দাগের চারপাশ হলুদ হয়ে পাতা ঝরে যায়। আরেকটি রোগে পাতা ও কুঁড়িতে সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ পড়ে। এসব রোগ ঠেকাতে সকালের রোদ, গোড়ায় পানি দেওয়া, গাছের মধ্যে বাতাস চলাচল, আর আক্রান্ত পাতা সঙ্গে সঙ্গে তুলে নষ্ট করা সবচেয়ে কার্যকর। ঝরে পড়া আক্রান্ত পাতা টবে পড়ে থাকলে সেখান থেকে রোগ আবার ছড়ায়।
জোড়ের নিচের ডাল কেটে ফেলুন
জোড় কলমের গোলাপে মাঝে মাঝে জোড়ের জায়গার নিচ থেকে নতুন ডাল বের হয়। প্রথমে দেখে মনে হতে পারে গাছ আরও ঝাঁকড়া হচ্ছে। কিন্তু এই ডাল আসলে নিচের বুনো আদিজোড় গাছের। এর পাতা সাধারণত আলাদা রকমের দেখায়, আর বুনো গাছটি খুব জোরালো বলে এই ডাল দ্রুত বেড়ে গাছের খাবারের বড় অংশ নিজের দিকে টেনে নেয়। ফলে ওপরের সুন্দর জাতের ডাল দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই চারার জোড়া জায়গার নিচে কোনো ডালপালা বের হলে দেরি না করে ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে ফেলতে হবে। যত গোড়া থেকে কাটা যায় তত ভালো, কারণ অল্প অংশ রেখে দিলে সেখান থেকে আবার ডাল বের হয়। এটি গোলাপের নিয়মিত পরিচর্যার অংশ, প্রতি সপ্তাহে একবার গাছের গোড়ার দিকে তাকালেই চোখে পড়ে।
বাড়িতে তৈরি জৈব কীটনাশকের প্রসঙ্গে বলা যায়, নিম গাছের পাতা ও বীজ থেকে তৈরি নির্যাস বহুদিন ধরে উদ্ভিদজাত কীটনাশক হিসেবে পরিচিত, আর বাজারে নিমভিত্তিক জৈব কীটনাশকও পাওয়া যায়। জাব পোকা অল্প থাকলে আক্রান্ত ডগা পানির জোরালো ধারায় ধুয়ে দিলে বা আঙুল দিয়ে মুছে দিলেও কাজ হয়। শুঁয়োপোকা চোখে পড়লে হাতে তুলে নষ্ট করা যায়। যে কোনো স্প্রে বিকেলে করা ভালো, আর নতুন কিছু ব্যবহারের আগে একটি ডালে পরীক্ষা করে নেওয়া নিরাপদ।
বড় ফুলের কৌশল
বড় আকারের ফুল পেতে হলে প্রথম দিকে বের হওয়া ফুলের কুঁড়ি ভেঙে দিতে হয়। শুনতে উল্টো মনে হলেও যুক্তিটি পরিষ্কার: নতুন লাগানো বা সদ্য ছাঁটাই করা গাছ প্রথমে শিকড় ও ডালপালা মজবুত করতে শক্তি খরচ করে। শুরুতেই ফুল ফোটাতে গেলে সেই শক্তি ভাগ হয়ে যায়। প্রথম কুঁড়িগুলো ভেঙে দিলে গাছ আরও সবল হয়, আর পরে যে ফুল ফোটে তা আকারে বড় হয়।
একই যুক্তিতে ফুল ঝরে যাওয়ার পর শুকনো ফুলটি ডালসহ কিছুটা কেটে দেওয়া ভালো। গাছে শুকনো ফুল রেখে দিলে গাছ বীজ তৈরির দিকে শক্তি খরচ করে, নতুন কুঁড়ি আসতে দেরি হয়। নিয়মিত শুকনো ফুল কেটে দিলে নতুন ডাল ও কুঁড়ি তাড়াতাড়ি আসে।
ফুল কেটে ঘরে সাজাতে চাইলে সকালে বা বিকেলে, কুঁড়ি যখন সবে খুলতে শুরু করেছে তখন কাটা ভালো। দুপুরের গরমে কাটা ফুল দ্রুত নেতিয়ে পড়ে। কাটার সময় ডালের ওপর অন্তত দুই তিনটি পাতা রেখে দিলে সেখান থেকে আবার নতুন ডাল বের হয়, আর গাছ পরের ফুলের জন্য তৈরি হয়।
ছাদের এক কোণে সারা বছর ফুল
টবে গোলাপ চাষের নিয়মগুলো একসঙ্গে দেখলে একটি ছবি পাওয়া যায়। এক বছরের পুরোনো কলমের চারা, সোজা করে রোপণ, জোড় মাটির ওপরে। ভালো পানি নিষ্কাশনের টব আর দিনে ছয় ঘণ্টা রোদ। খরায় দশ দিন পর পর ভরপুর সেচ। আশ্বিনে ছাঁটাই, তার ১০ থেকে ১২ দিন আগে গোবর, টিএসপি ও পটাশ। জৈব উপায়ে পোকা দমন, আর জোড়ের নিচের ডাল কেটে ফেলা।
এর কোনোটিই বড় খরচের কাজ নয়, দরকার শুধু নিয়মিত নজর। সপ্তাহে একবার গাছের পাতা, ডাল, গোড়া আর মাটি খুঁটিয়ে দেখার অভ্যাস থাকলে বেশির ভাগ সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়ে। কোনো রোগ বা পোকা চিনতে না পারলে উপজেলা কৃষি অফিস বা কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে পরামর্শ নেওয়া যায়। যত্ন পেলে ছাদের এক কোণের কয়েকটি টবই সারা শীত জুড়ে ফুলে ভরে থাকবে।
ছবি: টবে সাদা গোলাপ, Abhignad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)





মন্তব্য
(০)